পুঁজিবাজারে কেউ কারও শত্রু নই : অর্থমন্ত্রী

আপডেট : ২৯ মার্চ ২০১৯, ১২:২৩ এএম

পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের সবাইকে বিজয়ী করার কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। গতকাল পুঁজিবাজার সংক্রান্ত এক অনুষ্ঠানে বিনিয়োগকারীদের তিনি বলেন, ‘আমার ওপর আপনারা বিশ্বাস রাখবেন। কিন্তু বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে বিনিয়োগ করবেন না। ভালোভাবে জেনে-বুঝে বিনিয়োগ করবেন। আমরা সবাইকে বিজয়ী করব। এই বাজারে আমরা কেউ কারও শত্রু নই।’

অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, ‘বিশ্বের সব দেশের পুঁজিবাজারেই উত্থান-পতন হয়। এটি বাজারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। পুঁজিবাজার কত নিচে যেতে পারে আমি দেখতে চাই। এটা আমার জন্য চ্যালেঞ্জ। পুঁজিবাজারের সূচক কত হবে, তা আমি নির্ধারণ করতে পারব না। এটা  দেশের অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। অর্থনীতির আকার বড় হলে পুঁজিবাজারও বড় হবে। আপনারা সরকারের প্রতি বিশ্বাস রাখুন। আমরা ঠকব না, পুঁজিবাজার থেকে জিতবই। আমি অ্যাকাউন্টসের লোক; আমি লস দেব না, লাভ দেব।’

গতকাল রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) আয়োজিত ‘বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তা সম্মেলন ঢাকা-২০১৯’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। সম্মেলনে বিশেষ অতিথি ছিলেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলাম। এতে সভাপতিত্ব করেন বিএসইসির চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেন।

এ ছাড়া বক্তব্য দেন বিএসইসির কমিশনার অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন নিজামী, অধ্যাপক ড. স্বপন কুমার বালা ও খোন্দকার কামালউজ্জামান।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে হঠাৎ উল্লম্ফনের পর দুই মাস ধরে পুঁজিবাজারে টানা মন্দা চলছে। এ সময়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচকটি প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ কমেছে। লেনদেন হাজার কোটি টাকা থেকে কমে নেমে এসেছে ৩৫২ কোটি টাকায়। পুঁজিবাজার নিয়ে বিনিয়োগকারীরা যখন হতাশায় ভুগছেন, সে সময় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির উদ্যোগে বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তা কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে অর্থমন্ত্রী পুঁজিবাজার নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ‘পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য শিক্ষা নিতে হবে। প্রথমে ঠিক করতে হবে আমরা কোথায় যাচ্ছি। এটা মাছবাজার কিংবা কাঁচাবাজার নয়। এ বাজার আমাদের দ্বারাই পরিচালিত। আমরাই খরিদ্দার আবার আমরাই বিক্রেতা। এখানে কেউ কেউ খুব তাড়াতাড়ি বড়লোক হওয়ার জন্য আসে। এটা মোটেই ঠিক নয়।’

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ‘কোম্পানির মালিক যদি লোভ করেন, তবে বিনিয়োগকারীর ক্ষতি হয়। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সিএমসি কামাল আমার কোম্পানি ছিল। আমার কোম্পানির শেয়ারের দাম ৩ হাজার টাকা হয়েছিল। আমি কয়েক হাজার কোটি টাকা মার্কেট থেকে নিতে পারতাম। আমি চাইলে অনেক প্রফিট করতে পারতাম। কিন্তু ঠিক হতো না। আমাদের ওপর বিশ্বাস করে প্রচুর বিনিয়োগকারী বিনিয়োগ করেছেন। তাদের ওপর আস্থা রেখে আমি কিন্তু শেয়ার বিক্রি করতে পারিনি। পরবর্তীতে বিএসইসি থেকে অনুমতি নিয়ে আমার সব শেয়ার বিক্রি করেছি।’

তিনি আরও বলেন, অনেকেই নিজেরা লাভবান হওয়ার জন্য মিথ্যা রটনার মাধ্যমে আরেকজন ফেলো ক্লায়েন্টকে ঠকায়। এটা ঠিক না। এই বাজারের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবাইকে ভালো বলা যাবে না। অনেকেই দ্রুত লাভবান হতে চায়। এটা করতে গিয়ে অনেকেই সর্বস্ব হারিয়ে ফেলে।

তিনি বলেন, ‘লাভবান হতে কিছু কিছু মানুষ রটনা ছড়ায়, মিথ্যা কথা বলে। এটা না করে আমাদের সবাইকে মিলেমিশে লাভবান হতে হবে। অর্থনীতির সঙ্গে লাভবান অটোমেটিক্যালি হবেন। আমাদের অর্থনীতি ও পুঁজিবাজার একসূত্রে গাঁথা। পুঁজিবাজারকে পেছনে রেখে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়া যাবে না।’

অর্থমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগকারীরা অর্থনীতির স্পন্দন। তাদের ছাড়া অর্থনীতির চাকা ঘুরবে না। তাই বিনিয়োগকারীদের গুরুত্ব অপরিসীম। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদেরকে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, সকালে শেয়ার কিনে বিকেলে বিক্রি করার জায়গা এটা না।

বিএসইসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম খায়রুল হোসেন বলেন, বিনিয়োগ সুরক্ষার জন্য বিনিয়োগ শিক্ষা অন্যতম হাতিয়ার। এর মাধ্যমে নিজের বিনিয়োগকে সুরক্ষিত রাখা যায়। এ ছাড়া কোথায় বিনিয়োগ করতে হবে, বিনিয়োগকারীরা সেটা বুঝতে পারেন।

দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগযোগ্য পণ্যের ঘাটতির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিএসইসির চেয়ারম্যান বলেন, বাজারে নতুন পণ্য প্রচলনের পাশাপাশি বন্ড মার্কেটের উন্নয়ন করতে হবে। তবে এক্ষেত্রে কর-সংক্রান্ত কিছু জটিলতা রয়েছে। এ জটিলতা দূর করতে অর্থমন্ত্রীর সহযোগিতা প্রয়োজন।

বিএসইসির কমিশনার অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন নিজামী বলেন, একটি দেশের অর্থনীতি যত উন্নত, সে দেশের পুঁজিবাজার তত উন্নত। আর এ উন্নতির

জন্য প্রয়োজন জ্ঞাননির্ভরতা। জ্ঞাননির্ভর বাজারের উন্নয়ন অত্যাবশ্যকীয়। তবে দুঃখের বিষয় হলো, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ-সংক্রান্ত শিক্ষা নেই বললেই চলে। এ কারণে সর্বস্তরের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিনিয়োগ শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে বিএসইসি কাজ করছে।

প্যানেল আলোচক ছিলেন বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ফরহাদ আহমেদ ও মাহবুবুল আলম, ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট শাকিল রিজভী ও সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি অব বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক শুভ্রকান্তি চৌধুরী। সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সাইফুর রহমান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত