পুঁজিবাজারে গত ২৭ জানুয়ারি থেকে চলছে মন্দা। পুঁজি হারিয়ে প্রায় প্রতিদিনই বিক্ষোভ করছেন বিনিয়োগকারীরা। পরিস্থিতি উত্তরণে কোনো কার্যকর উদ্যোগ না দেখে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যানের পদত্যাগও দাবি করেছেন তারা। কারণ, ২০১৮ সালের মন্দার পর চলতি বছরও প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শেয়ারের দরপতনে বড় অঙ্কের লোকসানের মুখে পড়েছেন বিনিয়োগকারীরা। তবে এমন মন্দা অবস্থায়ও অন্তত ২০টি কোম্পানির শেয়ার থেকে উচ্চ মুনাফা পেয়েছেন বিনিয়োগকারীরা।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ১ জানুয়ারি থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত ৩১৪টি কোম্পানির (মিউচুয়াল ফান্ড, করপোরেট বন্ড, ট্রেজারি বন্ড ও ডিবেঞ্চার বাদে) মধ্যে ১৯৩টিই দর হারিয়েছে। এসব কোম্পানির শেয়ারদর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। বিপরীতে ২০টি কোম্পানি রয়েছে, যেখানে বিনিয়োগ করে ৩০ থেকে ২৮২ শতাংশ পর্যন্ত মূলধনি মুনাফা পেয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। যদিও এসব শেয়ারের অধিকাংশের দরবৃদ্ধিতে মৌলভিত্তি বিবেচ্য ছিল না। পর্যালোচনায় লোকসানি ও অস্তিত্বহীন কোম্পানির দরও বাড়তে দেখা গেছে।
আরও দেখা গেছে, চলতি বছর মূলধনি মুনাফা সবচেয়ে বেশি এসেছে সাধারণ বীমা খাতের কোম্পানি থেকে। এসব কোম্পানির মৌলভিত্তিতে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন না হলেও শেয়ার দর আকাশ ছুঁয়েছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মূলধনি মুনাফা এসেছে সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স থেকে। মাত্র সাড়ে তিন মাসে এ কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে ২৮২ শতাংশ মূলধনি মুনাফা পেয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। এদিকে হিসাব বছর শেষ হলেও সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স এখনো লভ্যাংশ ঘোষণা করেনি। ২০১৮ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির নিট মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ শতাংশ। এ সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয় ১ টাকা ৩২ পয়সা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১ টাকা ১৯ পয়সা। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি এ কোম্পানির শেয়ারদর ছিল ১৫ টাকা ৩০ পয়সা, যা ১৮ এপ্রিল ৫৭ টাকা ৩০ পয়সায় উন্নীত হয়। মাঝে ২৭ ফেব্রুয়ারি এর শেয়ারদর ৩৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে ৬৭ টাকা ৩০ পয়সা হয়েছিল।
একই সময়ে সাধারণ বীমা খাতের আরেক কোম্পানি ইউনাইটেড ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারের দর বেড়েছে ১৭৫ শতাংশ। যদিও ২০১৮ সালে এ কোম্পানির নিট মুনাফা আগের বছরের তুলনায় সাড়ে ৯ শতাংশ কমে। শেয়ারহোল্ডারদের জন্য সম্প্রতি কোম্পানিটি মোট ১৩ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির সুযোগে এ কোম্পানির করপোরেট উদ্যোক্তা ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন বড় অঙ্কের শেয়ার বিক্রি করেছে।
নিট মুনাফা কমলেও অগ্রণী ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারদর গত সাড়ে তিন মাসে ১২৩ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে এ কোম্পানির নিট মুনাফা কমে ১৫ শতাংশ। বীমা খাতের আরেক কোম্পানি ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্সের ২০১৮ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে নিট মুনাফা ৩ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। আর চলতি বছর এ শেয়ারের দর বেড়েছে ৭৯ দশমিক ৩ শতাংশ। একই সময়ে সাড়ে ৪ শতাংশ মুনাফা বাড়ার প্রভাবে প্রভাতী ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারদর বেড়েছে ৯২ শতাংশ। এ ছাড়া এশিয়া ও মার্কেন্টাইল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারদর বেড়েছে ৪১ ও ৬০ শতাংশ। এর বাইরে প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের দর বেড়েছে ৩১ শতাংশ। বাজার সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, পরিশোধিত মূলধন কম থাকায় কারসাজির মাধ্যমে বীমা খাতের শেয়ারদর বাড়ানো হয়েছে।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ২৪ জানুয়ারির পর থেকে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচকটি সাড়ে ১০ শতাংশ কমেছে। এ সময় লেনদেন ১ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা থেকে ৩০০ কোটি টাকার নিচে নেমে এসেছে। দর হারিয়েছে প্রায় ৬২ শতাংশ শেয়ার।
দেশে ইন্টারনেটের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিসিএল) নিট মুনাফা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। চলতি অর্ধবার্ষিকীতে এ কোম্পানির ইপিএস হচ্ছে ১ টাকা ৪৩ পয়সা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল মাত্র ৬ পয়সা। নিট মুনাফা বাড়তে থাকায় চলতি বছর এ কোম্পানির শেয়ারদর বেড়েছে ৭৯ শতাংশ। আবার নিট মুনাফায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না হলেও একই সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত আরেক কোম্পানি রেনউইক যজ্ঞেশ^র অ্যান্ড কোম্পানি (বিডি) লিমিটেডের শেয়ারদর বেড়েছে ৮৪ শতাংশ। এক বছরে এ কোম্পানির শেয়ারদর বেড়েছে প্রায় তিনগুণ। এ ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত লোকসানি কোম্পানি ইস্টার্ন ক্যাবলসের শেয়ারদর বেড়েছে ৪৬ দশমিক ৫ শতাংশ।
স্বল্প মূলধনি কোম্পানি স্টান্ডার্ড সিরামিকের দর চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত ৪৩ শতাংশ বেড়েছে। গত ছয় কার্যদিবস ধরেই এ কোম্পানির শেয়ার সার্কিট ব্রেকারের সর্বোচ্চ দরে কেনাবেচা হতে দেখা যাচ্ছে। সড়ক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক জমি অধিগ্রহণের কারণে কোম্পানির কোনো অস্তিত্ব নেই বিচ হ্যাচারি লিমিটেডের। তারপরও লোকসানি এ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দর বেড়েছে ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ। লোকসানি অবস্থা থেকে নামমাত্র মুনাফায় ফেরা কোম্পানি সমতা লেদার কমপ্লেক্সের দর বেড়েছে ৫৬ শতাংশ।
বস্ত্র খাতের তালিকাভুক্ত ৯০ শতাংশে কোম্পানিই চলতি বছর বিনিয়োগকারীদের মূলধনি মুনাফা দিতে পারেনি। তবে ব্যবসায়ী আবদুল আউয়াল মিন্টুর মালিকানাধীন এ খাতের লোকসানি কোম্পানি দুলামিয়া কটনে বিনিয়োগ করে ৫৬ শতাংশ মূলধনি মুনাফা পেয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। আলোচিত এ ব্যবসায়ীর আরেক কোম্পানি কে অ্যান্ড কিউ থেকেও চলতি বছর ৩৩ শতাংশ মুনাফা পেয়েছেন বিনিয়োগকারীরা।
চলতি বছর বহুজাতিক কোম্পানি বার্জার বাংলাদেশ লিমিটেডের নিট মুনাফা বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ। আর শেয়ারদর বেড়েছে ৩০ শতাংশ। পরিচালনা পর্ষদের বিবাদ ও বিদ্যুৎ সংকটে থাকা সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ থেকেও প্রায় ৩৩ শতাংশ মূলধনি মুনাফা এসেছে। ব্যাংক খাতের মধ্যে একমাত্র ডাচ্-বাংলা থেকে বিনিয়োগকারীরা ভালো মুনাফা পেয়েছেন। পরিশোধিত মূলধন বৃদ্ধির বাধ্যবাধকতায় এ ব্যাংকটি এবার ১৫০ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে শেয়ারদরে। রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আইসিবি বড় অঙ্কের কৌশলগত শেয়ার বিক্রির পরও ন্যাশনাল পলিমারের দর বেড়েছে ৩০ শতাংশ।
