কেবলি কথার ফুলঝুরি, কেবলি মিথ্যে অঙ্গীকার!

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০১৯, ১০:৩৮ পিএম

এ বছর আন্তর্জাতিক নারী দিবসের মূল সেøাগান হচ্ছে ‘ব্যালেন্স ফর বেটার’। ইংরেজি এই বাক্যের বাংলা তর্জমা দাঁড়ায় ‘আরও ভালোর জন্য ভারসাম্য’। অর্থাৎ আরও সমৃদ্ধি ও কল্যাণের জন্য দরকার নারী-পুরুষের লৈঙ্গিক বৈষম্যহীন এক সমতার সমাজ। এই দাবি বাংলাভাষাভাষীদের কাছে নতুন কিছু নয়। বহু আগে বেগম রোকেয়া নিজেই এই দাবি করেছেন। সমতার প্রয়োজনীয়তার কথা বোঝাতে গিয়ে রোকেয়া শকটের উদাহরণ টেনে বলেছেন, যে শকটের এক চক্র বড় (পতি) এবং এক চক্র ছোট (পত্নী) সেই শকট বেশি দূর অগ্রসর হতে পারে না।

ভারসাম্য না থাকলে কিছুই এগোয় না। না ব্যক্তি-মানুষ, না সামষ্টিক-সমাজ। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে এই একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকেও আমাকে আজ স্বাধীনতা হরণের গল্প বলতে হচ্ছে। আমাদের দেশে কন্যাশিশুটি বড় হতে-হতে তার স্বাধীনতা হরণ হতে থাকে। মেয়েটি লক্ষণগণ্ডির ভেতর বন্দি হতে থাকে ক্রমাগত। আমাদের সংস্কৃতিতে মেয়েটিকে, সে যে অর্থনৈতিক অবস্থা থেকেই আসুক না কেন, বড় করা হতে থাকে বিধিনিষেধের ডোরে বেঁধে। সাংস্কৃতিক এই আচার-আচরণের ভেতর দিয়েই হতে থাকে পুরুষের ‘পুরুষ-মন’ আর নারীর ‘নারীত্ব’ নির্মাণ। সাংস্কৃতিক এই নির্মিতির ওপরেই আলো ফেলেছিলেন সিমোন দ্য বোভোয়ার। তিনি বলেছিলেন, ‘ওয়ান ইজ নট বর্ন, বাট রেদার বিকামস, অ্যা ওমেন’। অর্থাৎ ‘কেউ নারী হয়ে জন্মায় না, বরং ধীরে ধীরে নারী হয়ে ওঠে’।

নারী কী করতে পারবে আর কী করতে পারবে না সেটির দীর্ঘ তালিকা প্রস্তুত করে রেখেছে এই সমাজ। সেই ছাঁচে বাঁধা গণ্ডির বাইরে গেলেই নারীর জীবন হয়ে ওঠে যুদ্ধক্ষেত্র; হয়ে ওঠে বিধ্বস্ত ভূখ-। নারীর মুক্তির জন্য শিক্ষা আর অর্থনৈতিক মুক্তি অত্যন্ত জরুরি। সেদিকে বাংলাদেশ এগিয়েছে বহুদূর। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে শিক্ষার নানান স্তরে আজকাল ছেলে শিক্ষার্থীদের চেয়ে মেয়ে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বেশি। আর ফলাফলও উজ্জ্বল। কিন্তু আসল গণ্ডগোলটা বাধে নারীর বিদ্যাশিক্ষা সমাপ্ত হওয়ার পর। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সমাপ্ত করেও বহু নারী আজও ঘরে বসে থাকতে বাধ্য হন। কারণ ‘স্বামীর বাড়ি’ থেকে তাকে চাকরি-বাকরি করতে ‘অনুমোদন করে না’। তারা কেউ ঘরকন্নার কাজ করেন, রাঁধেন-বাড়েন, সন্তান লালন-পালন করেন।

আবার বহু নারী যারা চাকরি করেন, তারা সিসিফাসের মতন বয়ে চলেন এক অশেষ বোঝার ভার। একদিকে বাইরে তাদের অফিস সামলাতে হয়, আরেকদিকে সামলাতে হয় ঘর। নইলে ঘরে জোটে খোঁটা। জোটে ঠেস দেওয়া কথা। আসে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার চাপ। কারণ এদেশে পুরুষরা ঘরকন্নার কাজে হাত দেন না। ফলে, চাকরিজীবী নারীর বিড়ম্বনা আরও বেশি। তাছাড়া, চাকরি করে অর্থ উপার্জন করলেও সেই অর্থের ওপরেও সবসময় তার নিরঙ্কুশ অধিকার থাকে না। তাকে স্বামীর কাছে দিতে হয় অর্থ খরচের কৈফিয়ত। তাই চাকরি, বাচ্চা ও সংসার এতসব চাপ সামলাতে না পেরে তাদের অনেকেই চাকরি ছেড়ে দেন।

সার্বিকভাবে পরিবার ও সমাজের নানান পরিকাঠামো থেকে নারী পদে-পদে বাধার মুখে পড়েন। এসব বাধা কারও কম, কারও বেশি। এসব বাধার ধরন শহরে একরকম, গ্রামে আরেক রকম। কিন্তু মোটাদাগে এদেশে ধনীর ঘরে জন্ম নেওয়া নারীর বঞ্চনা ও স্বাধীনতা হরণের গল্পগুলোর সঙ্গে গরিবের ঘরে জন্ম নেওয়া নারীর বঞ্চনা ও স্বাধীনতা হরণের গল্পগুলো চরিত্র বিচারে আলাদা নয়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, এদেশে নারী হচ্ছে গরিবের মধ্যেও গরিব আর ছোটলোকের মধ্যেও ছোটলোক। তাই, সার্বিক বিবেচনায় বাংলাদেশে নারীর জীবন এক অভিশম্পাত।

এদেশের ৮২% বিবাহিত নারীই আজও নির্যাতনের শিকার। ২০১৮ সালের মার্চে এই তথ্য জানিয়েছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক। এই ঢাকাতেই গণপরিবহনে ৯৪% নারী আজও যৌন হয়রানি ও নিপীড়নের শিকার হয় বলে ২০১৮ সালের মার্চেই ব্র্যাকের জরিপে জানা গেছে। ২০১৯ সালে ৬ মার্চে অ্যাকশন এইডের আরেক জরিপ জানিয়েছে, পথে-ঘাটে চলাচলের সময় বাংলাদেশের ৮৮% নারীই অপমানজনক কথার শিকার হন। অর্থাৎ নারীকে লড়তে হয় ঘরে ও বাইরে। ফলে, এই দেশে জন্মিবামাত্রই নারীর সামনে খুলে যায় এক যুদ্ধ প্রান্তর। এখানে পদে-পদে তাকে দিতে হয় সীতার মতন সতীত্বের অগ্নিপরীক্ষা। এখানে পদে-পদে তাকে হতে হয় অহল্যার মতন যৌনক্ষুধার শিকার আর বইতে হয় অভিশাপ।

কিন্তু মাপা স্বাধীনতা আর কতদিন? লক্ষণগণ্ডি ভেঙে নারীকে এখন বের হতে হবে। এজন্য সরকার, সুশীল সমাজ, মানবাধিকারকর্মীসহ সমাজের সকল পক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারকে চাপ দিতে হবে নারীবান্ধব আইন প্রণয়ন করতে। বাংলাদেশে নারীর উন্নয়ন ও মুক্তির কী বাধা আর কী সমাধান তার সব এই লেখায় বলা সম্ভব নয়। তবে, এই নিবন্ধের যা না বললেই নয় তা হলো সিডো সনদ প্রসঙ্গ। নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপের লক্ষ্য নিয়ে জাতিসংঘ ১৯৭৯ সালে এই সনদ গ্রহণ করে। বাংলাদেশ সনদে স্বাক্ষর করলেও সনদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুটো ধারাকে বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। যে দুটো ধারাকে বাংলাদেশ ‘সংরক্ষণ’ এর আওতায় আটকে রেখেছে সেগুলোর একটিতে (২ নম্বর ধারায়) রয়েছে, নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য নিরসনে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং আইনের সংস্কারের অঙ্গীকার। আর ১৬ ধারায় রয়েছে, বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকার ও দায়িত্বের কথা।

এই দুটো ধারা থেকে অতিসত্বর ‘সংরক্ষণ’ উঠিয়ে নিতে সরকারকে চাপ দিতে হবে। অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়ন করতে সরকারকে বাধ্য করতে হবে। উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারী ও পুরুষের সমানাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এই কাজগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশে নারী ও পুরুষের বৈষম্য অনেকাংশেই কমবে এবং বাংলাদেশেও তৈরি হবে একটি ভারসাম্যের সমাজ। আর কাজগুলো করা না গেলে ‘ব্যালেন্স ফর বেটার’ স্লোগানটি হবে কেবলি কথার ফুলঝুরি; কেবলি মিথ্যে অঙ্গীকার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত