চীন-ভারতের সঙ্গে ভারসাম্যে কৌশলী বাংলাদেশ

আপডেট : ১১ মে ২০১৯, ০২:২৫ এএম

এশিয়ায় টেলিকমিউনিকেশন শিল্পে এককভাবে আধিপত্য বিস্তার করছে চীন। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দেশ বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে প্রবেশের চেষ্টায় মরিয়া পরাশক্তিধর এই দেশটি। পার্শ্ববর্তী অপর পরাশক্তি ভারতও বাংলাদেশের সঙ্গে জ্বালানি খাতে শতভাগ বাণিজ্যের জন্য পাঁয়তারা চালিয়ে যাচ্ছে। এমন অবস্থায় বাংলাদেশকে দুই দেশের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে নিজের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এগিয়ে যেতে হচ্ছে।

জ্বালানি সংকট নিরসনে বিদেশি বিনিয়োগ দাতারা তাকিয়ে আছে বাংলাদেশের দিকে। চীনের হংকংভিত্তিক কোম্পানি চায়না হুয়াদিয়ান গত বছর বাংলাদেশে একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণে সম্মত হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে বাংলাদেশে আরও একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ব্রিটিশ একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্ব করে পাওয়ার চায়না।

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের অধ্যাপক ডেভিড লুইসের মতে, ‘বাংলাদেশ প্রায়ই জ্বালানি সরবরাহ সমস্যায় ভোগে এবং এতে দেশটির সরকারের সামনে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিকল্প হিসেবে আসে।’ ২০১৪ সালের এক ব্ল্যাকআউটে

            বাংলাদেশের ১০০ মিলিয়ন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদা অনেক বেশি বলে মনে করেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক কৃষ্ণ কুমার সাহা। দেশটির উন্নয়ন সম্ভাবনা ব্যাহত হয় জ্বালানি সমস্যার কারণে। এক্ষেত্রে জ্বালানি সমস্যা নিরসনে বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগ চায়।

বাংলাদেশের ৩০ শতাংশ মানুষ এখনো বিদ্যুৎ সংকটে ভোগে। ব্রিটেন, চীন, ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী দেশগুলো বাংলাদেশে জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের জন্য মুখিয়ে আছে। আর এই দৌড়ে বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতকে পেছনে ফেলে এগিয়ে আছে চীন।

বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ ভারতের মাথাব্যথার কারণ। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ ২ হাজার ৫৮২ মাইলের সীমানা রয়েছে এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশকে সাহায্য করে ভারত। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে, বিশেষ করে জ্বালানি খাতে চীনের ভূমিকা নিয়ে উদ্বিগ্ন ভারতের কর্মকর্তারা। জ্বালানি খাতে বাংলাদেশকে সহায়তা অব্যাহত রেখেছে ভারত। যদিও ভারতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণে চীনের বিনিয়োগ সম্ভাবনা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। বিশেষজ্ঞ কৃষ্ণ কুমার সাহা মনে করেন, ‘দুই দেশকে খুশি রেখে নিজের উন্নয়ন এগিয়ে নিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। আর এক্ষেত্রে দুই দেশের কোম্পানিগুলোকে একই বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগ সুবিধা দিতে হবে বাংলাদেশকে।’

লুইস দ্য ডিপ্লোম্যাটকে বলেন, ‘এই অঞ্চলের দুই শক্তি ভারত এবং চীন। আর এই দুই দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বাজায় রাখা বাংলাদেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের জটিল সম্পর্কে অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি রয়েছে, যদিও বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্ক বেশ ভালো। বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগের তুলনায় ভারতীয় বিনিয়োগ রাজনৈতিকভাবে অধিক স্পর্শকাতর।’

২০১৫ সালে বাংলাদেশ-ভারত আঞ্চলিক বিরোধের অনেক জায়গা নিষ্পত্তি করেছে এবং ভারত বাংলাদেশকে গত বছর এক চুক্তির আওতায় মুক্ত বাণিজ্যের সুবিধাও দিয়েছে। এমন অবস্থায় বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে এই সম্পর্ককে রাজনৈতিক পর্যায়ে ভারসাম্যের মধ্যে রাখতে চায়। অন্যদিকে চীনের সঙ্গেও অর্থনৈতিক চুক্তির মধ্য দিয়ে সুসম্পর্ক রাখতে চায় বাংলাদেশ। ওই একই বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। ওই সফরে দুই দেশের মধ্যে ৯০টির বেশি চুক্তি হয়, যার মধ্যে উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, পরমাণু জ্বালানি এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি ৭ বিলিয়ন থেকে ৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হয়।

দ্য ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদনে এক গবেষকের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়ে দুটি বড় ঝুঁকির সৃষ্টি করছে। প্রথমটি অর্থনৈতিক; বাংলাদেশ তার মাথার ওপর থাকা ঋণ কাটিয়ে ওঠার পথ খুঁজছে। দ্বিতীয় ঝুঁকিটি হলো ভূরাজনৈতিক; গত পাঁচ বছরে ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক তীব্র হয়েছে। ঢাকাকে পেইচিংয়ের সঙ্গে অনেক ঘনিষ্ঠ দেখা গেলে, নয়াদিল্লির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে টানাপড়েন সৃষ্টি হতে পারে।’

চীন তার ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড প্রকল্পের আওতায় এর মধ্যেই আফ্রিকা, এশিয়া এবং ইউরোপের অনেক দেশেই অবকাঠামোগত খাতে বিনিয়োগ নিয়ে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশ এবং এশিয়ার কিছু দেশ স্বল্প মেয়াদে সুবিধা নিয়ে চীনকে পাশে রেখেছে। যদিও বিশ্লেষকরা  মনে করেন, এমন স্বল্পকালীন বিনিয়োগের পথ ধরেই শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো চীনের প্রকল্পের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের কৌশলগত সম্পর্কের বিষয়টি ভালোই বোঝে ভারত। ঢাকা চীনের কাছাকাছি গেলে অর্থনীতি এবং জ্বালানি খাতে উন্নয়নের জন্যই যাবে। আর পাশাপাশি বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গেও সম্পর্ক ঠিক রাখবে তাতে চীন যাই মনে করুক না কেন।

কোনো পতন ছাড়াই চীন এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারলে উভয়ের কাছ থেকেই অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রাপ্তি ঘটবে বাংলাদেশের। জ্বালানি খাতে যতই পরাশক্তিধর এই দুই দেশ নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করবে ততই লাভ হবে বাংলাদেশের।

গত বছর বাংলাদেশ ১৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারত, কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে ২০৩০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটিকে ৩৪ হাজার বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য। চীনের অর্থায়নে নির্মিত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশ লাভবান হতে পারে কয়েক পর্যায়ে। চীনের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুতের মূল্য সস্তা এবং চীন পরোক্ষভাবে বাংলাদেশকে মূল্য পরিশোধ করতে পারে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সহায়তা করে, বিশেষত জাতিসংঘের ক্ষেত্রে। কারণ জাতিসংঘে চীন ভেটো প্রদানকারী শক্তি। বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে এই ভেটো শক্তি কাজে লাগতে পারে নিজের স্বার্থে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত