মোটরসাইকেল চালিয়ে টিকে আছেন ঢাকার এই হকি তারকা

আপডেট : ২১ মার্চ ২০১৯, ০৮:৪৭ পিএম

দেশের ঘরোয়া হকির শীর্ষ পর্যায়ের খেলছেন ২০১১ সাল থেকে। সর্বশেষ প্রিমিয়ার ডিভিশন হকি লিগে বাংলাদেশ স্পোর্টিংয়ের আর্ম ব্যান্ডও তার হাতে ছিল একাধিক ম্যাচে। অথচ শফিকুল ইসলাম অনিকের নিয়ম করে স্ট্রিক হাতে মাঠে যাওয়ার উপায় নেই। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন ছুটতে হচ্ছে তাকে ঋণ করে কেনা বাইকটা নিয়ে। মাঠে খেলা নেই, অ্যাপভিত্তিক রাইডই তার জীবিকা নির্বাহের একমাত্র মাধ্যম এখন!

সদা হাস্যোজ্জ্বল, প্রাণোচ্ছল এক তরুণ অনিক। কিন্তু এই ২৬ বছর বয়সীর হাসির মাঝেই যে লুকিয়ে নিষ্ঠুর বাস্তবতার গল্প। যা কেবল ক্রীড়াঙ্গনের আঁধারে ঢাকা চিত্রটাই ফুটিয়ে তুলে। কিন্তু সেই আঁধারের জগতে আলোর মশাল জ্বালানোর যেন কেউ নেই।

জীবিকার তাগিদে পুরান ঢাকার এই তরুণ হকি খেলোয়াড় রাইড সার্ভিসে জীবিকা নির্বাহ করেন বলে এতটুকু লজ্জা করেন না। শুধু তার আক্ষেপ, মাঠে হকি নেই। হাহাকার এ নিয়ে যে- খেলাটা অন্তত নিয়মিত হলে মাঠেই ঘাম ঝরাতে পারতেন, স্টিক নিয়ে মেতে থাকতে পারতেন। ক্রিকেটার, ফুটবলারদের মতো শুধু খেলাটাকেই নিতে পারতেন পেশা হিসেবে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রিমিয়ার লিগে খেলা এই হকি তারকার সঙ্গে এই প্রতিবেদকের দেখা কাকতালীয় ভাবে। অ্যাপভিত্তিক রাইড সেবা গ্রহণ করতে গেলে হকি খেলোয়াড়টি বাইক নিয়ে হাজির। গায়ে জড়ানো টি-শার্টের লোগো বলে দিচ্ছিল হয়তো হকির সাথে জড়িত তিনি।

চলতে চলতে তাই তরুণের পরিচয় জানার চেষ্টা। তাতে যে তথ্য মেলে, জাতীয় দলে কখনো খেলতে না পারলেও প্রতিষ্ঠিত হকি খেলোয়াড় তাকে বলতেই হবে।

image

পুরান ঢাকার আরমানিটোলা স্কুলের ছাত্র অনিক। যে স্কুলকে বলা হয় দেশের হকির সূতিকাগার। ওস্তাদ ফজলু’র (ফজলুল হক) হাত ধরে হকির পাঠ নেওয়া। এরপর ছুটেছেন কামাল-জিমিদের মতো তারকাদের দেখানো পথে। ২০০৬ সালে রায়ের বাজার স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে প্রথমবার খেলেন দ্বিতীয় বিভাগ হকিতে। ২০০৯ সালে ফের দ্বিতীয় বিভাগ হকি আয়োজিত হলে রায়ের বাজারকে নেতৃত্বও দেন অনিক।

এরপর ২০১১ সালে বাংলাদেশ স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে অভিষেক তার প্রিমিয়ার ডিভিশন হকি লিগে। অনিয়মিত লিগটা ২০১৩-১৪ মৌসুমে আয়োজিত হলে খেলেন ঢাকা ওয়ান্ডার্সের হয়ে। ২০১৬ ও ২০১৮ সালে সর্বশেষ দুই আসরে খেলেছেন বাংলাদেশ স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে।

এ ছাড়া ২০০৮ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জাতীয় যুব হকিতে ঢাকা বিভাগকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। খেলেছেন সিনিয়র জাতীয় প্রতিযোগিতাতেও।

এমন এক হকি খেলোয়াড়ের আর যাই হোক রাইড সার্ভিস দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করার কথা নয়। কিন্তু হকি খেলোয়াড়দের নিয়তি যে অদ্ভুত এক চক্রে বাঁধা। পুরান ঢাকার অলি-গলিগুলো পেরোতে পেরোতে অনিক তাই বলেন, ‘‘আমাদের খেলার মানটা যদি অনেক ভালো হতো তাহলে আজ পাঠাও-উবার এসবে রোজগারের পথ খুঁজতাম না। খেলাধুলা না থাকার কারণেই এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।’’

সর্বশেষ প্রিমিয়ারে খেলা টাকা দিয়ে বাইকটা কিনেছেন অনিক। তাও যে টাকা পেয়েছেন শেষ মৌসুমে, সেই টাকায় একটা বাইকও জোটেনি। তাই বন্ধুদের কাছ থেকে সহযোগিতা নিতে হয়েছে। এখন সংসার চালানোর সঙ্গে বাইকের জন্য নেয়া লোন পরিশোধের চিন্তা নিয়েও তাকে চলতে হয় প্রতিদিন।

image

নিয়তির নির্মম এই গল্পগুলো খোলা মনেই বলে যান অনিক। চাইলেই পারতেন নিজের খেলোয়াড় পরিচয়টা গোপন করতে। কিন্তু এই তরুণ সেটি চান না। উল্টো হকির আসল চিত্রটা তুলে ধরতে চান, ‘‘খেলাকে এত বেশি ভালোবেসে ফেলেছি, এখন ছাড়ারও উপায় নেই। খেলার জন্য চাকরিকেও বেছে নিতে পারছি না। কারণ দেখা গেল চাকরি করতে গেলাম, কিন্তু যখন খেলা হবে তখন ছুটি পাবো না।’’

‘‘তাই গেল প্রিমিয়ারে যে টাকা পেয়েছে, সেটির সঙ্গে বন্ধুদের কাছ থেকে আরো কিছু ধার নিয়ে বাইক কিনে এখন এভাবে পরিবারের খরচ চালাতে হচ্ছে।’’

কিন্তু বাইক চালাতে চালাতেও প্রতিদিনই হকির টার্ফে মন চলে যায় অনিকের। তাই বলেন, ‘‘টাকা নিয়ে কিছু বলতে চাই না। সবচেয়ে বড় আক্ষেপ আমাদের অন্তত প্রতি বছর যদি লিগটা হতো, সাথে কিছু টুর্নামেন্ট। তাতে আমরা খেলোয়াড়রা অন্তত খেলা থেকে কিছু হলেও আয় করতে পারতাম। আমাদের আর পাঠাও বা উবারকে পুরোপুরি জীবিকা হিসেবে বেছে নিতে হতো না। কখনো চার বছর পর, কখনো তিন বছর পর লিগ। এসব কারণে আজ আমরা এভাবে আছি।’’

অনিকের গল্প শেষ না হতেই গন্তব্যে পৌঁছা। অনিক সাথে সাথেই আরেক রাইড ধরেন। বিদায় নিতে নিতে বলেন, ‘‘এই যে বাইক চালাচ্ছি, ভয়ও লাগে, কখনো যদি অ্যাকসিডেন্ট করে ইনজুরিতে পড়ে যাই। তখন তো খেলা পুরো দমেই থেমে যাবে। কিন্তু করার কি আছে। জীবন চালিয়ে নিতে গেলে আপনাকে কিছু করে খেতেই হবে।’’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত