ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে কবি হেনরী স্বপনকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় সারা দেশে কবি-সাহিত্যিক ও মুক্তমনাদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। ঘটনার পর পরই ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন অনলাইন গণমাধ্যমে নিন্দা ও মুক্তি চেয়ে বিভিন্ন পোস্ট ও খবর পরিবেশিত হতে দেখা যায়।
মঙ্গলবার বরিশাল শহরের কোতোয়ালি থানা-পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। বরিশাল ক্যাথলিক ডাইওসিসের বিশপ লরেন্স সুব্রত হাওলাদারকে নিয়ে ফেসবুকে লেখার কারণে তাকে আটক করা হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রের মাধ্যমে জানা যায়।
খ্রিষ্টীয় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগে সকালে বরিশাল কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়। এরপরই কবি হেনরীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ, বিষয়টি নিশ্চিত করেছে কোতোয়ালি থানার এএসআই মাসুম বিল্লাহ। তাকে কোর্টে প্রেরণ করা হয়েছে বলেও জানা যায় পুলিশের বরাত থেকে।
এদিকে আদালতের হাজতখানায় বসে হেনরী স্বপন জানান, মঙ্গলবার দুপুর আনুমানিক ২টায় কোতোয়ালি মডেল থানার উপপরিদর্শক আল মামুন, হাসান ও রাকিবসহ চারজন পুলিশ কর্মকর্তা সাদা পোশাকে তার বাসায় যান। ওই চার পুলিশ কর্মকর্তা তাকে কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি নুরুল ইসলামের বরাত দিয়ে জানান ‘স্যার আপনাকে যেতে বলেছেন’। এরপরই সাদা পোশাকে থাকা ওই চার পুলিশ মোটরসাইকেলে করে হেনরী স্বপনকে থানায় না নিয়ে সরাসরি নিয়ে যান মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের হাজতখানায়। বিকেল ৫টায় আদালতের নির্দেশে হেনরী স্বপনকে কারাগারে পাঠানো হয়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এপ্রিল মাসের ২৩ তারিখ শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ হামলা পরবর্তী একটি স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে নিজ (খ্রিষ্টান) সম্প্রদায়ের সঙ্গে হেনরি স্বপনের বিরোধ দেখা দেয়। ওই স্ট্যাটাসটিতে বরিশাল ক্যাথলিক বিশপ লরেন্স সুব্রত হাওলাদারকে উদ্দেশ্য করে হেনরী স্বপন শিরোনাম দিয়েছিলেন ‘রোম যখন পুড়ছে বিশপ সুব্রত তখন বাঁশি বাজাচ্ছে’। পাঠকদের জন্য হেনরী স্বপনের সেদিনের স্ট্যাটাসটি তুলে দেওয়া হলো-
‘রোম যখন পুড়ছে বিশপ সুব্রত তখন বাঁশি বাজাচ্ছে’
রোম যখন পুড়ছিল তখন সম্রাট নিরো নাকি বাঁশি বাজাচ্ছিল। শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোর গির্জায় আত্মঘাতী হামলায় শত শত মানুষ নিহতের আকস্মিকতায় যখন শোকস্তব্দ বিশ্ববাসী, তখন বরিশাল ক্যাথলিক ডাইওসিসের বিশপ লরেন্স সুব্রত হাওলাদার চার্চ চত্বরে করছেন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
গতকাল, ২২ এপ্রিল, বরিশাল ক্যাথলিক ডাইওসিসের বিশপ লরেন্স সুব্রত হাওলাদার বিভাগীয় শহর বরিশাল ধর্মপল্লির সকল পুরোহিত, সিস্টার, ব্রাদার এবং সাধারণ খ্রিষ্টভক্তদের নিয়ে ডাইওসিসের হলরুমে নাচ, গান এবং ব্যান্ড শো এর মাধ্যমে মনোজ্ঞ এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করেন। শ্রীলঙ্কার খ্রিষ্ট সমাজের এই সংকটময় মুহূর্তে বরিশাল ক্যাথলিক ডাইওসিসের এ রকম আয়োজনকে রামকৃষ্ণ মিশনের মহারাজ এবং জামে কসাই মসজিদের ইমাম ও বরিশালের সকল নেতৃবৃন্দ এটিকে দুঃখজনক ঘটনা বলে আখ্যায়িত করেছেন।’
কবি হেনরী স্বপনের এই পোস্টটিতে ক্ষিপ্ত হন স্থানীয় খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের একাংশ। এরপরই নানাভাবে হেনরী স্বপনকে হুমকি-ধমকি দিতে থকেন তারা। গত ১১ মে আনুমানিক রাত আড়াইটার দিকে তার বাসার জানালায় দাঁড়িয়ে অজ্ঞাত দুই ব্যক্তি অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। পাশাপাশি সগোত্রীয় (খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী) লোকদের বিরুদ্ধে লেখালেখি বন্ধের নির্দেশ দেয়। অন্যথায় অঙ্গহানি ও প্রাণনাশের হুমকি দেয় তারা। একই সঙ্গে তাকে বরিশাল ত্যাগেরও হুমকি দেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে বরিশালের মুক্তমনা ছয়জনকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হুমকি দেওয়া হয়। যে ঘটনায় ৬ জনের পক্ষে হেনরী স্বপন বাদী হয়ে বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন।
