ঢাকার বনানীতে এফ আর টাওয়ারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে আটকে পড়াদের উদ্ধার করতে গিয়ে গুরুতর আহত ফায়ারম্যান সোহেল রানার মৃত্যুতে তার গ্রামের বাড়িতে শোকের মাতম তৈরি হয়েছে। তার মৃত্যুর খবর পৌঁছানোর পর সোমবার সকাল থেকেই সোহেলের বাড়িতে ভিড় করতে শুরু করেছে তার আত্মীয়-স্বজনরা।
সংসারের একমাত্র উপার্জনশীল বড় ছেলেকে অকালে হারিয়ে দিশেহারা মা হালিমা খাতুন। ছুটিতে এসে অসুস্থ বাবার চিকিৎসা করার কথা থাকলেও পারেনি সোহেল।
কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলায় চৌগাংগা বাজারের পাশে সোহেলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজনের কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে আছে। ঘরের সামনে, উঠানে অনেককে বিলাপ করে কাঁদতে দেখা যায়।
পারিবারিক সূত্র ও এলাকাবাসীরা জানায়, ইটনা উপজেলার চৌগাঙ্গা ইউনিয়নের কেরুয়ালা গ্রামের দরিদ্র কৃষক নূরুল ইসলাম ও মোছা. হালিমা খাতুনের চার ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে সোহেল রানা ছিলেন সবার বড়। একটি টিনের দোচালা ঘরে বাবা-মা, চাচা-চাচিসহ সবাই গাদাগাদি করে বসবাস করেন। বাবা দীর্ঘদিন ধরে প্যারালাইজ হয়ে ঘরে পড়ে রয়েছেন। বাজার সংলগ্ন বাড়ির পাশের চৌগাঙ্গা শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১০ সালে এসএসসি পাস করেন তিনি। কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না সোহেল রানার। অটোরিকশা চালিয়ে আর প্রাইভেট পড়িয়ে ২০১৪ সালে খুব কষ্টে করিমগঞ্জ কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন সোহেল রানা। পরের বছরই যোগ দেন ফায়ার সার্ভিসে। তার চাকরির বয়স হয়েছিল মাত্র তিন বছর। চাকরিতে যোগদানের পর অসুস্থ বাবা ও পরিবারের সদস্যদের দেখতে সবশেষ গত ২৩ মার্চ বাড়ি এসেছিলেন সোহেল রানা। সেদিন ঢাকায় যাওয়ার সময় মাকে বলেছিলেন, নতুন চাকরি ছুটি নিয়ে আসা যায় না। তবে দুই/তিন মাসের বেতনের টাকা জমিয়ে ১৫ দিনের ছুটি নিয়ে বাবার চিকিৎসা করাবে সোহেল। কিন্তু সোহেল রানা আজীবনের জন্য না ফেরার দেশে চলে গেল। প্রিয় সন্তানের মৃত্যু খবরে বুক চাপড়ে মাতম করছেন মা-বাবাসহ স্বজনরা।
সোহেল রানার মা হালিমা খাতুনের সাথে কথা বলতে চাইলে সে তার ছেলের জন্য বুকফাটা কান্নায় কিছুই বলতে পারেনি। ঘণ্টাখানেক পরে আবার জিজ্ঞেস করলে তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, সোহেল ছিল আমার সংসারের বড় ছেলে। আমার সংসারের আয়ের একমাত্র উৎস ছিল সে। তার বাবার চিকিৎসা করাবে বলে বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে যায়। তার টাকায় ছোট ভাই বোনদের লেখাপড়ার খরচ চলতো। এখন আমার সব শেষ হয়ে গেছে।
সোহেলের চাচা মো. রতন মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, সোহেলের আয়েই চলতো পরিবারের ভরণ-পোষণ। চাকরির দুই/ তিন বছরের বেতন দিয়ে তার দরিদ্র পরিবারের সকল ঋণ পরিশোধ করে ছিল সে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে অন্ধকার হয়ে পড়েছে আমার ভাইয়ের পরিবার।
প্রসঙ্গত, গত ২৮ মার্চ বনানীর এফ আর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এদিন কুর্মিটোলা ফায়ার স্টেশনের ফায়ারম্যান সোহেল রানা ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের ল্যাডারে (উঁচু মই) উঠে আগুন নেভানো ও আটকে পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধার কাজ করছিলেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভবনে আটকে পড়া অনেককে উদ্ধার করেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, হঠাৎ ল্যাডারটি বন্ধ হয়ে যায়। ল্যাডারের বাস্কেটে তখন ভবন থেকে উদ্ধার করা পাঁচ-ছয় জন। বাস্কেটে জায়গা হচ্ছিল না। সোহেল রানা ল্যাডারের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে যান। ওই সময়ে তার পা আটকে যায় ল্যাডারে। ভেঙে কয়েক টুকরো হয়ে যায় তার ডান পায়ের হাড়। টান পড়ে কোমরে বাঁধা সেফটি হুকে। সোহেল রানা মই থেকে পিছলে পড়ে বিপজ্জনকভাবে ঝুলছিলেন। পা টা কোন রকমে শরীরের সঙ্গে লেগে আছে। পেটে চাপ লেগে নাড়িভুঁড়িও থেঁতলে যায়। কিছুক্ষণ পরেই অজ্ঞান হয়ে যান সোহেল রানা। তারপর থেকে সিএমএইচে আইসিইউতে ভেন্টিলেশনে রেখে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। এ রকম পরিস্থিতিতে উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গত শুক্রবার (৫ এপ্রিল) সন্ধ্যায় এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সোহেল রানাকে সিঙ্গাপুর পাঠানো হয়। পরে সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে সোমবার বাংলাদেশ সময় রাত ২টা ১৭ মিনিটে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান ফায়ার ফাইটার সোহেল রানা।
