খালেদ বাঙালির জন্ম ১২৯৭ বঙ্গাব্দের ১২ ফাল্গুন। খ্রিস্টীয় ক্যালেন্ডারে ১৮৯১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। জন্মস্থান সেই সময়ের ময়মনসিংহের বৌলাই; বর্তমান কিশোরগঞ্জের সাহেব বাড়ি। প্রকৃত নাম মাহমুদুর রব খালেদ। বিশিষ্ট আলেম ও দার্শনিক আবদুল হাই আখতার ও সৈয়দুন্নেসা খাতুনের পুত্র। আরেক পরিচয় তিনি শাহনামার বাংলা অনুবাদক মনিরউদ্দীন ইউসুফের চাচা।
খালেদ বাঙালি পুরোদস্তুর লেখালেখি শুরু করে দেন মাত্র ১৯ বছর বয়সে। উর্দু ও ফার্সি ভাষায় গদ্য ও পদ্য রচনায় মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন। উর্দু কাব্যের হাত ধরে হিন্দুস্তান জুড়ে খ্যাতি অর্জন করেন, সেই সূত্র ধরেই তার বন্ধুত্ব হয় সমকালীন অন্যান্য উর্দুভাষী সাহিত্যিকদের সঙ্গে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন—আবদুল গফুর বিসমিল, সলিমুল্লাহ ফাহমি, হাকিম হাবিবুর রহমান, জিগার মুরাদাবাদী, মায়েল এলাহাবাদী, নিয়াজ ফতেহপুরী, খাজা মুহাম্মদ আদেল, খাজা মুহাম্মদ মুয়াজ্জম, ফিদা আলী খান, রেজা আলী ওয়াহশাত, বদরুজ্জামান বদর এবং দিলগির আকবরাবাদী।
খালেদ বাঙালির সম্পাদনায় প্রকাশিত হতো উর্দু সাহিত্য পত্রিকা ‘আখতার’। প্রত্যন্ত বৌলাই থেকে তিনি পত্রিকাটি প্রকাশ করেন। এটি প্রকাশ হতে শুরু করে ১৯২৪ সালে। সেই সময়ে কিশোরগঞ্জের মতো একটি অখ্যাত অঞ্চল থেকে উর্দু সাহিত্য পত্রিকা বের করা সাধারণ কোনো কথা ছিল না। ‘আখতার’ পত্রিকায় যারা লিখেছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম—নিয়াজ ফতেহপুরী, দিলগির আকবরাবাদী, ওয়াকিফ বিহারি, মায়েল এলাহাবাদী এবং বিসমিল বেরিলভি। প্রত্যেকেই উর্দু সাহিত্যের ইতিহাসে স্বমহিমায় উজ্জ্বল।
লিখে কিংবা পত্রিকা সম্পাদনা করেই ক্ষান্ত হননি খালেদ বাঙালি। অবদান রেখেছেন সাংগঠনিক ক্ষেত্রেও; তার আরেক উদ্যোগ—বাজমে আদাবে বৌলাই, তথা বৌলাই সাহিত্য পরিষদ। এই সাহিত্য সংগঠনের অধীনেই বৌলাইয়ে মুশায়েরা আয়োজন করা হতো। দূরদূরান্ত থেকে আসতেন হিন্দুস্তানের গুরুত্বপূর্ণ কবি-সাহিত্যিকরা। যারা আসতে পারতেন না, তারা মুশায়েরার জন্য কবিতা লিখে পাঠিয়ে দিতেন।
খালেদ বাঙালি পরলোকগমন করেন ১৯৪৪ সাল। এই অল্প সময়ের মধ্যেই তার লেখা প্রবন্ধের সংখ্যা ২৪, কবিতা ৪০ এবং গজল ১৫০টির বেশি। তার লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হতো লখনৌ, আগ্রা, লাহোর ও পাটনা থেকে প্রকাশিত পত্রিকায়। তার উল্লেখযোগ্য কবিতার মধ্যে রয়েছে—‘বসন্তভূমি, ঢাকা’, ‘বাংলার বর্ষা’, ‘নবি মুসাকে খিজিরের উপদেশ’, ‘হানাফি সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে’, ‘ঈদ মোবারক’, ‘অপূর্ব বিলাপ’, ‘প্রথম দেখা’ এবং ‘শাহাদাতের সাক্ষ্য’। তার কবিতায় একই সঙ্গে মিলিত হয়েছিল প্রেম, স্বদেশ ও দার্শনিকতা। দুঃখজনকভাবে খালেদ বাঙালিকে আমরা মনে রাখিনি। তিনি উর্দু ভাষার কবি বলেই কি? কিন্তু তিনি তো নামের সঙ্গে ‘বাঙালি’ ব্যবহার করতেন! তার পরিবারের বাংলায় বসবাসের ইতিহাস অন্তত চারশ বছরের।
খালেদ বাঙালির কবিতা
বসন্ত-ভূমি, ঢাকা
পূর্বজদের আলোয় তোমার ললাট শোভিত, ঢাকা
ধন্য নগরী! মানুষ তোমাতে তারা হয়ে জ্বলে, ঢাকা
অপরূপ রূপে প্রতিটি পলকে মুগ্ধ-মোহিত চোখ,
আহা! অপূর্ব হৃদয় জুড়ানো আবহ তোমার, ঢাকা।
প্রাচ্যের প্রাণ তুমি হে মহান বসন্ত-ভূমি, ঢাকা।
প্রতিটি প্রকাশ হৃদয়গ্রাহী, প্রতি পলে ভরে মন
মোগল যুগের নগরী গো, করো জীবন সঞ্চরণ,
পরিপাটি ওই পোশাকে বসানো আভিজাত্যের জরি
আচারে লুকানো এশীয় জাতির জমাট আখ্যায়িকা।
প্রাচ্যের প্রাণ তুমি হে মহান বসন্ত-ভূমি, ঢাকা।
শত্রু সমুখে এখনো তোমার তেজ ভরা প্রতিরোধ,
তোমারে জড়িয়ে জ্ঞানীদের মনে অবাধ গর্ববোধ
প্রাচ্যের শত নগরীর ভিড়ে তুমি এক, অতুলন,
বাংলা শরীর; তার মাঝে এক উষ্ণ প্রাণের রেখা।
প্রাচ্যের প্রাণ তুমি হে মহান বসন্ত-ভূমি, ঢাকা।
কপালে তোমার মিটমিট করে কত না প্রদীপ জ্বলে
উন্নত শির কত মানুষেরা ঠাঁই করে নিছে কোলে
সাকি গো! তোমার প্রেমে বিহ্বল অন্তর শত শত,
যেমন শরাবে পূর্ণ পেয়ালা, কিবা বাধাহীন পাখা।
প্রাচ্যের প্রাণ তুমি হে মহান বসন্ত-ভূমি, ঢাকা।
স্বদেশের প্রেমে উদ্বেল প্রাণ তোমারে স্বর্গ মানে
বুঝে এখানেই অনন্ত সুখ, চিরপ্রাচুর্য জানে
যেভাবে ভোরের মিষ্টি বাতাস চেনে তাজা ফুল-ঘ্রাণ
শুদ্ধ হৃদয় সেভাবে তোমার রুহের চেতনে ঢাকা।
প্রাচ্যের প্রাণ তুমি হে মহান বসন্ত-ভূমি, ঢাকা।
আমাদের সব ভালো ও মন্দে যাদের স্মরণ করি
এ মাটির বুকে এখনো তাদের চিহ্নের ছড়াছড়ি,
প্রতি ফুল আর কুঁড়ি চমকায় তাদের খুশবো মেখে
এই অলিগলি জুড়ে পাওয়া যায় এখনো তাদের দেখা।
প্রাচ্যের প্রাণ তুমি হে মহান বসন্ত-ভূমি, ঢাকা।
বিদেশি পথিক ব্যথিত হৃদয় জুড়াক এখানে এসে
দুয়েক পেয়ালা শরাব গিলুক বুড়িগঙ্গায় বসে,
চোখেরা এখানে স্বপ্নালু আর দিগন্ত জোড়া রঙ
মেহেদি-রঙিন হাতের ছোঁয়ায় নীল শাড়ি একরোখা।
প্রাচ্যের প্রাণ তুমি হে মহান বসন্ত-ভূমি, ঢাকা।
যে জানে তোমার অবিনশ্বর মর্যাদা একবার
তোমার পথের এক মুঠো ধুলা পরশ পাথর তার
সে দেখে তোমায়, যেন তুমি কোনো ভুবনমোহিনী ছবি
অথবা মিঠেল স্বপ্নের শেষে অনুভূতি মধুমাখা।
প্রাচ্যের প্রাণ তুমি হে মহান বসন্ত-ভূমি, ঢাকা।
এইখানে প্রতি সাঁঝের মায়ায় অযোধ্যা দেয় ধরা,
যেন বিধাতার তুলি দিয়ে আঁকা জান্নাত মনোহরা
কিসসা তোমার শুনে দূর থেকে ছুটে আসে সব প্রাণ
সে গাথায় তুমি মাধুর্য আর কমনীয়তায় আঁকা।
প্রাচ্যের প্রাণ তুমি হে মহান বসন্ত-ভূমি, ঢাকা।
এ বাগে বাতাস এনেছে মানুষ দূর দেশ থেকে টেনে
কুপির আলোয় সেই অনুরাগ বেড়ে গেছে কয় গুণে
কোনো কোণে বসে সুর ধরলেও হয়ে উঠে উৎসব,
তোমার এমন অযুত কিসসা সকলের মনে রাখা।
প্রাচ্যের প্রাণ তুমি হে মহান বসন্ত-ভূমি, ঢাকা।
লালচে মাটির পথগুলো সেকি হোলি খেলবার দাগ?
নাকি বিকেলের লালচে আকাশ, না রঙধনুর রাগ?
নিষ্পাপ সব মুখগুলো যেন ফুটে আছে ফুল হয়ে
সত্যিই ঢাকা নগরী কি? নাকি মালির ফুলের ঝাঁকা?
প্রাচ্যের প্রাণ তুমি হে মহান বসন্ত-ভূমি, ঢাকা।
ভোরের বাতাস যে চাদরে মোড়া, তা যেন না যায় সরে,
ক্লান্ত না হোক, যারা ঘুম যায় ফুল সাথে নদী তীরে
খেই না হারাক জ্ঞানীর কণ্ঠ মাতালের উচ্ছ্বাসে
চিরদিন থাক, বুড়িগঙ্গায় বইছে যে লহরিকা।
প্রাচ্যের প্রাণ তুমি হে মহান বসন্ত-ভূমি, ঢাকা।
রমনার রূপ যেন কাচে ভাসা স্বচ্ছ পানির দ্যুতি,
কিংবা প্রাচীন গাছ ভেদ করে ওঠা অঙ্কুর দুটি,
সত্যি এ নগরী অপ্রতিরোধ্য, আগামী যুগের তাজ
এখানে শিল্পী প্রতিটি কর্মে আগের চেয়েও পাকা।
প্রাচ্যের প্রাণ তুমি হে মহান বসন্ত-ভূমি, ঢাকা।
বন্ধুর ভিড়ে থাকব হাজির যত ভাবে, যত বার—
উঠবই ফুঁসে ঢাকাকে সেখানে করা হলে অস্বীকার,
কেন উঠব না? সত্য কথাকে গোপনে রাখব কত?
বরং বলব লাখো-কোটি বার চিৎকার করে একা—
প্রাচ্যের প্রাণ তুমি হে মহান বসন্ত-ভূমি, ঢাকা।