রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

এই রসিকতা এখন বড় আত্মঘাতী

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১১:১২ পিএম

বাংলা সাহিত্যকে মর্যাদাদানে কাশীরাম দাসের ভূমিকা অগ্রগণ্য! ‘মহাভারত’ নামক মহাগ্রন্থের শ্রেষ্ঠ বাংলা অনুবাদক কাশীরাম দাস! তিনিই জটিল সংস্কৃতের জটাবন্ধন থেকে মহাভারতের স্রোতোধারাকে বাংলা ভাষায় প্রবাহিত করেছিলেন! মহাভারত নিয়ে তার নিজের সাফাই : ‘মহাভারতের কথা অমৃত সমান/কাশীরাম দাস কহে শুনে পুণ্যবান।’ এই মহাভারতের ছোট্ট এক আখ্যান দিয়েই শুরু করা যাক।

প্রথমেই আমরা মুষল শব্দটির মানে জেনে নিই। অভিধান অনুযায়ী মুষল বা মুশল অর্থ ঢেঁকির মোনা অর্থাৎ ঢেঁকির যেই অংশ গর্তে গিয়ে শস্য ভানে। ঢেঁকির আসল কাজ হচ্ছে শস্য ভানা। আর এর জন্য মোনার প্রয়োজন সর্বাধিক। মুষলপর্ব একটি প্রবাদ। তা মহাভারত থেকে এসেছে। মহাভারতে যাদব দল মুষল হাতে নিজেদের মধ্যে ভয়ংকর কলহ, মারদাঙ্গা, খুনোখুনি করে দ্বারকার জনজীবনকে বিপর্যস্ত ও নিজেদের বিনাশ করল। আত্মকলহের এই ঘোর পরিণতি থেকেই মুষলপর্ব প্রবাদটির জন্ম।

কিন্তু মুষলপর্ব অনিবার্য হয়ে ওঠে কখন এবং কেন? কারণ ছাড়া কাজ তো হয় না। মহাভারতে মুষলপর্ব আপনাআপনি ঘটেনি। ঘটার পেছনে স্পষ্ট প্রকাশিত কারণ ছিল। সেসব কারণ দেখিয়ে মহাভারতে লেখা হয়েছে দ্বারকায় অধিকাংশ যাদব হয়ে উঠেছিল অত্যন্ত দুর্বৃত্ত, নৃশংস ও গর্বিত। তাদের আগাপাছতলা ছেয়ে গিয়েছিল দুর্নীতি, প্রতারণা, অহমিকা, দ্বিচারিতা ও কুবুদ্ধিতে। তারা অত্যন্ত দুর্নীতিপরায়ণ হয়ে পাপ কাজ করছিল নির্লজ্জভাবে। দ্বারকার শাসন তাদের নির্বৃত্ত করতে পারেনি বরং দুর্বৃত্তরাই তা গ্রাস করে ফেলেছিল। দুর্বৃত্তশক্তির অভ্যুত্থানে দ্বারকায় চলছিল ঘোর নৈরাজ্য।

এটা মহাভারতের শেষের দিকে ঘটনা। যাদবদের দ্বারকায় এসেছেন তিন প্রাজ্ঞ ঋষি : বিশ্বামিত্র, কণ্ব আর নারদ। দ্বারকার ছেলেছোকরার দল তখন বেজায় উজিয়েছে। এরা তো আর খেটে-খাওয়া মানুষ নয়। আহার-বিহারের প্রাচুর্য তাদের জীবনে যথেষ্ট। দায়িত্বজ্ঞানহীন রগড় করার সময়-সুযোগ দুই-ই তাদের আছে। হাসি-রঙ্গ ছাড়া আর কোনো কাজে বা ভাবনায় আর মনই বসে না। সবকিছু নিয়ে রসিকতা করাই তাদের অন্যতম বিনোদন। তিন ঋষিকে একসঙ্গে দেখে তাদের বেজায় আমোদের শখ হলো। কৃষ্ণের ছেলে শাম্বকে মেয়ে সাজিয়ে প্রবীণ ঋষিদের কাছে নিয়ে এলো তারা। বলল, ‘এ হলো বভ্রুর পতœী। বলুন তো এ কী প্রসব করবে?’ ঋষিরা নির্বোধ নন, কোনো মানুষের শারীরিক ও সামাজিক সামর্থ্য কতটা, কর্তব্যই বা কীÑ এসব ভেদ ও সামঞ্জস্য বিষয়ে তাদের জ্ঞান প্রখর। তাই অর্বাচীনদের রসিকতায় ক্রুদ্ধ প্রাজ্ঞরা অভিশাপ দিলেন : ‘শাম্ব মুষল প্রসব করবে। আর সেই মুষলই হবে যদুবংশের পতনের কারণ।’ অতঃপর প্রভাস তীর্থে যদুবংশীয় জমায়েত। মাতাল হয়ে ভব্যতা-সভ্যতা ভুলে তারা পরস্পরকে ক্রমেই উপহাস করতে লাগল। ণত্ব-ষত্ব জ্ঞান তখন তাদের একেবারেই লোপ পেয়েছে। রসিকতা, মত্ত উপহাস থেকে ক্রমে কথাকাটাকাটি। তারপর শুরু হলো একে অন্যের সঙ্গে লড়াই। কৃষ্ণের সামনেই সাত্যকি কৃতবর্মার মাথা কেটে ফেলল। শুরু হয়ে গেল মুষল নিয়ে ভয়ংকর হানাহানি। মুষল এলো কোথা থেকে? কালীপ্রসন্ন সিংহের ভাষায়, ‘কৃষ্ণ এরকামুষ্টি (গ্রন্থিহীন তৃণবিশেষ; নল খাগড়া, শরগাছ) গ্রহণ করাতে তাহা মুষলরূপে পরিণত হইল।’ এটাও আছে যে ওই স্থানের সমুদয় এরকাই ব্রাহ্মণ-শাপে মুষলীভূত হয়েছিল। যাদবরা তখন ওই সব এরকা দিয়ে পরস্পরকে নিহত করতে লাগলেন। এভাবে যাদবরা পরস্পরকে নিহত করেছিলেন।

মুষলপর্ব সৃষ্টিকারীদের নির্মম পরিণতি রচনা করে যে ইতিহাস, তাকে বিদ্ধ করে সাধ্য কার? মহাভারত তো ইতিহাস নামেই প্রসিদ্ধ। ‘জাতির স্বরচিত স্বাভাবিক ইতিহাস’। ইতিহাসের গতি রুদ্ধ করে কোন দুর্বৃত্তশক্তি? পাপাচারী, দুর্বুদ্ধি যাদবরা আত্মকলহের পরিণতিতে দ্বারকার সর্বনাশ করল, নিজেরাও শেষ হলো। যাদবদের গোষ্ঠীসংঘর্ষ এবং সুশাসনের অভাব দ্বারকার জনজীবনে যে নৈরাজ্য ও যাদবনাশন ডেকে এনেছিল, সে ইতিহাস স্মরণ করিয়ে মানুষকে সতর্ক করতেই মুষলপর্ব প্রবাদটির জন্ম।

বাঙালি নাগরিক সমাজ এখন প্রায় রোজই কিছু না কিছু রগড়ের ‘খোরাক’ পেয়ে যাচ্ছে। আমাদের নিত্যদিন কাটে সোশ্যাল মিডিয়ায়, নানা রকম গুলতানিতে। বর্তমানে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে হাসি, ঠাট্টা, মশকরার বান ডাকছে। কত রকম যে শ্লেষ, ভাঙা ও আধভাঙা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জুড়ে ইদানীং বেশির ভাগ মানুষের মধ্যে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে একটি কথাকে বিদ্রুপাত্মক অর্থে বা ব্যঙ্গ করে ব্যবহার করতে দেখা যাচ্ছে। আর সেটা হলো, ‘এই মনে করেন ভালো লাগে, খুশিতে, ঠ্যালায় ও ঘোরতে।’

হঠাৎ এই সংলাপটি নিয়ে ইউজারদের মধ্যে কেন এত মাতামাতি? এই লাইনটি এলো কোথা থেকে? এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে অনেকের মনে। মূলত বাংলাদেশের বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল মাইটিভির একটি সরাসরি সম্প্রচারিত প্রতিবেদন থেকেই এই লাইনটির সূত্রপাত।

২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় ঢাকার-৫ আসনের দনিয়া এ কে হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রের ভোটের চিত্র নিয়ে খবর সংগ্রহ করছিল একটি বেসরকারি টেলিভিশন। লাইভ সম্প্রচারের একপর্যায়ে তিনি ভোটকেন্দ্রের বাইরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন নারীর কাছে জানতে চান, তাদের হাতে ভোট দেওয়ার অমোচনীয় কালি দেওয়া আছে, অর্থাৎ তাদের ভোট দেওয়া হয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও তারা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? সাংবাদিকের এমন প্রশ্নে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে এক নারী তখন বলেছিলেন, ‘এই মনে করেন ভালো লাগে, খুশিতে, ঠ্যালায় ও ঘোরতে।’

গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশে যে নির্বাচন হয়ে গেল, সেই প্রেক্ষাপটে আবার এই নারী ভোটারের উদ্ধৃতি ব্যাপকভাবে শেয়ার হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টিকে নিয়ে নানা আঙ্গিকে ট্রল করছেন ইউজাররা। কেউবা নিজের ব্যক্তিগত ছবি বা ইভেন্টের বিবরণীতেও ব্যঙ্গ করে এ লাইনটি দিয়ে প্রকাশ করছেন তাদের মনের ভাষা।

মাঝে মাঝে মনে হয়, এ কোন বাংলাদেশ? এ কোন বাঙালি? টাকাপয়সা, বড়লোকি, এসবের জন্য তো আমাদের কেউ সমীহ করত না। শিক্ষা, সংস্কৃতি, ভদ্রতা, সৌজন্য, সততা ইত্যাদির জন্য ‘জাতি’ হিসেবে বাঙালি অন্য প্রদেশের মানুষদের কাছে স্বীকৃতি পেয়েছিল। এই শিক্ষা-সংস্কৃতি-সততার জন্য বাঙালির গোপন ও প্রকাশ্য দেমাকও কিছু কম ছিল না। বাঙালি পরশুরাম চুরি শেখানোর স্কুল নিয়ে ‘মহাবিদ্যা’ নামে একটি গল্প লিখেছিলেন। মহাবিদ্যা শেখানোর স্কুলে প্রথম শ্রেণির ছাত্র যারা, তারা হোমরাও সিং, চোমরাও আলি, খুদীন্দ্রনারায়ণ, মিস্টার গ্র্যাব, মিস্টার হাউলার... খুদীন্দ্রনারায়ণ বাঙালি জমিদার বলে মনে হয়, বাকিরা নাম ও পদবির নিরিখে অবাঙালি। পেশায় মহারাজা, নবাব, বণিক ও সম্পাদক। বাঙালির মধ্যে চোর নেই তা নয়, তবে এসব জিনিসের অতিকায় মূর্তি ভারতবর্ষের অন্য জায়গায় যতটা দেখা গেছে, বঙ্গদেশে সেটা সুলভ ছিল না। সেই ‘অক্ষমতা’ নিয়ে আমাদের একটা গর্বও ছিল বৈকি!

বাঙালির সেই দেমাক আর রইল না। সারা বিশ্ব এখন আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসছে। আমাদের সততা, শিক্ষা, সংস্কৃতির বেলুন তো ফুটো হয়ে গেল। আমাদের রাজনীতিবিদদের কাণ্ডকীর্তি নিয়ে দেশের মানুষই এখন হাসাহাসি করছে। এ বড় আনন্দের সময় নয়!

জবাবে কোনো নাগরিক যদি বলেন, ‘রাজনীতিবিদরা রাজনীতিবিদ, আমরা শিক্ষিত নাগরিক সমাজ; আমরা আমরা, ওরা ওরা’, তাহলে তার চেয়ে পিঠ বাঁচানো কথা কিন্তু আর হয় না। এই রাজনীতির জন্ম তো শূন্য থেকে হয়নি। সুবিধাবাদের ও পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি বাঙালি ভদ্রলোকের স্বাভাবিক সৌজন্যবোধকে নষ্ট করেছে, নীতিকে তারা জলাঞ্জলি দিয়েছেন। তারই পরিণাম এখনকার এই রাজনীতি।

তাই এটা ইন্টারনেটের সামনে অলসভাবে বসে রসিকতার সময় নয়, এটা গভীর এবং তীব্র বিষাদের সময়। মা কী ছিলেন, মা কী হয়েছেন! বাঙালি কী ছিল, বাঙালি কী হয়েছে! এই বিষাদ থেকে যে ন্যায়সংগত ক্রোধের জন্ম হয়, এখন সেই ক্রোধের সময়। কিন্তু বাঙালি এখন আর বিষণ্ণ বা ক্রুদ্ধ হয়ে নিজের হ্যাপিনেস নষ্ট করার বান্দা নয়। মশকরা করে, পিঠ বাঁচিয়ে, নাগরিক সমাজ নিজেদের ‘খারাপ’ রাজনীতি থেকে আলাদা করে রাখবে। কিন্তু রাজপুরীতে আগুন লাগলে নগর বাঁচবে কি? এই রসিকতাকে তাই এখন বড় আত্মঘাতী মনে হচ্ছে। একটা জাতি সংকটের সময় স্রেফ তামাশা করে কাটিয়ে দিলে কেবল মুষলপর্বের স্মৃতিই মনে পড়ে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত