শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৭ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

রিজার্ভ চুরি

যুক্তরাষ্ট্রে মামলার নিষ্পত্তিতে লাগতে পারে তিন বছর

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৩:০৬ এএম

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির অর্থ পুনরুদ্ধারে যুক্তরাষ্ট্রে দায়ের হওয়া মামলার নিষ্পত্তিতে তিন বছর লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন আইনজীবী আজমালুল হোসেন কিউসি। গতকাল রবিবার বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান ব্যাংকটির নিযুক্ত এ আইনজীবী। ২০১৬ সালে হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে চুরি যাওয়া রিজার্ভের অর্থ উদ্ধার ও ক্ষতিপূরণের দাবিতে গত ৩১ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট অব নিউইয়র্কে মামলা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স হলে এ মামলা নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আজমালুল হোসেন কিউসি ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান আবু হেনা মো. রাজী হাসান, বিএফআইইউর পরামর্শক দেবপ্রসাদ দেবনাথ, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম প্রমুখ।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনজীবী আজমালুল হোসেন জানান, যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে দায়ের করা মামলা তিন বছরের মধ্যে সমাধান হবে। তবে এ সময় কমতে বা বাড়তে পারে।

আজমালুল হোসেন বলেন, ‘রিজার্ভ চুরি নিয়ে আমরা ফিলিপাইনের কাছে আইনি সহায়তা চেয়েছিলাম। আমরা জানি, ফিলিপাইন কর্র্তৃপক্ষ এই নিয়ে কয়েকটি মামলা করেছে। এর ফলে দেড় কোটি ডলার ফেরত এসেছে। পুরো টাকা ফেরাতে যদি আমরা ফিলিপাইনে মামলা করতাম, তা শেষ হতে ৩০ বছর লেগে যেত। আমরা তো এতদিন অপেক্ষা করতে পারি না।’

যুক্তরাষ্ট্রে মামলার বিষয়ে এ আইনজীবী বলেন, ‘এটা জনগণের টাকা। এজন্য বিকল্প প্রক্রিয়া নিয়ে গত দুই বছর ধরে চিন্তা চলছে। এর অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে মামলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে মামলা দ্রুত নিষ্পন্ন হয়। এজন্যই সেখানে করা হয়েছে। মামলা পুরোপুরি নিষ্পত্তি হতে তিন বছর লাগতে পারে। এর মধ্যে অনেক আপত্তি আসবে, এসেছেও।’ তিনি বলেন, ‘আরসিবিসির (ফিলিপাইনের ব্যাংক) আইনজীবীরা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে মামলা করার অধিকার নেই। আমরা জানি, এমন অভিযোগ আসবে, তা জেনেই দেশটিতে মামলা করা হয়েছে।’

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রিজার্ভ চুরির তিন বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে মামলা করা হলো। মামলা করতে দেরি হলো কি না, জানতে চাইলে এ আইনজীবী বলেনÑ মামলার তথ্য, বিভিন্ন তদন্ত ও রিপোর্ট সংগ্রহের কাজে এ সময় ব্যয় হয়েছে। তথ্য সংগ্রহের সময় মূল অপরাধী ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংক (আরসিবিসি) যাতে কিছু জানতে না পারে, সেজন্য তথ্য সংগ্রহ করতে হয়েছে খুব সতর্কতার সঙ্গে। এ কারণেও দেরি হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আরসিবিসিতে অবৈধভাবে বাংলাদেশের অর্থ গেছে এবং এই টাকা কোথায় কোথায় খরচ হয়েছে, সেটা প্রমাণ হবে। আর এই প্রমাণের ভিত্তিতেই আমরা আশা করছি আমাদের হারিয়ে যাওয়া রিজার্ভের পুরো অংশ, সুদ এবং খরচসহ ফেরত পাব।’

চুরি যাওয়া অর্থ ফেরত পাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করে আজমালুল বলেন, ‘ফিলিপাইনের আরসিবিসি থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ হ্যাকারদের বের করে নিয়ে যাওয়ার দিন ব্যাংকটির ক্যামেরা বন্ধ রাখা, সুইফটের সার্ভার অকার্যকর করে রাখা, আরসিবিসির স্থানীয় এক কর্মকর্তার সাজা হওয়া এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির সঙ্গে কয়েকজনের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হওয়ায় আমরা আশাবাদী চুরি যাওয়া অর্থ ফেরত পাব।’      

হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে থাকা বাংলাদেশের রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়। ব্যাংকিং লেনদেনের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সুইফটে ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে ফিলিপাইনের আরসিবিসিতে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ও শ্রীলঙ্কার দুটি ব্যাংকে ২ কোটি ডলার স্থানান্তর করা হয়েছিল। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কার ব্যাংকে স্থানান্তর হওয়া ২ কোটি ডলার ফেরত আনা হয়েছে। ফিলিপাইনের আরসিবিসি থেকে ফেরত আনা হয়েছে এক কোটি ৪৬ লাখ ডলার। এখনো ফেরত আসেনি ৬ কোটি ৬৪ লাখ ডলার।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এই অর্থ ফেরত পাওয়ার জন্যই যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মামলা করা হয়। আইনি লড়াই করতে দেশটিতে দুটি আইনি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী চুরি যাওয়া ৬ কোটি ৬৪ লাখ ডলার উদ্ধার করে দিতে ‘প্রতি ঘণ্টা কাজভিত্তিক’ দুই প্রতিষ্ঠানকে পারিশ্রমিক দেওয়া লাগবে। অর্থ যতদিন উদ্ধার না হবে, ততদিন এই মামলা চলতে থাকবে ও পারিশ্রমিক দিতে হবে।

রিজার্ভ চুরির ঘটনায় করা মামলায় ১০৩ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্রে ১৫ ব্যক্তি, ৭ প্রতিষ্ঠান ও ২৫ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে বিবাদী করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে করা মামলায় বাংলাদেশ ব্যাংক জিতলেও আরসিবিসি টাকা ফেরত দিতে বাধ্য কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে আজমালুল হক কিউসি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরসিবিসির এ ধরনের চুক্তি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে তাদের সম্পদও আছে। মামলায় বাংলাদেশ ব্যাংক জিতলে এ সম্পদ থেকেও অর্থ ফেরত পাওয়া কঠিন হবে না। অর্থ ফেরত পাওয়ার ব্যাপারে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক ও সুইফটও বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রযুক্তি, কারিগরি ও আইনি সহযোগিতা দিচ্ছে।’

রিজার্ভ চুরির ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে আইনজীবী বলেন, ‘সরকার তদন্ত করেছে। সে তদন্তের রিপোর্ট কেন প্রকাশ করছে না, তা জানি না। এ রিপোর্ট যেন কোনো কাজে প্রভাবিত না করে, এজন্যই হয়তো প্রকাশ করা হয়নি। আমি দায়িত্বে থাকলেও প্রকাশ করতাম না।’

তিনি বলেন, ‘মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন সাহেবের প্রতিবেদন আইনিভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ তারা ফরেনসিক তদন্ত করেননি। এটা আদালতে দাখিল করা যাবে না। বিশেষজ্ঞ যারা তদন্ত করেছেন, তাদের প্রতিবেদন গ্রহণযোগ্য হবে।’

মামলায় কত টাকা খরচ হবে, সে বিষয়ে আইনজীবী কোনো তথ্য দেননি। তবে বিএফআইইউর প্রধান রাজি হাসান বলেন, এ পর্যন্ত রিজার্ভ চুরির মামলা পরিচালনায় তিন কোটি টাকার মতো খরচ হয়েছে।

রিজার্ভ উদ্ধারে চুরি হওয়া অর্থের চেয়ে বেশি খরচ হবে কি না, জানতে চাইলে রাজি বলেন, ‘সরকারের সিদ্ধান্ত অনুসারে মামলা করা হয়েছে। এখানে খরচ মুখ্য বিষয় নয়। আমাদের লক্ষ্য চুরি হওয়া পুরো অর্থ ফেরত আনা।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত