বাজেটে ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি পূরণ হোক

আপডেট : ১৮ মে ২০১৯, ০৯:৪৭ পিএম

‘তলাবিহীন ঝুড়ি’, ‘মঙ্গা’ বা ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভূমি’ বলে খ্যাত বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দিকে ধাবমান সম্ভাবনাময় উন্নয়নশীল দেশ। বর্ধিষ্ণু অর্থনীতির শীর্ষ পাঁচ দেশের একটি। জিডিপি ৮ শতাংশের বেশি। জীবনযাত্রার মান, মাথাপিছু আয়, গড় আয়ু এবং শিক্ষিতের হার ঊর্ধ্বমুখী। স্বাস্থ্য ও বিদ্যুৎসেবার বিস্তৃতি ক্রমবর্ধমান এবং দারিদ্র্যের হার, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার ক্রমহ্রাসমান। খাদ্য ও সামজিক নিরাপত্তাও আগের চেয়ে শক্তিশালী। উন্নয়ন কর্মকা- ও উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে সফলতা দৃশ্যমান। মূল লক্ষ্য মধ্যম আয়ের দেশ হয়ে উন্নত দেশে পরিণত হওয়া। অর্থাৎ আরও অনেক দূর যেতে হবে। যেতে হবে অনেক অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি অতিক্রম করে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা অনেক, কিন্তু প্রাকৃতিক সম্পদ পর্যাপ্ত নয়। এ ছাড়াও রয়েছে রাজনৈতিক, সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিকসহ নানাবিধ দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান প্রতিকূলতা। বিরাজমান প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন গত দুইবারের সরকার বহুমাত্রিক উন্নয়নে যে সফলতা দেখিয়েছে, তাতে মানুষ আশাবাদী হয়েছে এবং উন্নত জীবনমান ও সমৃদ্ধিশালী দেশের স্বপ্নও দেখছে। সেজন্য টানা তৃতীয়বারের আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশাও অনেক।

 

উপরিউক্ত লক্ষ্য, সাফল্য, অর্জন, প্রত্যাশা ও প্রতিবন্ধকতা বিবেচনায় রেখে আগামী জুন মাসে উপস্থাপিত হতে যাচ্ছে টানা তৃতীয়বারের আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম বাজেট ২০১৯-২০। এবারের বাজেট উপস্থাপনা করবেন বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, যিনি বিগত সরকারের পরিকল্পনামন্ত্রী ছিলেন। যতটুকু জেনেছি, বাজেট হবে বড় আকারের কিন্তু বাজটে প্রণয়নে এবং উপস্থাপনায় নতুনত্ব থাকবে। বাজেট প্রণয়নের ভিত্তি হবে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার। বাজেট হবে বিনিয়োগবান্ধব। বাজেটে প্রান্তিক কৃষক, দিনমজুর ও সাধারণ মানুষের স্বার্থ গুরুত্ব পাবে। গ্রামকে শহরে রূপান্তরের এবং প্রতি পরিবারের একজনকে চাকরি প্রদানের রূপরেখা থাকবে বাজেটে। বেকারত্ব নিরসনের, শহর নির্ভরতা কমানোর, গ্রামে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বিদ্যুৎসেবা, পাকা রাস্তা, ইন্টারনেট, অনলাইন ব্যাংকিং, ডাকঘর ও সঞ্চয় ব্যাংকের সেবা নিশ্চিত করার দিকনির্দেশনা থাকবে। শহরের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগের, উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হবে। দেশীয় শিল্পকে সুবিধা দেওয়া হবে। করযোগ্য আয়ের জন্য কর দেওয়া নিশ্চিত করা হবে। করহার বাড়বে না, তবে করের আওতা বাড়বে। অর্থপাচার রোধে সংস্কার কার্যক্রম হাতে নেওয়া হবে। পুঁজিবাজার ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হবে। সরকারি ব্যাংকে মূলধন ঘাটতি মেটাতে বরাদ্দ থাকবে।

 

একটি দেশের চলমান উন্নয়ন স্থায়িত্ব পায় যদি সে উন্নয়ন অংশগ্রহণমূলক ও সুষম হয় এবং উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষ বেশি পায়; দুর্নীতি, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতার অভাব, আয়বৈষম্য ও অসম বণ্টন না থাকে; জবাবদিহিতা, উন্নত পরিবেশ, সুশাসন ও দক্ষ জনশক্তি থাকে; সম্পদ অব্যবহৃত না থাকে এবং সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। এবারের বাজেটে এ বিষয়গুলো নিশ্চিত করা হবে বলে আশা রাখি। 

 

আমাদের বর্তমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বেশিরভাগ শহরকেন্দ্রিক। এবারের বাজেটে গ্রামে শহুরে সুবিধা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হলে উন্নয়ন সুষম হওয়ার দিকে এগোবে। আর প্রতি পরিবারের একজনকে চাকরি দেওয়া গেলে অব্যবহৃত মানবসম্পদের পরিমাণ কমে আসবে। এরা উৎপাদন কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে উৎপাদন বাড়বে, এদের আয় ও ভোগ বাড়বে, যা প্রবৃদ্ধি আরও বাড়াতে সহায়ক হবে। তবে গ্রামীণ অর্থনীতি গড়ে তুলে গ্রামেই কর্মসংস্থান সুযোগ সৃষ্টি করতে পারলে বেশি ফল পাওয়া যাবে। শহরনির্ভরতা ও শহরে অভিগমন কমবে। এর জন্য সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

 

উচ্চ প্রবৃদ্ধি হার ধরে রাখা এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য অত্যাবশ্যকীয় হলো দক্ষ মানবসম্পদ ও গবেষণা। মানবসম্পদ সৃষ্টি হয় শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও বাস্তবে সে শিক্ষা প্রয়োগ করে দেখার মাধ্যমে। আমাদের প্রশিক্ষণব্যবস্থা উন্নত নয় এবং সুযোগও কম। শিক্ষাও বিশ্বমানের নয়। প্রাথমিক থেকে উচ্চতর শিক্ষায় কোনো সমন্বয় নেই। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা টিউটরনির্ভর। যা শিক্ষার্থীর অন্তর্নিহিত মেধা বিকাশের অন্তরায়। অর্থ ও অন্যান্য সুবিধার অভাবে গবেষণার চিত্রও ভালো নয়। শিক্ষায় নিয়ন্ত্রণহীন বাণিজ্যিকীকরণ শিক্ষার মানকে অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কিন্তু টেকসই উন্নয়নের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টির বিকল্প নেই। উন্নয়নের স্বার্থেই পরিকল্পিত ও মানসম্পন্ন শিক্ষা ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। তা ছাড়া জনশক্তি দক্ষ হলে বৈদেশিক চাহিদা বাড়বে। জনশক্তি রপ্তানি করে আরও বেশি রেমিট্যান্স পাওয়া যাবে। বেকার সমস্যাও কমে আসবে। এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। কালক্ষেপণ আমাদের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করবে। দুর্নীতি, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, আয়বৈষম্য কমিয়ে আনা ও সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া দরকার। আগামী বাজেটে এসব বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

 

বিনিয়োগ ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়। বর্তমান বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ স্থবিরতা লক্ষণীয় এবং এই খাতে ঋণপ্রবাহ প্রবৃদ্ধি হ্রাসমান, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ সন্তোষজনক নয়, বিদেশি বিনিয়োগ-প্রবাহও খুব একটা বাড়ছে না। কিন্তু বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে আমলাতান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতাসহ সব প্রতিবন্ধকতা দূর করা প্রয়োজন। বড় অবকাঠামো নির্মাণ, সুষম উন্নয়ন, কর আদায়, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়ানো, যোগাযোগ-ব্যবস্থার উন্নতি ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত সরবরাহ এবং প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ানো নিশ্চিত না করতে পারলে বিনিয়োগ বাড়বে না। বিনিয়োগ না বাড়লে উন্নয়ন কর্মকা- গতি হারাবে। পুঁজি বাজারে নিয়ন্ত্রণ নেই বলে অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেছেন। প্রত্যাশা করছি পুঁজি বাজারকে ঢেলে সাজানোর পদক্ষেপ থাকবে বাজেটে। বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার জন্য পুঁজিবাজারকে ঢেলে সাজানো সময়ের দাবি।

 

আমাদের অর্থনীতির সবচেয়ে দুর্বলতম হলো ব্যাংক খাত। নিরাপত্তাহীনতা, বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা এই খাতের বিদ্যমান চরিত্র। এডিবির মতে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা হলোÑ উচ্চ খেলাপি ঋণ, নি¤œ মুনাফা, দুর্বল সুশাসন, ক্রমবর্ধমান মূলধন ঘাটতি, পরিচালনার অদক্ষতা ও অকার্যকর আইনি কাঠামো। ব্যাংক খাতের এই চরিত্র বদলাতে বাংলাদেশ ব্যাংক কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। খেলাপি ঋণ আদায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা প্রশংসীয় নয়। ঋণখেলাপিদের বিষয়ে হাইকোর্টের সঙ্গে টানাপড়েন চলছে বাংলাদেশ ব্যাংকের। খেলাপি ঋণ আদায়ে এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে সহজে কেউ ঋণখেলাপি হতে উৎসাহিত না হয়, আর্থিক খাত ও দেশের অর্থনীতি ঝুঁকিতে না পড়ে এবং আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। সরকারি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি মেটাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ রাখতে হয় প্রতি বাজেটে। সরকারি ব্যাংকে মূলধন ঘাটতির মূল কারণ হলো মন্দ ঋণ প্রদান, দুর্নীতি, অনিয়ম, অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনা। মন্দ ঋণ প্রদান, দুর্নীতি, অনিয়ম, অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনা রোধ করে মূলধন ঘাটতি কমিয়ে আনা জরুরি।

 

এনবিআর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে খুব একটা সফল হয় না। ফলে রাজস্ব আয় কম। জিডিপি যে হারে বাড়ছে সে হারে কর আদায় হয় না। করযোগ্য আয় করে অথচ কর দেয় না অসংখ্য মানুষ। অনেকের ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশেন নম্বর বা ‘টিআইএন’ নেই। যাদের আছে তাদের কেউ কেউ রিটার্ন দেয় না। যাদের বেশি কর দেওয়ার কথা তারা আয়কর ফাঁকি দেয়। বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধা নিয়ে অনেকে দেশেই পণ্য বিক্রি করে দেয়। কর রিটার্ন ফরমপূরণ করা কষ্টসাধ্য। নিয়মাবলিও মানুষ জানে না। অনেকে বোঝার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। এ ছাড়াও হয়রানি ও দুর্নীতি তো আছেই। অর্থমন্ত্রী কর না বাড়িয়ে করের আওতা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। সঠিক সিদ্ধান্ত। এনবিআর মনে করে, এই মুহূর্তে করহার কমালে রাজস্ব ঘাটতি দেখা দেবে। কিন্তু ক্রমান্বয়ে করহার কমিয়ে করের আওতা বাড়ানোকে উৎসাহিত করে সফল হলে মোট কর রাজস্ব অনেক বাড়বে। কর প্রশাসনকে উপজেলা পর্যন্ত সম্প্রসারিত করার কথা বিবেচনা করা যায়। কর প্রদান সহজতর করা এবং দুর্নীতি রোধে প্রযুক্তির ব্যবহার করা যেতে পারে। কর আদায়ে অর্থনীতিবিদ স্মিথের চারটি নীতি হলো : করদাতা সামর্থ্য অনুযায়ী কর দেবে। কখন, কীভাবে ও কত কর দিবে তা করদাতার জানা থাকবে। করদাতা সুবিধাজনক সময়ে কর দেবে এবং কর সংগ্রহের ব্যয় সর্বনি¤œ হবে। 

   

বাজেট বড় হওয়া সমস্যা নয় যদি এর বাস্তবায়ন সম্ভব হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এডিপি বাস্তবায়নের চিত্র সুখকর নয়। বছরের প্রায় নয় মাস ঢিমে তালে চলে। শেষ তিন মাসে তড়িঘড়ি শুরু হয়। ফলে লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এই অবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন। বছরের প্রথম থেকে এডিপি বাস্তবায়নকে গুরুত্ব দিতে হবে। এর জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতাসহ সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে।

 

প্রতি বছর বাজেটের আগে সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ যেমন ব্যবসায়ী বা তাদের নিয়োজিত লবিং গ্রুপ স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য জোরেশোরে নানাবিধ যুক্তি উপস্থাপন করেন বা সরকারের সঙ্গে দেনদরবার করেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সফলও হন। কিন্তু দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী সরকারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে না বা করতে পারে না। তাদের তেমন কোনো লবিং গ্রুপও নেই। একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের সরকার সাধারণ মানুষের স¦ার্থ সংরক্ষণ করে। প্রত্যাশা করছি আগামী বাজেটে সাধারণ মানুষের স্বার্থের লবিং গ্রুপ হবে বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত