ভোট রাজনীতির ঘোলাজলে নাভিশ্বাস উঠছে শিল্পীর। ভারতে এসে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে বিতর্কে জড়িয়েছেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র অভিনেতা ফেরদৌস আহমেদ। মঙ্গলবারই ভারতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ফরেনার্স ডিভিশনের নির্দেশে দেশে ফিরে যেতে হয়েছে তাকে। এই নিয়ে বিস্তর হইচই রাজনৈতিক মহলে। শুধু ফেরদৌসই নন, তৃণমূলের নির্বাচনী প্রচারের রোড শোয়ে শামিল হয়ে একই বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন বাংলাদেশের আরেক অভিনেতা।
বাংলা ধারাবাহিক ‘করুণাময়ী রানী রাসমণি’তে অভিনয়ের সুবাদে এখন এই বাংলায় রীতিমতো জনপ্রিয় মুখ তিনি। জানবাজারের প্রখ্যাত রাজা রাজচন্দ্র দাস রাসমণির স্বামীর চরিত্রে অসাধারণ অভিনয়ের সুবাদে দর্শকদের মন কেড়ে নিয়েছেন গাজী আব্দুন নুর। সেই জনপ্রিয় বাংলা ধারাবাহিকের ‘রাজচন্দ্র দাসই’ জড়িয়ে গেলেন অনভিপ্রেত এক রাজনৈতিক বিতর্কে। অভিযোগ, গত রামনবমীর দিন দমদমের তৃণমূল প্রার্থী সৌগত রায়ের হয়ে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিয়েছেন নুর। রাজ্যের প্রাক্তণ মন্ত্রী মদন মিত্রের সঙ্গে একই হুডখোলা গাড়িতে নুর ভোট প্রচারের ভিডিও ইতোমধ্যে ভাইরাল হয়ে ছড়িয়েছে। ফলে, ভারতের নির্বাচনী প্রচারে বিদেশি অভিনেতা কেন এ প্রশ্ন তুলে সরব হয়েছে বিজেপিসহ বিভিন্ন বিরোধী দল।
পুরো বিষয়টি নিয়ে যারপরনাই বিব্রত নুর। পরিস্থিতির চাপে অজান্তে হলেও ভুল যে একটা হয়ে গেছে, সে কথা ‘দেশ রূপান্তরের’ সঙ্গে আলাপচারিতায় অকপটেই স্বীকার করেছেন তিনি। গত বেশ কয়েক বছর ধরেই ভারতে রয়েছেন যশোরের বাসিন্দা নুর। মূল উদ্দেশ্যটা অবশ্যই অভিনয় শিক্ষা। কলকাতার রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটক ও সাংবাদিকতার পাঠ শেষ করেছেন, চুটিয়ে নাটক করেছেন কলকাতা ও অন্য শহরের বিভিন্ন মঞ্চে। এবং এখন, ধারাবাহিকে অভিনয়ের সুবাদে, এক কথায় যাকে বলে সেলিব্রিটি।
সেদিনের ঘটনা সম্পর্কে নুরের ব্যাখ্যাটা এরকম : ‘মদন (মিত্র) দার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সম্পর্ক। বছর কয়েক আগে কলকাতার মেডিকা হাসপাতালে অসুস্থ মাকে ভর্তির ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করিয়ে দিয়েছিলেন মদন দা। সেই সূত্রে আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞ। তার ডাকেই ওইদিন রামনবমীর রোড শোতে গিয়েছিলাম আমি। ওটা যে নির্বাচনী প্রচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তা বুঝতে পারিনি। কিন্তু যখন বুঝলাম, তখন আর ওখান থেকে বেরিয়ে আসার মতো পরিস্থিতি ছিল না।’
নুর আরও বলেন, ‘রানী রাসমণি’তে অভিনয়ের সুবাদেই তাকে বারবারই দক্ষিণেশ^র ও কালীঘাটে যেতে হয়েছে। সেদিনও তিনি দক্ষিণেশ^রেই ছিলেন। সেখাইে তিনি মদন মিত্রের ফোন পান। নুরের বক্তব্য, সেদিন পরিস্থিতির চাপে মদন মিত্রের রোড শোয়ে চলে গেলেও তৃণমূলের হয়ে প্রচারে একটা কথাও তিনি বলেননি। তৃণমূলের লোগো বা পতাকাও ছিল না তার হাতে। এমনকি, তৃণমূল প্রার্থী সৌগত রায়ের সঙ্গে চোখের দেখাও হয়নি তার। তবু জড়িয়ে পড়তে হলো এই অনভিপ্রেত রাজনৈতিক বিতর্কে, আক্ষেপ নুরের।
বস্তুত, ফেরদৌসের তুলনায় এ নেহাতই লঘু অপরাধ। দিন তিনেক আগে উত্তর দিনাজপুরে গিয়ে রায়গঞ্জের তৃণমূল প্রার্থী কানাইয়ালাল আগরওয়ালার হয়ে প্রত্যক্ষ প্রচার করেছিলেন ফেরদৌস। এর ফলে ভিসার শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে তাকে। বাংলাদেশের দুই অভিনেতাকে তৃণমূল প্রচারের ময়দানে নামানোর জন্য বিজেপির কেন্দ্রীয় সম্পাদক রাহুল সিনহা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে জঙ্গি জামায়াতের যোগের অভিযোগ করে এমনকি এনআইএ তদন্তেরও দাবি তুলেছে।
আকস্মিক এই দমকা ঝড়ে দৃশ্যতই বিব্রত, অনুতপ্ত নুর। বললেন, ‘বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে ভারতের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা রয়েছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা ভোলার নয়।’ বাবা প্রয়াত গাজী আবদুল মান্নান ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা, ওই অশান্ত সময়ে একবার তাকে ভারতে এসেও আশ্রয় নিতে হয়েছিল।
নুরের অকপট স্বীকারোক্তি, বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনের তরফে তার সঙ্গে ইতোমধ্যে যোগাযোগ করা হয়েছে। যে সিদ্ধান্তই তার সম্পর্কে নেওয়া হোক তা তিনি সশ্রদ্ধ চিত্তে মেনে নেবেন। ২০১৭-তে তার ভারতবাসের স্কলারশিপ ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে। বর্তমানে তিনি রয়েছেন পেশাগত ভিসা নিয়েই। ‘লঘু পাপে গুরুদ-’ হলে বলাবাহুল্য একজন উদীয়মান শিল্পী হিসেবে আঘাত নেমে আসবে তার ক্যারিয়ারে। আর, হারাতে চান না কলকাতার ভালোবাসা। বললেন, ‘এত ভালোবাসা পেয়েছি এখানে, যা কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি।’
ফেরদৌসের মতো নুরের বিরুদ্ধেও একই রকম কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে একটি সূত্রে। এর মধ্যেই ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক কলকাতার ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন দপ্তরে নুরের ভিসা সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে পাঠিয়েছে। এই দপ্তর কলকাতা পুলিশের আওতায়। সেই রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানা গেছে।
