চট্টগ্রামে বেড়েই চলেছে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনা। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো শিশু ও নারী ধর্ষণের শিকার হয়ে ভর্তি হচ্ছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি)। গত কয়েক মাসে এই সংখ্যা আরও বেড়ে যাওয়ায় তাদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন ওসিসিতে কর্মরতরা। ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের এই চিত্রকে ‘চরম উদ্বেগজনক’ বলছেন সমাজবিজ্ঞানী, মানবাধিকারকর্মী ও পুলিশ কর্মকর্তারা। পরিস্থিতির উন্নতিতে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগের ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে (১৮ এপ্রিল পর্যন্ত) চট্টগ্রামে ২৮৩ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শিশু, কিশোরী ও গৃহবধূ। শুধু বাংলা নববর্ষের প্রথম পাঁচ দিনেই ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৩ নারী ও শিশু। ওসিসির দায়িত্বে থাকা পুলিশের উপপরিদর্শক আবুল বাসার দেশ রূপান্তরকে জানান, গত ১৪ এপ্রিল থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত চট্টগ্রামে ১৩টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এর আগের ১৩ দিনে ২৭, মার্চে ৯৪, ফেব্রুয়ারিতে ৭৩ এবং জানুয়ারি মাসে ৭৬টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এছাড়া ২০১৮ সালে ৬৪৯ এবং তার আগের বছর ২০১৭ সালে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে মোট ৪৯৭টি।
এ পরিসংখ্যান থেকেই ধর্ষণের ঘটনা বাড়ার উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া যায়। তবে পুলিশ ও মানবাধিকার সংগঠনের নেতাদের মতে, থানায় হওয়া মামলা এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে নারী ও শিশু নির্যাতনের প্রকৃত পরিসংখ্যান পাওয়া যাবে না। কেননা অধিকাংশ ধর্ষণের ঘটনাই নির্যাতিতের পরিবার গোপনের চেষ্টা করে। কিন্তু এরপরও যে পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে সেটা ভয়াবহ।
চলতি বছরের প্রথম চার মাস এবং ২০১৮ সালের পরিসংখ্যানে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির যে তথ্য পাওয়া গেছে তাকে ‘মহামারী’ বলে আখ্যায়িত করেছে ‘জেলা লিগ্যাল এইড’ নামে চট্টগ্রামের একটি মানবাধিকার সংস্থা। সংস্থাটির কর্মকর্তা এরশাদুল ইসলাম বলেন, ‘দরিদ্র ও অসহায় নির্যাতিত নারীদের আইনি পরামর্শ ও সহায়তা দিয়ে থাকি আমরা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের সক্ষমতার প্রায় চারগুণ বেশি আইনি পরামর্শ ও সহায়তার আবেদন জমা পড়ছে।’
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) একমাত্র নারী পরিদর্শক মর্জিনা আক্তার। নারী নির্যাতন প্রতিরোধমূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সাহসিকতার জন্য প্রশংসিত সদরঘাট থানার সাবেক ওসি মর্জিনা বলেন, ‘আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে দুটো সত্তা কাজ করে। বেশভূষায় আমি অত্যন্ত ভদ্র-সভ্য একজন। আবার আমার ভেতরেই একজন খারাপের বাস আছে। তাকে দমিয়ে রাখতে হয়। প্রথমত সামাজিক মূল্যবোধ আর নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে পরিবার থেকেই তাকে শিক্ষিত করে তুলতে হবে, যেন ভেতরের মানুষটি সবসময় ঘুমিয়েই থাকে। আর দ্বিতীয়ত কঠোর শাস্তির মধ্য দিয়ে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে হবে।’
ধর্ষণের মতো অপরাধের প্রবণতা বাড়ার পেছনের কারণ জানতে চাইলে সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক অনুপম সেন বলেন, ‘নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা একটি সামাজিক সমস্যা। মানুষের মধ্যে যে আদিম প্রবৃত্তি তা দমিয়ে রাখতে হলে শৈশব থেকে বা পরবর্তীতে স্কুল-কলেজে যথাযথ জ্ঞানচর্চা ও নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে। যখন কেউ ধর্ষণ করে বা হত্যা করে তখন সে আনকনশাস থাকে। অবদমিত প্রবৃত্তি তখন মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এ ধরনের ঘটনা বাড়তে দিলে সামাজিকীকরণ থাকবে না।’
ধর্ষণের মতো অপরাধ প্রবণতা রুখতে হলে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পারিবারিক অনুশাসন এবং মানুষে মানুষে সামাজিক সম্পর্ক বাড়াতে হবে বলে মত দিয়ে অধ্যাপক অনুপম আরও বলেন, ‘কিন্তু এ ধরনের অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হচ্ছে না।’
ধর্ষণের ঘটনা ঘটার পর অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্যাতিতার সঙ্গে ধর্ষকের বিয়ে দিয়ে অথবা ভুক্তভোগীর পরিবারকে টাকা দিয়ে বিষয়টি মীমাংসা করে ফেলা হয়। আবার স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপেও অনেক ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায়। এভাবে দোষীদের উপযুক্ত বিচার হচ্ছে না বলেই ধর্ষণের মতো অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে জানিয়ে মানবাধিকারকর্মী আইনজীবী জিয়া হাবীব আহসান বলেন, ‘ধর্ষণ মামলাগুলো খুব স্পর্শকাতর মামলা। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের পুরো সিস্টেমটা নারী ও শিশুবান্ধব না। মেডিকেলে গেলে কখনো বলে পুলিশ নেই, কখনো বলে ডাক্তার নেই। ধর্ষণের শিকাররা ওসিসিতে যাওয়ার পর নানাভাবে হয়রানির শিকার হন। আর নির্যাতিতা যদি গরিব হন, তাহলে তো কথাই নেই।’
সাধারণত কী ধরনের গাফিলতি হয় জানতে চাইলে এই মানবাধিকারকর্মী আরও বলেন, ‘ধর্ষণের আলামতগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয় না। রেপ কেসের ক্ষেত্রে ভিকটিমের পরিধেয় কাপড় গুরুত্বপূর্ণ আলামত। অবিবাহিত হলে ভিকটিমের পরিধেয় কাপড় এক সপ্তাহের মধ্যেই পরীক্ষা করতে হয়। আর বিবাহিতের ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টা পেরোলেই আলামত নষ্ট হয়ে যায়। অনেক সময় দেখা যায় সবকিছু শেষ, সার্টিফিকেট দিতে গড়িমসি করে।’
