জাতপাতের বিচার নয়, মানুষ সবার ঊর্ধ্বে- ফকির লালন শাহের গানের মূল কথা এমন। যেখানে বলা হয়, মানুষের পরিচয় কেবলই মানুষ। বিচার যদি করতেই হয় তাহলে মানুষ হিসেবে সে সত্য না মিথ্যা, শুদ্ধ না অশুদ্ধ, উত্তম না অধম তার ভিত্তিতেই হতে পারে। তাই সাঁইজি বলেছেন, ‘সত্য সুপথ না চিনিলে পাবিনে মানুষের দরশন।’
আগে আত্মশুদ্ধির মধ্য দিয়ে সত্য পথে আসা জরুরি। নচেৎ সকল সাধন-ভজন যাবে বিফলে। দোল পূর্ণিমার নির্মল আলোকচ্ছটায় সেই আত্মশুদ্ধির আকাঙ্ক্ষা নিয়েই রাজশাহী থেকে এসেছিলেন ফকির রহিম শাহ। বিদায়বেলায় তিনি এভাবেই বলছিলেন।
নড়াইল থেকে এসেছিলেন অঞ্জনা ফকিরানী। তীর্থধাম ছেড়ে যাওয়ার প্রাক্কালে শুক্রবার সকালে দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘রাখিলেন সাঁই কূপজল করে আন্ধেলা পুকুরে’ অতৃপ্ত আত্মক্ষুধা নিবারণে সাঁইজির এই বাণীতে বলছেন, অন্ধকারে পড়ে থেকে আত্মার কোন সার্থকতা নেই। ঈশ্বর এই জগৎ সংসারের গোলকধাঁধায় মানুষকে পাঠিয়েছে মানবাত্মার আলো ছড়িয়ে জগৎকে আলোকিত করতে। বারবার চেষ্টা সাধনা করেও এখনো বেরোতে পারিনি অন্ধকার কূপজলের অশুদ্ধতা মুক্ত হয়ে। সেই অশুদ্ধতা ঘুচিয়ে আত্মশুদ্ধির মধ্য দিয়ে বলতে চাই ‘কোথায় হে দয়াল কান্ডারি’ এই অসীম সাগর পাড়ি দিয়ে পার করো আমায়।
‘ওরে মানুষ হোসনে বে-হুশ পাবিনে তার দরশন’ দুই নৌকায় পা রেখে কখনো আত্মক্ষুধা মিটবে না। সত্য পথের সন্ধান করতে চাইলে ভেজালবিহীন একাগ্রতা ও উপলব্ধির প্রসার ঘটাতে হবে। জ্ঞানহারা হয়ে অন্ধকারে হাতিয়ে মুর্শিদের সান্নিধ্য পাওয়া সম্ভব নয়। সাঁইজির এই বাণীতেই বলেছেন ‘হুশহারা তুই হবিরে মন পাবিনে তার দরশন।’ সেই দরশনের শান্তি পেতেই প্রতিবছর ঝিনাইদহ থেকে আখড়াবাড়ির এই পূন্যধামে আসেন আমিরুল ফকির।
কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়াবাড়িতে বুধবার শুরু হওয়া তিনদিনের দোল স্মরণোৎসব আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হচ্ছে শুক্রবার সন্ধ্যায়। সেখানেই কথা হয় ফকিরদের সঙ্গে।
প্রতি বছরের মতো এবারও ফকির লালন শাহ স্মরণে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা ও লালন একাডেমির আয়োজনে পালিত হলো এই উৎসব। আর এর জন্য লালন ভক্ত ও অনুসারীরাও সারা বছর অপেক্ষায় থাকেন।
লালন একাডেমির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মো. আসলাম হোসেনের সভাপতিত্বে শুক্রবারও লালন মুক্ত মঞ্চে লালন দর্শন নিয়ে আলোচনা ও সংগীত পরিবেশিত হচ্ছে। প্রধান অতিথি আছেন খুলনা বিভাগীয় কমিশনার লোকমান হোসেন মিয়া এবং প্রধান আলোচক কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার প্রফেসর ড. সেলিম তোহা।
এ ছাড়া দোল স্মরণোৎসবকে ঘিরে আখড়াবাড়ি সংলগ্ন কালীগঙ্গা নদীর ধারে বসেছে জাঁকজমকপূর্ণ গ্রামীণ মেলা।
