পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর আশপাশের রাসায়নিকের গুদামগুলোতে তালা ঝুলিয়ে গা ঢাকা দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। স্থানীয়রা বলছে, এতদিন আবাসিক ভবনে রাসায়নিকের গুদাম দেখেছে তারা। এ ঘটনার পর থেকে ওইসব বাড়িতে তালা ঝুলছে। তবে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ থাকার কারণেও অনেক ভাড়াটিয়া অন্যত্র চলে গেছে। কিন্তু গুদাম থাকা বাড়িগুলোতে কোনোভাবেই কেউ যেতে পারছে না। কেমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন বলছে, ভয় আর গুজবে আপাতত দূরে সরে আছেন ব্যবসায়ীরা।
সরেজমিনে গতকাল রবিবার চুড়িহাট্টার আশপাশ এলাকায় দেখা যায়, ‘হাজী ওয়াহেদ ম্যানশন’ নামের যে বাড়িটিতে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত বলে জানা গেছে তার উল্টো দিকে প্লাস্টিক দানার ব্যবসা করেন মাসুম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ঘটনা ঘটেছে সিলিন্ডারের জন্য। কেমিক্যালের জন্য নয়। তাছাড়া এখানে আমরা কেউ কেমিক্যাল ব্যবসা করি না।’
সেখান থেকে বাম পাশ দিয়ে চুড়িহাট্টা মোড়ে এলে শুরুতেই নবকুমার দত্ত রোড। সেখানে চারতলা একটি আবাসিক ভবনের ভেতরে লোকজন দেখা গেলেও প্রধান ফটকে ছিল তালা। কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার পর দেখা গেল, দারোয়ান দূরে অবস্থান করছেন। শুধু ওই বাড়ির কেউ এলে বা ফোন করে জানালেই তিনি তালা খুলে দিচ্ছেন। খানিক পর বাড়িটির ভেতর থেকে বয়স্ক এক ব্যক্তি বের হন। কিন্তু কাছে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি দ্রুত সরে পড়েন। পরে দারোয়ান বলেন, ‘বাসায় এখন কেউ নেই। যারা আসছেন তারা ভাড়াটিয়া। গোসল করার জন্য তারা বাসায় আসছেন।’ বাড়িটিতে রাসায়নিকের কোনো গুদাম আছে কি নাÑ জানতে চাইলে কোনো জবাব না দিয়ে দ্রুত চলে যান তিনিও। স্থানীয়রা জানায়, এ ভবনের দোতলা আর নিচতলাতেও গুদাম রয়েছে।
চুড়িহাট্টা মোড়সংলগ্ন একটি আবাসিক ভবনের ভাড়াটিয়া রেজুয়ানা আক্তার জানান, ‘এমন (আগুন) ঘটনা ঘটলেই ব্যবসায়ীরা কয়েকদিনের জন্য পালিয়ে যায়। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার আগের মতোই অবস্থা দেখা যায়। মাঝখান থেকে আমরা হারাই আমাদের স্বজনদের।’ আশপাশ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, এখনো সেখানে থমথমে পরিস্থিতি। ‘মোমেনা জুয়েলার্সের’ কর্মচারী শওকত আলী বলেন, ‘এত বড় ঘটনার পর আমরা নিজেরাই তো স্বাভাবিক হতে পারছি না। ব্যবসা করি এজন্যই দোকান খোলা রেখেছি। কিন্তু ক্রেতাশূন্য দোকান। যারা আসছেন তারা ঘটনাস্থল দেখতে আসছেন। তিন দিন ধরে বেচা-বিক্রিও স্বাভাবিকভাবে করতে পারছি না আমরা।’
এদিকে গুজব আর ভয়ের কারণে কয়েকজন ব্যবসায়ী দূরে সরে আছেন জানিয়ে বাংলাদেশ কেমিক্যাল অ্যান্ড পারফিউমারি মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক নুরুল আকতার বলেন, ‘চকবাজারে ২৯টা আইটেমের বাইরে এক কেজি কেমিক্যালও নেই। যারা সরে আছেন তারা হয়তো ভয় পেয়েছেন। গ্যারান্টি দিয়ে বলছি, সেখানে এমন কোনো গুদাম নেই।’ কেমিক্যাল ব্যবসার ক্ষতি হলে দেশের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে জানিয়ে এ ব্যবসায়ী বলেন, ‘সরকার চাইলে আমরা কেরানীগঞ্জে যেতে পারি। কিন্তু সেটা হবে বাতাসের বুলি। কারণ বাংলাদেশের সব ইন্ডাস্ট্রি কেমিক্যালের ওপর চলে। এখানকার যে অবকাঠামো তেমন অবকাঠামো তৈরি করতে অনেক সময় লাগবে। কেমিক্যাল মার্কেট ট্যানারি বা পোশাক খাতের মতো নয়। চাইলেই এটাকে সরিয়ে ফেলা সম্ভব নয়।’
কেরানীগঞ্জে অবকাঠামো তৈরি করতে কতদিন লাগবে এ প্রশ্নের জবাবে নুরুল আকতার বলেন, ‘যদি কম করেও ধরি তারপরও কমপক্ষে পাঁচ বছরের আগে সেটা সম্ভব নয়। আর সবকিছু ঠিকঠাক না থাকলে ১০ বা ২০ বছরও লাগতে পারে চকবাজারের মতো পরিবশে তৈরি হতে।’ শুধু কেমিক্যালের জন্য এ দুর্ঘটনা ঘটেনিÑ এ দাবি করে তিনি আরও বলেন, ‘একটা দুর্ঘটনা ঘটলে সব কেমিক্যাল ব্যবসায়ীর দোষ হবে এটা কাম্য নয়। সরকারের উচিত প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা। পাশাপাশি এটাও বিবেচনায় রাখা যে এখানেই যেন আইন মেনে কেমিক্যাল ব্যবসা করতে পারে।’
অবৈধ কোনো কেমিক্যাল গুদাম চকবাজারে নেই বলে দাবি করেন অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আরিফ হোসেন। তিনি বলেন, ‘ওই এলাকাতে কোনো কেমিক্যাল ব্যবসায়ী নেই। তাই বাড়ি তালাবদ্ধ রাখারও কোনো কারণ নেই। তাছাড়া ২৯টি আইটেমের বাইরে কোনো ব্যবসায়ী কোনো কেমিক্যালের গুদাম রাখতে পারবে না। যদি রাখে তাহলে তাকে এই ব্যবসায়ী সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়।’ এ ধরনের অভিযোগে এ পর্যন্ত কোনো ব্যবসায়ী বহিষ্কার হয়েছেন কি নাÑ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না। এ পর্যন্ত এমন কোনো অভিযোগ আমাদের ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আসেনি। তবে আমরাও চাই গুদাম সরিয়ে নেওয়া হোক। কিন্তু সে ক্ষেত্রে আমাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।’
