আত্মসমর্পণের পথে আরও অনেক মাদক ব্যবসায়ী

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০১৯, ০৩:১৬ এএম

চলমান মাদক অভিযান এবং এসব অভিযানের সময় বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার ঘটনায় ইয়াবাসহ মাদক কারবারিরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার তালিকাভুক্ত মাদক কারবারিরা অভিযানের ভয়ে বাড়িঘর ছাড়া। কেউ কেউ গত দুই মাসে বিদেশে পালিয়ে গেলেও তাদের আত্মীয়স্বজনরা সবসময়ই আতঙ্কে দিনযাপন করছেন। ইয়াবা কারবারিরা অনেকেই বন্দুকযুদ্ধে মৃত্যু হওয়ার থেকে আত্মসমর্পণ করাকেই শ্রেয় মনে করছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়া মাদক তথা ইয়াবা ব্যবসার লাগাম টেনে ধরতে প্রধানমন্ত্রী অভিযান জোরালো করার সিদ্ধান্ত দেন ২০১৬ সালে। সেই সময় থেকেই মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হয়। বিভিন্ন সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, মাদক কারবারিদের সঙ্গে কথা বলা হয় এবং তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু কারবারিরা গা-ঢাকা দেয় এবং ইয়াবা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। সে সঙ্গে অপরাধও বাড়তে থাকে। এরই এক পর্যায়ে গত বছর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী ও ইয়াবা কারবারিদের তালিকা করে এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা ও তাদের বাড়িতে অভিযান শুরু করে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনেক মাদক ব্যবসায়ী এক উপসচিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোনোভাবেই যখন ইয়াবা ব্যবসা বন্ধ করতে সরকার ব্যর্থ হয়, তখনই এদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর মনোভাবের সিদ্ধান্ত হয়। তালিকা ধরে অভিযান এবং তারাও অনেকে পাল্টা আক্রমণের চেষ্টা করে, এতে বন্দুকযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা বাড়তে থাকে।

জানা গেছে, ২০১৮ সালে ৬৭ জন ইয়াবা কারবারি বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। এরপর সরকার ঘোষণা দেয়, এভাবেই অভিযান চলবে। পাশাপাশি তালিকাভুক্ত ব্যবসায়ীদের ঘরবাড়িতে পুলিশের নজদরদারি ও টহল বাড়তে থাকে। টেকনাফ ও উখিয়া এবং কক্সবাজার জেলায় এক মাসে ১০ জন বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পর ইয়াবা কারবারিদের পক্ষ থেকেই আত্মসমর্পণের প্রস্তাব আসে। সরকারও তাতে সাড়া দেয়। কিন্তু গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ১০২ জনের আত্মসমর্পণের পরও ইয়াবা ব্যবসা চলতে থাকে। তালিকাভুক্ত বাকি ১ হাজার ১৫০ ইয়াবা কারবারি পালিয়ে থাকে এবং ইয়াবা ব্যবসা অব্যাহত রাখে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা বলেন, ইয়াবা জিরো পর্যায়ে আনতে প্রধানমন্ত্রীও অভিযান অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, মাদক ব্যবসায়ীদের ধরতে এটা একটা কৌশল। কারণ গত ১৬ দিনের অভিযানের পর আবারও মাদক কারবারিরা আত্মসমর্পণের সুর তুলছে। তারা এলাকায় স্থানীয় প্রতিনিধি, পুলিশ প্রশাসন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে বিভিন্নভাবে তদবির করছে অভিযান বন্ধ করতে। বন্দুকযুদ্ধে তারা মরতে চায় না।

গত ১৬ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার জেলার টেকনাফে ১০২ ইয়াবা কারবারির আত্মসমর্পণের পর আবারও সরকার মাদক অভিযান চালায়। এতে গত ১৭ দিনে ১৫ জনের বেশি বন্দুকযুদ্ধে আহত হয় এবং মাদকসহ শতাধিক ব্যক্তি আটক হয় বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে। এছাড়া কক্সবাজার, ফেনী, ময়মনসিংহ, কুষ্টিয়া, দিনাজপুরসহ তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ীরা আত্মসমর্পণ করতে চায়।

কক্সবাজার জেলার পুলিশ সুপার মাসুদ চৌধুরী গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে শুনছি অনেকেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায়। তারা কথাবার্তা বলছে, ভয়ে হয়তো আমাদের কাছে সরাসরি আসছে না। তারা একত্রিত হয়ে আমাদের কাছে এলে অবশ্যই তাদের একত্রে আত্মসমর্পণ করানো হবে।

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা মাদককে না বলছি এবং কক্সবাজারের মতো অন্য কয়েকটি জেলাতেও মাদকের গডফাদাররা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায়। আমরাও সেই সুযোগ দিতে চাই। কক্সবাজার ও আরও কয়েকটি জেলায় আমরা আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান করব। আমরা বার্তা দিতে চাই, যারা মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছেন বা গডফাদারই হোন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, মাদক ব্যবসায়ীরা যদি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে না আসে, তাহলে কঠোরতম যে ব্যবস্থা রয়েছে আমরা সে জায়গাতেই যাব। যতদিন পর্যন্ত আমরা যুদ্ধে জয়ী না হই, ততদিন পর্যন্ত মাদকবিরোধী অভিযান চলমান থাকবে। এখন তারা জানে কী সিদ্ধান্ত নেবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত