বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৪, ১০ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

সিনেমায় ভ্যালেন্টাইন জুটি

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১১:৫৮ পিএম

উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের যতটুকু প্রসার হয়েছে তাতে নায়ক-নায়িকার জুটির অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশেষ করে বলিউড, টলিউড ও আমাদের দেশে এই জুটি প্রথা বহু পুরনো। দর্শকনন্দিত প্রতিটি জুটিই তাদের অভিনয়ের দিক থেকে ছিলেন স্বতন্ত্র। এদের মধ্য থেকে সেরা জুটি বাছাই করা বেশ দুরূহ। সর্বাধিক ছবির দিক থেকে দর্শকপ্রিয় জুটিগুলো নিয়ে এ প্রতিবেদন।

উত্তম-সুচিত্রা
বাংলা সিনেমার সর্বকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় জুটি উত্তম কুমার-সুচিত্রা সেন। উত্তম পরলোকে গেছেন ৩৫ বছর আগে, সুচিত্রা চলে গেলেন বেশ কয়েক বছর হলো। জুটি বেঁধে তারা বাঙালিকে উপহার দিয়েছেন ৩০টিরও অধিক ছবি যার প্রায় সবগুলোই সিনেমার ব্যবসায়িক মানদন্ড ‘সুপারহিট’। পঞ্চাশ-ষাট ও সত্তর-এই তিন দশক রুপালি পর্দায় তো ছিলেনই, স্যাটেলাইট টেলিভিশন আর ভিডিও প্রযুক্তির কল্যাণে উত্তম-সুচিত্রা জুটি জনপ্রিয় পরের প্রজন্মগুলোর কাছেও। রোমান্টিকতায় ভরপুর এ জুটি বাঙালিকে শিখিয়েছিলেন কীভাবে ভালোবাসতে হয়। ব্যক্তি জীবনেও তারা গভীর প্রেমে আবিষ্ট ছিলেন বলে অনেক গল্প চাউর রয়েছে। যত দিন বাঙালি থাকবে, বাংলা সিনেমা থাকবে, তত দিনই এই জুটি প্রাসঙ্গিক।

রাজ কাপুর-নার্গিস
আদিযুগের সাদাকালো পর্দাতেও রাজ আর নার্গিস ছিলেন দারুণ রোমান্টিক জুটি। তবে এই রসায়ন কিন্তু শুধু পর্দাতেই আটকে ছিল না। বাইরের জগতেও তারা মজেছিলেন বেপরোয়া প্রেমে। রাজ বিবাহিত ছিলেন আগেই, তবে তাতে মোটেও আটকে থাকেনি তাদের প্রেম। বিশেষ করে ‘আওয়ারা’ (১৯৫১) ছবির পর থেকে নার্গিস মোটামুটি রাজের সঙ্গেই কাজ করেছেন। রাজ-নার্গিসের এই দুরন্ত প্রেমের ছোঁয়া পর্দাতেও অনায়াসেই ছড়িয়ে পড়ত। ‘আগ’, ‘বারসাত’, ‘আন্দাজ’, ‘আওয়ারা’ আর ‘শ্রী ৪২০’- ও তাই কখনো ভুলতে পারেননি সিনেমাপ্রেমীরা।

রাজ্জাক-কবরী
১৯৬৭ সালে সুভাষ দত্তের পরিচালনায় ‘আবির্ভাব’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে রাজ্জাক-কবরী জুটির। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি এ জুটিকে। তারা একের পর এক উপহার দেন ব্যবসাসফল ছবি। ‘রংবাজ’ ছবিটিকে রাজ্জাক-কবরী জুটির সেরা ব্যবসাসফল ছবি হিসেবে ধরা হয়। এ ছবির মাধ্যমে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে প্রথম অ্যাকশনের সূচনা হয়। দর্শকের ভালোবাসায় কবরী খেতাব পান ‘মিষ্টি মেয়ে’। প্রেমিক-প্রেমিকা জুটি হিসেবে বেশ সুনাম কুড়ান রাজ্জাক-কবরী জুটি। তারা একসঙ্গে ৬০টিরও বেশি সিনেমায় অভিনয় করেন।
এখন পর্যন্ত রাজ্জাক-কবরী জুটিই দেশের চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা জুটি বলে মনে করেন চলচ্চিত্রবোদ্ধারা। ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট জীবনাবসান ঘটে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের মুকুটহীন সম্রাট রাজ্জাকের। আর ‘মিষ্টি মেয়ে’ কবরী সিনেমা ছেড়ে এখন পুরোদস্তুর রাজনীতিবিদ। মাঝে মাঝে অবশ্য পর্দায় দেখা যায় তাকে।

শাবানা-আলমগীর
পারিবারিক টানাপড়েন ও সামাজিক অ্যাকশনধর্মী ছবির কথা বলতেই চোখে ভাসে শাবানা-আলমগীর জুটির সিনেমা। আশি ও নব্বইয়ের দশকে দাপটের সঙ্গে কাজ করেছে এ জুটি। জনপ্রিয়তায় এই জুটি ছাড়িয়ে যায় সব মাত্রা। একের পর এক উপহার দিতে থাকে ব্যবসাসফল সব ছবি। ১৯৮৪ সালে ‘ভাত দে’ ও ‘সখিনার যুদ্ধ’ চলচ্চিত্রে একসঙ্গে কাজ করেন শাবানা ও আলমগীর। এখান থেকেই গড়ে ওঠে সবচেয়ে বেশি সিনেমা উপহার দেওয়া শাবানা-আলমগীর জুটি। একসঙ্গে তাদের অভিনীত ছবির সংখ্যা ১৩০টি। জুটি প্রথার সিনেমায় এটিই এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ।
শাবানা অভিনীত চলচ্চিত্রের সংখ্যা ২৯৯টি। এর মধ্যে ১৩০টি চলচ্চিত্রে শাবানার বিপরীতে নায়ক ছিলেন আলমগীর। এছাড়া আরেক দিক থেকেও তারা অনন্য। এ জুটি মোট ১৯ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। এর মধ্যে আলমগীর ৯ বার এবং শাবানা ১০ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান।

অমিতাভ বচ্চন-রেখা
নিজ যুগের প্রায় সব সেরা অভিনেত্রীর সঙ্গেই কাজ করেছেন বলিউডের ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’ অমিতাভ, তবে রেখাই ছিলেন তার সেরা রোমান্টিক জুটি। বেশ কিছু ফিল্মে একসঙ্গে কাজ করবার পরই তাদের নিয়ে ‘গুঞ্জন’ শুরু হয়ে যায়, আর তা অমূলক ছিল না মোটেও! জশ চোপড়ার কালজয়ী রোমান্টিক ফিল্ম একেবারে অমিতাভের বাস্তব কাহিনীকেই সরাসরি পর্দায় হাজির করে। ‘সিলসিলা’ ছবিতে অমিতাভ জয়া ভাদুড়ির সঙ্গে বিবাহিত, কিন্তু রেখার সঙ্গে মেতেছেন তুমুল প্রেমে। বাস্তবেও ঘটনা কিন্তু তাই! আলোচিত এই ছবির পর অমিতাভ-রেখার পোস্ট ম্যারিটাল প্রেম তুমুল ঝড় বইয়ে দেয় অমিতাভের ব্যক্তিগত জীবনে। তবে শেষমেশ জয় জয়ারই হয়, ‘সিলসিলা’ ছবির পর আর কখনোই এক হয়ে কাজ করেনি অমিতাভ-রেখা জুটি। তবে, ‘সূর্যবংশম’ চলচ্চিত্রে খানিকটা ভিন্নভাবে হলেও দুজনেই যুক্ত ছিলেন। অমিতাভ এখানে ছিলেন কেন্দ্রীয় চরিত্রে, আর তার বিপরীতে অভিনয় করা দক্ষিণী নায়িকার হিন্দি ডাবিংয়ের কাজটা সেরেছিলেন রেখা!

সালমান-শাবনূর
সালমান-শাবনূর জুটি বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসে যেমন একটি সাড়াজাগানো জুটি, তেমনি একটি দীর্ঘশ্বাসও। কারণ অনেকে মনে করেন, সালমানের আকস্মিক মুত্যু না হলে উত্তম-সুচিত্রা জুটির মতোই বাংলা সিনেমা পেত আরেকটি কিংবদন্তি জুটি সালমান-শাবনূর। তবুও মাত্র চার বছরের স্বল্প সময়ে এ জুটি উপহার দিয়েছে ব্যবসাসফল বেশ কিছু ছবি। ১৯৯৪ সালে ‘তুমি আমার’ ছবির মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ ঘটে সালমান-শাবনূর জুটির। প্রথম ছবিতেই বাজিমাৎ করে এ জুটি। সালমানের ২৭টি ছবির মধ্যে ১৪টিতেই নায়িকা ছিলেন শাবনূর। সালমান-শাবনূর জুটির ‘স্বপ্নের ঠিকানা’ বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম সফল সিনেমা। এটি সে সময় আয় করে প্রায় ১৯ কোটি টাকা।

শাহরুখ খান-কাজল মুখার্জি
দর্শকের কাছে আর যাই হোক, কাজল-শাহরুখ জুটির রসায়ন নিয়ে কোনো ব্যাখ্যারই দরকার নেই! ফিল্মে কাজলের বিপরীতে শাহরুখ মানেই সুপারহিট, তাদের রেকর্ড তেমনটাই বলে। ‘বাজিগর’ থেকে ‘কাভি খুশি কাভি গম’ পর্যন্ত সব সময়ই জারি থেকেছে এই রেকর্ড। ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’ ছবির কথা তো বলাই বাহুল্য! এমনকি ‘কাল হো না হো’ বা ‘ওম শান্তি ওম’ ছবিতে কাজলের গেস্ট অ্যাপেয়ারেন্স, সেগুলোও পেয়েছে সুপারহিটের খেতাব।

রিয়াজ-পূর্ণিমা
নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে প্রথম একসঙ্গে অভিনয় করলেও রিয়াজ-পূর্ণিমা জুটির প্রথম ও সবচেয়ে ব্যবসা সফল সিনেমা ‘মনের মাঝে তুমি’ মুক্তি পায় ২০০৩ সালে। এই সিনেমার পর থেকেই জুটি হিসেবে জনপ্রিয়তা পান রিয়াজ ও পূর্ণিমা। ‘হৃদয়ের কথা’, ‘আকাশ ছোঁয়া ভালোবাসা’ এবং ‘এক পৃথিবী প্রেম’-এর মতো সিনেমায় অভিনয় করেন তারা।

শাকিব-অপু
জুটিপ্রথার সর্বশেষ সফল জুটি হিসেবে ধরা হয় শাকিব খান ও অপু বিশ্বাসকে। ২০০৬ সালে পরিচালক এফআই মানিকের ‘কোটি টাকার কাবিন’ ছবির মধ্য দিয়ে একসঙ্গে পথচলা শুরু তাদের। ‘কোটি টাকার কাবিন’-এর সফলতার পর এফআই মানিক এই জুটিকে নিয়ে একই বছর নির্মাণ করেন ‘পিতার আসন’, ‘চাচ্চু’, ও ‘দাদীমা’। সবগুলো ছবিই দর্শকপ্রিয়তা পায়। এ জুটির বদিউল আলম খোকন পরিচালিত ‘নাম্বার ওয়ান শাকিব খান’ ছবিটি ঢালিউডের সর্বকালের সবচেয়ে ব্যবসাসফল ছবিগুলোর তালিকায় সেরা দশে অবস্থান করে নেয়। এক দশক ধরে বড় পর্দায় জুটি ছিলেন শাকিব খান ও অপু বিশ্বাস। একসঙ্গে মোট ৭২টি ছবিতে অভিনয় করেন তারা। এ জুটির শেষ সিনেমা ছিল ২০১৬ সালের ‘সম্রাট’।
শাকিব খান ও অপু বিশ্বাস ২০০৮ সালে গোপনে বিয়ে করে সংসার শুরু করেন। ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর জন্ম হয় তাদের সন্তান আব্রাম খান জয়ের। শাকিব-অপু দুজনেই বিয়ে ও সন্তানের জন্মের বিষয়টি গোপন রেখেছিলেন। তবে ২০১৭ সালের এপ্রিলে একটি টেলিভিশন চ্যানেলে লাইভ অনুষ্ঠানে এসে বিয়ের বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ করেন অপু বিশ্বাস। তখন দুজনের মধ্যে শুরু হয় টানাপড়েন। ২০১৮ সালের মার্চে শাকিব-অপুর দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটে। শাকিব আগে থেকেই কাজে ব্যস্ত থাকলেও অপু এখন পুনরায় চলচ্চিত্রে ব্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত