সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ঠাকুরগাঁওয়ে গ্রামবাসী-বিজিবি সংঘর্ষ গুলিতে শিশুসহ নিহত ৩

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০২:৪০ এএম

ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুরে গরু জব্দ করা নিয়ে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির সঙ্গে গ্রামবাসীর সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে শিশুসহ তিন পথচারীর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার বকুয়া ইউনিয়নের বহরমপুর গ্রামের এ ঘটনায় বিজিবির পাঁচ সদস্যসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। ভারতীয় চোরাকারবারিদের গরু জব্দ করতে গেলে গ্রামবাসী বাধা দিয়ে হামলা করলে জীবন রক্ষায় গুলি চালানো হয়েছে বলে বিজিবির দাবি। তবে গ্রামবাসীর অভিযোগ, বৈধভাবে কেনা গরু জোর করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে বিজিবি সদস্যরা।

এ বিষয়ে হরিপুর থানার ওসি আমিরুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সংঘর্ষের ঘটনায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ওই এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়। নিহতরা হলেন বকুয়া ইউনিয়নের রুহিয়া গ্রামের নজরুল ইসলামের ছেলে নবাব (৩০), একই গ্রামের জহির উদ্দিনের ছেলে সাদেক (৪০) ও বহরমপুর গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে জয়নুল (১২)। মধ্যে প্রথম দুজন ঘটনাস্থলেই এবং অন্যজন হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান।

আহতদের মধ্যে রয়েছেন বহরমপুর গ্রামের বাবু (২৮), মিঠুন (১৮), ইসাহাক (৩৫), রাসেল (১৬), সাদেকুল, মুনতারা (৪৫), নওসাদ (২৫), নওশাদ, আব্দুল হান্নান (৬০), জয়গুন (৩৫), নূর নেহার (৬০), তৈমুর (২৫), সিংহাড়ী গ্রামের আফসারুল (২৮) ও সোহেল। তাদের দিনাজপুর ও রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার রাতে এক সংবাদ সম্মেলনে ঠাকুরগাঁও ৫০ বিজিবি অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তুহিন মোহাম্মদ মাসুদ বলেন, ‘ভারতীয় পাঁচটি গরু আটকের পর বহরমপুরে সংঘবদ্ধ একটি চক্র বিজিবির ওপর দেশীয় ধারালো অস্ত্র ও লাঠিসোটা নিয়ে হামলা চালায়। এতে বিজিবির পাঁচ সদস্য আহত হয়। বিজিবিকে হত্যার উদ্দেশ্যে সংঘবদ্ধ চোরাকারবারিরা হামলা চালিয়ে অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। তখন চোরাকারবারিদের ছত্রভঙ্গ করতে বিজিবি সদস্যরা ফাঁকা গুলি ছোড়ে।’

এলাকাবাসী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বহরমপুর গ্রামের হবিবর রহমান ১৭ দিন আগে রানীশংকৈল উপজেলার নেকমরদ হাট থেকে দুটি গরু কিনে আনেন। সেই গরু মঙ্গলবার সকালে স্থানীয় যাদুরানী বাজারে বিক্রি করার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়ে যাদুরানী মহাবিদ্যালয়ের সামনে পৌঁছলে বেতনা ক্যাম্পের বিজিবি সদস্যরা ভারতীয় গরু সন্দেহে রাস্তা থেকে ভটভটিসহ গরু দুটি আটক করে ক্যাম্পের দিকে রওনা দেয়। ভটভটি হবিবর রহমানের বাড়ির সামনে পৌঁছলে তার পরিবারের লোকজন গাড়িটি আটকায়। বিজিবি সদস্যরা সেগুলো ভারতীয় গরু বললে গরুর মালিক গরু কেনার কাগজপত্র দেখানোর পরও বিজিবি সদস্যরা গরু দিতে না চাইলে উভয়পক্ষের মধ্যে বাগবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে পরিবারের লোকজন গরু ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে সংঘর্ষ বাধে।

হবিবর রহমানের ছেলে ইয়াকুব আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের বাড়ির সামনে ভটভটিটি আটকে আমাদের কেনা গরু দুটি বিজিবির কাছে ফেরত চাইলে তর্কবিতর্ক শুরু হয়। একপর্যায়ে বিজিবি সদস্যরা আমাদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি চালায়।’

বকুয়া ইউনিয়নের স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আবুল কাসেম বলেন, ‘আমি বিজিবি সদস্যদের বার বার অনুরোধ করে বলেছি, এ গরুগুলো ওদের ক্রয়কৃত বাড়ির গরু। গরুগুলো ওদের দিয়ে দিন। কিন্তু বিজিবি সদস্যরা তাদের গরু না দিয়ে গাড়ির ওপর থেকেই উল্টো গ্রামবাসীর ওপর এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে শুরু করে।’

হরিপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আবদুস সামাদ চৌধুরী বলেন, ‘আহত ১৪ জনের শরীর থেকে গুলি বের করে উন্নত চিকিৎসার জন্য দিনাজপুর আবদুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।’

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক ড. কে এম কামরুজ্জামান সেলিম বলেন, ‘বিজিবি তাদের জীবন রক্ষায় গুলিবর্ষণ করেছে। ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ঠাকুরগাঁও ৫০ বিজিবি অধিনায়ক লে. কর্নেল তুহিন মো. মাসুদ ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে উত্তেজিত জনতাকে বলেন, আমরা কেউ কারও শত্রু নই। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

১৯৯৬ সালে গরু ধরাকে কেন্দ্র করে হরিপুরের ভাতুরিয়া গ্রামের আবদুল গফুর বিডিআর সদস্যের গুলিতে নিহত হন। ওই বছরই যাদুরানী হাটে গরু ধরাকে কেন্দ্র করে বিডিআর ও গরু ব্যবসায়ীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত