‘শরণার্থী হিসেবে পরিবারের কষ্ট দেখেছি’

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০১৯, ০১:২৭ এএম

একাত্তরে আমাদের ব্যথা, সংগ্রামের ছবি তুলেছেন ‘পদ্মশ্রী’ রঘু রাই। সারা বিশ্বের আলোকচিত্রী, সাংবাদিকদের কাছে তিনি শ্রদ্ধেয় নাম। ভারতের এই খ্যাতনামা ফটোগ্রাফার ছিলেন ছবিমেলায়।কথা বলেছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন হাবিবুল হক

ইন্দিরা গান্ধী থেকে শুরু করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মানুষ, ঘটনার ছবি কীভাবে তুলেছেন?

পত্রিকা, ম্যাগাজিনে আলোকচিত্র সাংবাদিকতা করলে এমন বড় ঘটনা বা শোকাবহ বিষয় আলোকচিত্র সাংবাদিকদের জন্য ‘বিশেষ কিছু’। মানুষ ও বিষয়গুলো থেকে তারা জীবনের সেরা ছবি পেতে পারেন। সেগুলো হতে পারে তখনকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

আমাদের শরণার্থীদের ছবিগুলো কেন আপনাকে অনন্যতা দিয়েছে?

ভারত-পাকিস্তান বিভাজন যখন সম্পন্ন হলো, আমি চার বছরের বালক। লাহোর থেকে ১শ কিলোমিটার দূরে ‘ঝাং’-এ থাকি। আমাদের পাড়ায় যেসব মুসলমান থাকে, তারা হিন্দু বাড়ি পুড়িয়ে দিতে শুরু করল। ফলে জন্মভূমি ছাড়তে হবে আমাদের সেই অনুভূতির জন্ম হলো। রাস্তার শেষ ধারের সবচেয়ে বড় বাড়িটি আমাদের, পেছনে রাস্তা আছে। কদিনের মধ্যে সব হিন্দুরা আমাদের বাড়িতে এসে বাঁচার চেষ্টা করল। এক মধ্য রাতে বাড়ি ছেড়ে আমরা জীবন বাঁচাতে দৌড় শুরু করলাম। এরপর আশ্রয় শিবির। শিবিরেই থাকতাম। আমি ছোট্ট বালক, শরীরের জন্য ভালো খাবারের দরকার। শিবিরে ডাল, রুটি পাওয়া যায়। খেতে চাইতাম না। মা বাধ্য হয়ে সামান্য দুধ জোগাড় করতেন, অল্প চিনি মিশিয়ে ভাতের সঙ্গে খেতে দিতেন। কষ্টে চলেছে। শেষে ভারতে চলে এলাম। শরণার্থী হিসেবে পরিবারের, নিজের কষ্ট দেখেছি। যখন বাংলার সীমান্ত এলাকায় এলাম, হাজার হাজার শরণার্থী নারী, ছেলেমেয়ে দেখেছি। নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তাদের কষ্ট মেলাতে পেরেছি। এ আমার খুব আগ্রহ ও গুরুত্বপূর্ণ ছবির সিরিজ।

মুক্তিযুদ্ধের ছবি কীভাবে তোলা?  

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সে এলাকায় এসেছেন। আমার ছবিতে আছে, পরে যাতে শরণার্থীদের দেখাশোনা করা হয়, সেজন্য তিনি জিপে দাঁড়িয়ে সব শরণার্থী শিবির ঘুরে দেখছেন। তার এ কাজগুলো আমাদের খুব শক্তি জুগিয়েছে। ছেলেমেয়ে, যুবকের দল তাকে দেখতে গাছের ওপর উঠছে। তারপর থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সঙ্গে একাত্ম হলাম। দুই, তিন সপ্তাহ পর নয়াদিল্লি থেকে সীমান্ত এলাকায় চলে আসতাম। পাকিস্তান সেনাবাহিনী যশোর, খুলনা খালি করে পালিয়ে গিয়েছে বলে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে যশোর, খুলনায় চলে এসেছিলাম। মুক্তিবাহিনী পুরনো রাইফেল হাতে নিয়ে, ধুতি পরে রিকশা, বাসে চলাফেরা করছে; সেসব ছবি তুলেছি। তাদের যুদ্ধের তেজ মুগ্ধ করেছে। অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা ছিল। ভারতের গুরুত্বপূর্ণ  দৈনিক ‘স্টেটসম্যান’-এ তখন আমি চিফ ফটোগ্রাফার। আমাদের সঙ্গে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ‘স্পর্শ’ ছিল। ভারতীয় বাহিনী আগ বাড়ল, আমি সেনাবাহিনীর সঙ্গে এলাম। এক ক্যাপ্টেন আমার পক্ষে নিযুক্ত হলেন। তিনি বাংলাদেশে নিয়ে এলেন। খুলনায় এলাম। তারা সেখানে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন। ছবি তুলে চলে গেলাম। পরে তারা পত্রিকার মাধ্যমে আবার খবর পাঠালেন, পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ হতে যাচ্ছে। কলকাতায় এলাম। হেলিকপ্টারে সরাসরি ঢাকায় নিয়ে এলেন। দেখলাম, জেনারেল নিয়াজী খুব অপমানিত হয়ে মাথা নিচু করে আছেন। অন্য জেনারেলদের সঙ্গে হেঁটে এসে তিনি আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করলেন।

ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে পরিচয়?

মিসেস গান্ধীর ওপর আমার বই আছে। তিনি আমাদের ১৫ বছরের শাসক, একমাত্র নারী প্রধানমন্ত্রী। যেকোনো আলোকচিত্রীর জন্য অবশ্যই তিনি খুব বড় ‘বিষয়’। ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন। জানতেন, রাজনৈতিক, সামাজিক অবস্থার খুব ভালো ছবি তুলেছি। তাই ‘বিশেষ প্রবেশাধিকার’ দিয়েছিলেন। আমরা সিমলায় গেলাম। ভুট্টো সাহেব ৯০ হাজার যুদ্ধবন্দি বিষয়ে তার সঙ্গে সেখানে আলোচনা করতে এসেছেন। তার কাছে গিয়ে বললাম, ‘হিমালয় ও সিমলা ভালোবাসেন, হিমালয়ে হাঁটছেন এমন ছবি তুলতে পারি।’ হিমালয় পেছনে রেখে, মেঘের মাঝে তিনি আমাকে এক ঘণ্টা ছবি তুলতে সময় দিলেন। সেগুলোই তার সবচেয়ে ভালো ছবি। পরে রাজীব গান্ধী বিয়ে করলেন, ছেলেমেয়ে হলো। তাদের ছবি তুলতে বাড়িতে গেলাম। রাজীব, তার পরিবার ও ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধীর ছবি তুলেছি।

মাদার তেরেসার ছবিও তো অমূল্য?

মাদারের ছবি ১৯৭০ সালে তোলা শুরু করেছি। তখন তিনি ‘সামান্য’ পরিচিত। কিন্তু খুব দৃঢ় স্বভাবের, খুব নিবেদিত মানুষ। মানুষের যত্ন করতেন, গরিবের চেয়েও গরিবের পাশে দাঁড়াতেন। এ বিষয়গুলোই আলোকচিত্রে এনেছি। শিশু, গরিবের চেয়েও গরিব মানুষের জন্য ভালোবাসা, এরপর ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা তুলে এনেছি। তিনি কে ছিলেন, কেমন ছিলেন, কী রকম দয়াশীল ছিলে আমার ছবিতে আছে।

বাবরি মসজিদ ভাঙার ছবি তো আপনার ছেলের?

বাবরি মসজিদের বিপক্ষে বজরং দল, হিন্দু সেই সংগঠনগুলোর প্রতিবাদ শুরু হলো। আমাদের বলা হয়েছিল, তাদের মসজিদ ধ্বংসের পরিকল্পনা নেই। কিন্তু শেষ দিন তাদের সামনে হিন্দু দলগুলোর রাজনীতিবিদরা আগুনঝরা বক্তৃতা করলেন। ছেলেরা খুব উত্তেজিত হয়ে গেল। পরে মসজিদ বেয়ে উঠতে লাগল। বাবরি মসজিদ আসলে উপযুক্ত মসজিদ ছিল না, আগেই ভেঙেছে। কাঠামো নেই, প্রার্থনাও হয় না। কিন্তু জঙ্গিরা অনুভব করল, এটি সেই জায়গা যেখানে তাদের রাম রাজা জন্মগ্রহণ করেছেন। ফলে একে ধ্বংস করতে শুরু করল। তাদের নেতা আদভানি। না, না, ছবিগুলো আমি তুলিনি। আমার ছেলে নিতিন রায়কে তারা মেরেছে, পাবলো বার্সিলুমিওকে মেরেছে। তাদের রক্ত ঝরছিল। কিন্তু আমার ছেলে ছিল একমাত্র ফটোগ্রাফার যে ছেলেরা মসজিদটিকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিচ্ছে, সে ছবি তুলতে পেরেছে। ছবিটি টাইম ম্যাগাজিনের ‘কভার’ হয়েছে।

নকশাল আন্দোলনের ছবি তো আপনার?

নকশাল আন্দোলনকে ছবিতে নিয়ে এসেছি। মানুষ রাস্তায় রাইফেল নিয়ে চলছে তুলেছি। সব ধরনের পরিস্থিতি তুলে এনেছি। তারা কিন্তু খুব ভয়ংকর ছিল। যে কাউকে মেরে ফেলবে এমন মানসিকতা ছিল (হাসি)। ১৯৬৮-১৯৭৪ সাল পর্যন্ত নকশালদের ছবি তুলেছি। দিল্লিতে কাজ করতাম বলে মাসে একবার আসতাম। কলকাতায় বারবার এসেছি যাতে বাংলাদেশ, নকশাল, মাদার তেরেসা, সত্যজিৎ রায়ের ছবি তুলতে পারি। সত্যজিতের সিনেমা ভালোবাসতাম বলে তার ছবি তুলেছি।

কীভাবে রঘু রাই হলেন?

এটি আমার নাম। কাজের সব পরিস্থিতিতে কঠোর পরিশ্রম করেছি, সেরাটি আমি দিতে চেষ্টা করেছি।    (২ মার্চ ২০১৯, গ্যেটে ইনস্টিটিউট, ঢাকা)

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত