বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৫ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

আদি চিকিৎসার সাত বিস্ময়

আপডেট : ০২ মার্চ ২০১৯, ১১:৩৪ পিএম

আদিকালে মানুষ বৃদ্ধ হওয়ার সুযোগ পেত খুব কম। তার আগেই রোগশোকে ভুগে কিংবা দুর্ঘটনায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে প্রাণ হারাত তারা। আধুনিক সময়ে অবশ্য সাধারণ সর্দি-কাশি থেকে শুরু করে প্রাণঘাতী ক্যানসারেরও সুচিকিৎসা সম্ভব। মাত্র ১০০ বছর আগেও অনেক চিকিৎসা পদ্ধতির মূল সূত্র চিকিৎসকদের কাছে ছিল অধরা। যদিও প্রাচীনকাল থেকেই রোগ-শোক থেকে আরোগ্য লাভের উপায় খুঁজেছে মানুষ। বর্তমান চিকিৎসাব্যবস্থা এর ধারাবাহিকতা মাত্র। আধুনিক চিকিৎসায় নতুন নতুন সংযোজনের ধারাবাহিকতা হাজার বছর আগেই শুরু হয়েছিল। লিখেছেন পরাগ মাঝি

প্রাচীন চিকিৎসায় এগিয়েছিলেন নারীরা
বর্তমান মিসরের কায়রো থেকে ২০ মাইল দক্ষিণের প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা ‘সাকারা’। পাঁচ হাজার বছর আগে প্রাচীন মিসরের মেমফিস শহরের গোরস্থান ছিল এই এলাকাটি। পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো স্থাপনা ফারাও জোসারের মমি রাখা পিরামিডটি এই অঞ্চলেই যুগের পর যুগ ধরে টিকে আছে। এই এলাকাতেই পাওয়া গেছে আরেকটি সমাধিক্ষেত্র। মেরিট তাহ্ নামে এক নারী চিকিৎসক এই সমাধিতে চিরনিদ্রায় শায়িত। আনুমানিক ২৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তিনি বেঁচেছিলেন। সমাধিতে হায়ারোগ্লিফিক লিপিতে লেখা তার পরিচয়টি ছিল ‘প্রধান চিকিৎসক’।
এই আবিষ্কারের পর গবেষকরা বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যান এই ভেবে যে, আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে প্রাচীন মিসরের নারীরা চিকিৎসাক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপদে আসীন ছিলেন।
পিসাশেট নামে আরও এক নারী চিকিৎসকের প্রমাণ পাওয়া যায়, যিনি মেরিট তাহ্-এর ২০০ বছর পর পৃথিবীতে ছিলেন। প্রভাবশালী যাজক আকা আখেথেটেপ-এর মা ছিলেন তিনি। আখেথেটেপের সমাধিক্ষেত্রে তাকে স্মরণ করা হয়েছে। পিসাশেটের পরিচয় হিসেবে লেখা আছে তিনি নারী চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। এ থেকেই বোঝা যায়, সে সময়ে নারীদের চিকিৎসক হওয়া কোনো বিরল ঘটনা ছিল না। বরং অসংখ্য নারী সে সময় চিকিৎসাক্ষেত্রে অবদান রেখেছিলেন। পিসাশেট এমন চিকিৎসক নারীদের প্রধান ছিলেন এবং তিনি তাদের প্রশিক্ষণ দিতেন। মেরিট তাহ্ এবং পিসাশেট দুজনই প্রাচীন মিশরীয় সমাজে সম্মানের পাত্রী ছিলেন।

খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ অব্দে চোখের ছানি অপারেশন
সংস্কৃত ভাষায় লেখা ‘সুশ্রুতা সামহিতা’কে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীনতম চিকিৎসা বই হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এটি ঠিক কবে লেখা হয়েছিল সে সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। এই বইয়ের যেসব কপি পাওয়া গেছে তার কোনোটাই আসল কপি নয়। পূর্ববর্তী মূল বই থেকে এগুলোর পুনর্মুদ্রণ হয়েছিল। তবে ধারণা করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ থেকে ৬০০ অব্দে এই বইটি লেখা হয়েছিল। উত্তর ভারতীয় শহর বেনারসের চিকিৎসক এবং শিক্ষক ছিলেন সুশ্রুত। তার শল্যচিকিৎসা সংক্রান্ত জ্ঞানকে লিপিবদ্ধ করে এর নাম দেওয়া হয় ‘সুশ্রুত সমহিতা’।
নিজের সময়ের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে ছিলেন সুশ্রুত। তিনি তার ছাত্রদের মধ্যে অসুস্থ ব্যক্তির শরীরে কাটাছেঁড়ার জ্ঞান বিতরণ করতেন। এক্ষেত্রে চিকিৎসা শুরুর আগে ছাত্রদের তিনি নানাভাবে দক্ষ করে তুলতেন। প্রথমে কোনো ফলের বাকল কেটে এর ভেতর থেকে বীচি বের করে আনতে ছাত্রদের প্রশিক্ষণ দিতেন। এই কাজের মধ্য দিয়ে মানব শরীর থেকে অনাহূত ক্ষতিকর বস্তু বের করে আনার জ্ঞান নিত সুশ্রুতর ছাত্ররা। এছাড়া মৃত প্রাণীদের শরীর কাটাছেঁড়ার মাধ্যমেও তারা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করত।
সুশ্রুত সমহিতা থেকে চোখের ছানি অপারেশন এবং প্লাস্টিক সার্জারি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। চোখের ছানি অপারেশনের ক্ষেত্রে বুড়ো আঙুল এবং তর্জনি ব্যবহার করে প্রথমে চোখের পাপড়িগুলোকে মেলে ধরা হতো। তারপর সুইয়ের মতো সূক্ষ্ম কোনো যন্ত্র দিয়ে চোখের মণির পাশ দিয়ে ছিদ্র করা হতো। তারপর চোখে দুধ ছিটিয়ে দেওয়া হতো এবং কিছু হারবাল ওষুধও ব্যবহার করা হতো। এভাবে চোখের মণির পর্দায় উজ্জ্বলতা ফিরে না আসা পর্যন্ত তা পরিষ্কার করা হতো। সার্জারির ইতিহাস বলে, তিন হাজার বছর আগে সুশ্রুতই সফলভাবে প্লাস্টিক সার্জারি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কপাল থেকে চামড়া কেটে তিনি তা নাকে প্রতিস্থাপন করতে পারতেন।

স্কার্ভি ঠেকিয়েছিল একটি গাছ
১৫৩৬ সালের কথা। নাবিক জ্যাক কার্টিয়ারের জাহাজ কানাডার কুইবেক সিটির কাছাকাছি সমুদ্র এলাকা স্ট্যাডাকোনার বরফে আটকে গেছে। কোনো দিকে যাওয়ার উপায় ছিল না তার। তাই এখানেই কার্টিয়ারের সঙ্গীরা অবস্থান নিল অনির্দিষ্টকালের জন্য। তাদের কাছে ছিল সীমিত খাবার। প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে তাদের অনেকেই এমন একটি রোগে আক্রান্ত হলেন যে, মুখ থেকে দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করল। তাদের দাঁতের মাড়ি পঁচে যেতে শুরু করেছিল। এমনকি দাঁতের গোড়াও আলগা হয়ে যাচ্ছিল। আসলে তারা স্কার্ভি রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। বর্তমানে আমরা সবাই জানি যে, ভিটামিন সি-এর অভাবে এই রোগ হয়। কিন্তু সেই সময়ে এমন অনাকাক্সিক্ষত রোগে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লেন কার্টিয়ার। তিনি জানতেন না কী করতে হবে তাকে। ১৯৩৪ সালে প্রথম অভিযানের সময় স্ট্যাডাকোনা থেকে দম অ্যাগায়া এবং তাইগোঁয়াগিঁ নামে দুই তরুণকে অপহরণ করেছিলেন কার্টিয়ার। নতুন ভূমি বিজয়ের প্রমাণ হিসেবে তিনি এদের ফ্রান্সে নিয়ে যেতে চাইছিলেন।
দম অ্যাগায়ার কাছে কার্টিয়ার ছিল বিশ^াসঘাতকের মতো। কিন্তু তারপরও কার্টিয়ারকে তিনি একটা উপায় বলে দিলেন। জানালেন, ‘অ্যানেদ্দা’ নামে এক গাছের কথা। যা থেকে পথ্য তৈরি করা যায়। কিন্তু ফরাসি নাবিকরা তার কথায় পুরোপুরি বিশ^াস করল না। তারা ভাবল অ্যাগায়া হয়তো কোনো বিষাক্ত গাছের সন্ধান দিয়েছে, যা খেলে মরে যাবে সবাই। তাই এই পরীক্ষার জন্য প্রথমে দুই নাবিককে ব্যবহার করল কার্টিয়ার এবং দেখা গেল, দ্রুততম সময়ের মধ্যেই তারা সেরে উঠেছে। তারপরই শুরু হলো এই গাছ নিয়ে কাড়াকাড়ি। এই গাছের জন্য তারা একে অপরকে খুন করে ফেলতেও দ্বিধাগ্রস্ত ছিল না। শেষ পর্যন্ত পুরো একটি গাছই তারা সাবাড় করে দিল।
তবে, এর পুরস্কার হিসেবে অ্যাগায়াকে মুক্তি দেয়নি কার্টিয়ার। বরং তার সঙ্গে আরও নয়জনকে অপহরণ করে নিজ দেশে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। কার্টিয়ারের জাহাজকর্মীরা স্কার্ভি থেকে অ্যানেদ্দা গাছের মাধ্যমে মুক্তি পেলেও সে সময় এ ব্যাপারটি ততটা পরিচিতি পায়নি। ফলে প্রাণঘাতী স্কার্ভি থেকে মুক্তি পেতে এবং এর চিকিৎসা পদ্ধতি বের করতে আরও ২০০ বছর সময় লেগেছিল।

সর্বরোগের প্রতিষেধক থেরিয়াক  
প্রাচীনকালে রাজা হওয়া এত সহজ ব্যাপার ছিল না। প্রতিনিয়ত তাদের আততায়ীর ভয় তাড়া করে ফিরত। তাদের বিরুদ্ধে একের পর এক হত্যা ষড়যন্ত্রও হতো। তাই কৃষ্ণসাগর তীরবর্তী তুরস্কের পন্টাস অঞ্চলের রাজা ৬ষ্ঠ মিথ্রাদেতস এক ফন্দি আঁটলেন। তিনি চাইছিলেন, নিজেকে এমনভাবে গড়ে তুলবেন যেন বিষপ্রয়োগ করলেও তার কিছু না হয়। এ জন্য তিনি অল্প অল্প করে বিষের ডোজ নিতে শুরু করেন। তিনি বন্দিদের ওপর বিষপ্রয়োগ করেও নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন এবং তৈরি করেন মিথ্রিদেত নামে একটি ওষুধ। নানা ধরনের প্রতিষেধক এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়।

image
প্রথমে চিকিৎসায় এগিয়েছিলেন নারীরা


শেষ পর্যন্ত ওই ওষুধ রোমান সৈন্যদের হাত থেকে মিথ্রাদেতসকে বাঁচাতে পারেনি। খ্রিস্টপূর্ব ৬৬ অব্দে পম্পের সৈন্যদের কাছে পরাজিত হন তিনি। এভাবেই মিথ্রাদেতস ওষুধ নির্মাণের ফর্মুলাটি পৌঁছে যায় রোমে। পরে সম্রাট নিরোর চিকিৎসক অ্যান্ড্রুমাচুস-এর সঙ্গে আরও ৬৪টি উপাদান সংযুক্ত করে তৈরি করেন থেরিয়াক। এইসব উপাদানের বেশিরভাগই ছিল উদ্ভিজ্জ। এমনকি এর সঙ্গে হেরোইনের মূল উপাদান অপিয়াম এবং সাপের মাংসের উপাদনও যুক্ত করা হয়েছিল।
সর্বরোগের ওষুধ থেরাইক সে সময় ছিল মহামূল্যবান। দ্বাদশ শতকে এই ওষুধের শীর্ষ রপ্তানিকারক ছিল ভেনিস। ১৭৪৫ সালের পর থেকে এর চাহিদা হ্রাস পেতে শুরু করে, যখন ইংলিশ চিকিৎসক উইলিয়াম হেবারডেন ঘোষণা করেন, ওষুধটি আসলে এতটা কার্যকর নয়। বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য রোমানরা থেরাইক নিয়ে নানা অযাচিত গল্প তৈরি করেছে। তবে, ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপের বিভিন্ন ফার্মেসিতে এই ওষুধটির উপস্থিতি দেখা যেত।

ঊনবিংশ শতকের সাধারণ চেতনানাশক
৬০ বছর বয়সী জাপানি নারী কান এইয়া। তিনি তার পরিবারের প্রায় সবাইকেই হারিয়েছেন স্তন ক্যানসারের জন্য। তার বোনেরা সবাই এই নির্মম রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারান। তাই যখন তার বাম স্তনে একটি টিউমার বাসা বাঁধতে শুরু করে, তিনি ভালো করেই জানতেন কী ঘটতে যাচ্ছে। তবে, তার জন্য একটি সুযোগ ছিল। সেই সুযোগটি হলোÑ একটি অস্ত্রোপচার পরীক্ষায় অংশ নেওয়া।
সেইশু হানাওকা (১৭৬০-১৮৩৫) কিটোতে মেডিসিনের ওপর পড়াশোনা করেছিলেন। পড়া শেষে তিনি তার নিজ এলাকা জাপানের হিরায়মাতে ফিরে আসেন। এ সময় তিনি তৃতীয় শতকের চীনা শল্যচিকিৎসক হুয়া তো’র একটি ওষুধ নিয়ে মেতে ওঠেন। ওই ওষুধটি তীব্র ব্যথায় রোগীদের ঘুম পাড়িয়ে রাখত। একইভাবে হানাওকা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তৈরি করেন সুসেনসান নামে একটি ওষুধ। এটি ছিল আসলে চায়ের মতো একটি গরম পানীয়।
সুসেনসান ছিল একটি মারাত্মক ওষুধ। একটু হেরফের হলেই মানুষ মরার উপক্রম হতো। কিন্তু সঠিক পরিমাণে কাউকে গ্রহণ করাতে পারলে ওই ব্যক্তি ৬ থেকে ২৪ ঘণ্টার জন্য অচেতন হয়ে যেত। আর এই অচেতনের সময়টাই হতে পারে অস্ত্রোপচারের জন্য উৎকৃষ্ট সময়।
১৮০৪ সালের ১৩ অক্টোবর হানাওকা কান এইয়ার টিউমার অপসারণ করেন। এক্ষেত্রে তাকে অচেতন করার জন্য সুসেনসান ওষুধটি ব্যবহার করেছিলেন হানাওকা। অস্ত্রোপচার করে টিউমার আলাদা করলেও সে বছরই মারা গিয়েছিলেন কান এইয়া। কিন্তু ওই অস্ত্রোপচারটিই আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির দিগ্দর্শন হিসেবে কাজ করছে।

ইউরোপে উনিশ শতকের জোঁক চিকিৎসা
চিকিৎসায় জোঁকের ব্যবহার হাজার বছরের পুরনো। এমনকি, এই চিকিৎসা এখনো ক্ষেত্রবিশেষে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচারের রোগীদের শিরায় রক্ত সঞ্চালনকে স্বাভাবিক করার জন্য ব্যবহৃত হয়। কিন্তু উনিশ শতকে পশ্চিমা দেশগুলোতে চিকিৎসা ব্যবস্থায় জোঁকের ব্যবহার ছিল একটি বৈপ্লবিক উদ্যোগ। ফরাসি চিকিৎসক ফ্রাঙ্কোস-জোসেফ-ভিক্টর ব্রোসিস এই চিকিৎসাকে ব্যাপক জনপ্রিয় করেছিলেন। প্রায় সব রোগের জন্যই তিনি এই জোঁক ব্যবহার করতেন। এসব চিকিৎসার মধ্যে জোঁককে রোগীর শরীরের রক্তমেহন করতে দেওয়া থেকে শুরু করে জোঁক দিয়ে তৈরি তেলও চর্মরোগে ব্যবহার করা হতো। এটি এতই জনপ্রিয়তা পেয়েছিল যে, সে সময়ে সারা পৃথিবীজুড়েই জাহাজের পিপা ভর্তি জোঁক আমদানি-রপ্তানির বড় বাজার গড়ে ওঠে। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, বনজঙ্গল থেকে জোঁক প্রায় বিলুপ্ত হতে যাচ্ছিল। তবে, সে সময় জোঁকের বিশাল খামারও গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন এলাকায়।

আধুনিক সিজার উগান্ডায়
১৮৮৪ সালেও সন্তান প্রসবে মায়েদের সিজার কোনো অকল্পনীয় ব্যাপার ছিল না। এটা রোমের সম্রাট সিজারের সময় থেকেই প্রচলিত। শিশুর মৃত্যুহার কমানোর জন্যই এ ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতির অনুমোদন দিয়েছিলেন সম্রাট। স্বাভাবিকভাবেই যদি প্রসূতির পেট কেটে কোনো সন্তানের জন্ম হতো, তবে সেই প্রসূতির বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকত খুব কম।
শত শত বছর ধরে এই সিজার পদ্ধতি অনেক নবজাতকের জীবন বাঁচিয়েছে। কিন্তু মায়েদের জন্য এটা ছিল একটি ভয়ংকরতম অভিজ্ঞতা। এক্ষেত্রে প্রায় সময়ই তাদের প্রাণহানি ঘটত। এমনকি অ্যান্টিসেপটিক এবং অ্যানেস্থেসিয়া আবিষ্কারের পরও এটি ছিল একটি ভয়ংকর বিকল্প পদ্ধতি। তাই এডিনবার্গের সার্জনরা আশ্চর্য হয়ে গেলেন রবার্ট ফ্রাঙ্কলিনের একটি লেকচার শুনে। ফ্রাঙ্কলিন আফ্রিকার উগান্ডায় অনুষ্ঠিত একটি সফল সিজার অপারেশনের গল্প শোনাচ্ছিলেন তাদের। মা ও শিশু উভয়ের জীবন বাঁচানোই ছিল ওই অস্ত্রোপচারের লক্ষ্য। অস্ত্রোপচারের আগে প্রসূতি মাকে একটি কলা দিয়ে তৈরি ওয়াইন খেতে দেওয়া হয়েছিল। ওই ওয়াইন দিয়েই অস্ত্রোপচারকারী সার্জন তার হাত এবং পেটের মধ্যে যেখানটি কাটাছেঁড়া হবে সেই জায়গাটি ধুয়ে নিলেন। মূলত কোনো প্রকাশ ইনফেকশন যেন না হয়, সে জন্য এই ব্যবস্থা নিয়েছিলেন চিকিৎসক। পরে তিনি পেটের ওপরের ত্বকটি একটি দাগ কাটার মতো করে কেটে নিলেন এবং মূত্রথলির দেয়াল পাড়ি দিয়ে বাচ্চাকে খুব সাবধানে বের করে আনলেন। তারপর বের করে আনা হয় গর্ভফুল।
সফলভাবে বাচ্চা ও গর্ভফুল বের করে আনার পর ওই সার্জন সাতটি জীবাণুমুক্ত লোহার কাঁটা দিয়ে কেটে ফেলা চামড়ার দুই প্রান্ত কাছাকাছি এনে সুতো দিয়ে বেঁধে দিলেন। তারপর তিনি একটি ভেষজ উপাদানের পেস্ট লাগিয়ে দিলেন ওই ক্ষতস্থানটিতে এবং একটি কলাপাতা স্থানটির ওপর রেখে ব্যান্ডেজ করে দিলেন। মাত্র এগারো দিনের মধ্যে ওই মা এবং ছেলে হেসে হেসে চিকিৎসালয় ছাড়লেন।
ফ্রাঙ্কলিনের ওই লেকচারের পরই পশ্চিমা দেশগুলোতে সিজার অপারেশনে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। এটি এখন আমাদের দেশেও ব্যাপক জনপ্রিয়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত