চীন-মার্কিন শত্রুতার ঢেউ প্রযুক্তি বিশ্বে

আপডেট : ২৪ মে ২০১৯, ১০:৫০ পিএম

এ যেন আরেক ‘বিশ্বযুদ্ধ’! পশ্চিমা বিশ্বে একদিকে, চীন আরেক দিকে। অন্যান্য প্রভাবশালী দেশও বসে নেই। ভেতরে ভেতরে চলছে নানা আলোচনা। যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু শীতল এক বাণিজ্য লড়াই। যার খেসারত দিতে হচ্ছে বিশে^র অন্যতম সেরা ফোন প্রস্তুতকারক চীনা প্রতিষ্ঠান হুয়াউইকে। প্রযুক্তি জগতে ঢুকে পড়া চলমান এই বৈস  বেক বিতর্কের পেছনের কথা এবং সম্ভাব্য প্রভাবের বিস্তারিত জানাচ্ছেন অমৃত মলঙ্গি

বৈশি^ক রাজনীতি বড় বিস্ময়কর ব্যাপার। আপনার মনে হবে কিছু বিষয় এখানে এমনিতেই ঘটছে, আসলে তা নয়। ইশারা ছাড়া এই জগতে গাছের একটা পাতাও নড়ে না। সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়গুলো জটিল মনে হলেও কোনো পোড় খাওয়া বিশ্বনেতার এসব বুঝতে অসুবিধা হয় না। আর তাই চীনের রাজনীতিবিদরা দুই দশক ধরে এমন দিনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, যেটি এখন তাদের সামনে নিয়ে এসেছেন বহুল আলোচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই আলোচনায় ঢোকার আগে হুয়াউইর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ধারণা দেওয়া যাক।

মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গুগল হুয়াউইর ফোনে অ্যান্ড্রয়েড সেবাসহ নিজেদের কিছু কার্যক্রম বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চলতি বছরের শেষদিকে গুগল অ্যান্ড্রয়েডের পরবর্তী যে ভার্সন বাজারে আনবে সেখানে হুয়াউইর জন্য তাদের আপডেট বন্ধ থাকবে। তবে এখন যারা হুয়াউই ব্যবহার করেন, তাদের কোনো চিন্তা নেই।

গুগল সেসব সেবা থেকে নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছে যেখানে হার্ডওয়্যার অথবা সফটওয়্যারের জন্য টেকনিক্যাল সার্ভিস প্রয়োজন হয়। এখানে আবার বলা হয়েছে, ওপেন সোর্স লাইসেন্সের আওতায় যেসব সেবা আছে, সেগুলো পাওয়া যাবে।

ওপেন সোর্স লাইসেন্সের সেবা মূলত বিনামূল্যে পাওয়া যায়। এটি ব্যবহার করার স্বাধীনতা, তার প্রোগ্রামিং সংকেত (কোড) দেখার স্বাধীনতা, বিতরণ করার স্বাধীনতা, নিজের মতো পরিবর্তন করে তা ব্যবহার ও আবার বিতরণ করার স্বাধীনতা সবার থাকে। এগুলো একটি ওপেন সোর্স লাইসেন্সের আওতায় থাকে।

সে ক্ষেত্রে হুয়াউইর নতুন ফোনে পাওয়া যাবে না অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমের আপডেট। একই সঙ্গে জনপ্রিয় সেবা গুগল প্লে স্টোর, জিমেইল, ক্রোম ব্রাউজার এবং ইউটিউবও চলবে না। এগুলো গুগলের নিজস্ব ব্যবসায়িক সেবা।

 

গুগলের কেন এমন সিদ্ধান্ত?

 

গুগল মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের কারণে এটি করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুয়াউইকে ‘বিপজ্জনক’ তালিকাভুক্ত করার কয়েক দিন বাদে এই সিদ্ধান্ত নিল তারা। আমেরিকার অভিযোগ, চীনের এই প্রতিষ্ঠানটি তাদের রাষ্ট্রীয় তথ্য চুরির সঙ্গে জড়িত। এই অভিযোগের পেছনে রয়েছে মূলত দুই দেশের বাণিজ্যযুদ্ধ।

 

শুরুটা যেভাবে

 

‘আমি অনেক বছর ধরে চীন নিয়ে কথা বলছি। কেউ সেটি শোনার প্রয়োজন মনে করছে না’Ñ ২০১৬ সালে এক ভাষণের সময় এই কথা বলেন ট্রাম্প। তখন এর অর্থ অনেকের কাছে দুর্বোধ্য মনে হলেও, পরিষ্কার হয়েছে গত বছরের শুরু থেকেই।

শিক্ষা, অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং সামরিক ক্ষেত্রে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র সবসময় একে অন্যকে টেক্কা দিয়ে চলে। বিভিন্ন মহাদেশে যখন কোনো সমস্যা হয়, তখন এই দুই দেশ অধিকাংশ সময় দুই মেরুতে চলে যায়। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসর পর জাতীয়তাবাদের ধুয়ো তুলে চীনকে একটু ‘শায়েস্তা’ করার কৌশল অবলম্বন করেন। কিছুদিন আগে তিনি ঘোষণা দেন, ২০ হাজার কোটি ডলারের চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করবেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেড রিপ্রেজেনটেটিভ অফিসের তথ্যানুযায়ী, ২০১৮ সালে চীন থেকে ৫৩ হাজার ৯৫০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে যুক্তরাষ্ট্র এবং বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৪১ হাজার ৯২০ কোটি ডলার। যদি ট্রাম্প তার হুমকি বাস্তবায়ন করেন, তবে কার্যত চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি করা সব পণ্য কোনো না কোনো শুল্কের আওতায় পড়বে।

এ তো গেল আমেরিকার অবস্থান। চীনেরও দায় আছে। চীনা সরকার নিজেদের দেশের অভ্যন্তরে আমেরিকান বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসা করতে দিতে চায় না। গুগলের অধিকাংশ অ্যাপ সে দেশে চলে না। জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে তারা এসব করে। এর ভেতর আবার নতুন এক সরকারি নীতিমালা আমেরিকাকে চটিয়ে দেয়।

চীনা সরকারের ওই নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়, দেশের সব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতের খাতিরে গোয়েন্দাদের সাহায্য করতে হবে। এটি শুনে অবস্থান আরও শক্ত করে আমেরিকা। হুয়াউই তাদের নিজস্ব প্রযুক্তি আমেরিকায় ঢুকিয়ে কোনো তথ্য চীন সরকারকে দেয় কি না, সেটি নিয়ে মার্কিন প্রশাসনে শঙ্কা তৈরি হয়।

ফাইভ জি পুরোপুরি চালু হওয়ার আগেই মূলত আমেরিকা হুয়াউইকে হঠানোর পরিকল্পনা করে। কারণ এর মাধ্যমে একটি নেটওয়ার্কের সবকিছু দেখা যায়। কে কাকে ফোন করছে? কখন ফোন করছে? কোন জায়গা থেকে ফোন করছে? এবং কোন রুটে ডেটা পাঠানো হচ্ছে; এর সবকিছুই দেখা যায়।

এসব আলোচনার ভেতর মাস ছয়েক আগে মার্কিন অনুরোধে হুয়াউইর ঊর্ধ্বতন নির্বাহী মেং ওয়ানঝুকে আটক করে কানাডা কর্তৃপক্ষ। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কীভাবে ফাঁকি দেওয়া যায়, সেরকম এক ষড়যন্ত্রের সঙ্গে তিনিও যোগ দিয়েছিলেন স্কাইকম নামের একটি কোম্পানির মাধ্যমে।

ওই সময় মার্কিন সরকার তাদের ফেডারেল এজেন্সিগুলোকে নির্দেশ দেয় যেন তারা হুয়াউইর কোনো সামগ্রী ব্যবহার না করে। আমেরিকায় হুয়াউইর পণ্য ও সেবা বিক্রির ওপরও নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। শেষ পর্যন্ত গুগলকে ব্যবহার করে নেওয়া হলো চূড়ান্ত পদক্ষেপ।

 

বিশ্ব প্রযুক্তিতে কী প্রভাব পড়বে

 

সোজা কথায় একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন এলেও আসতে পারে। হুয়াউই এরই মধ্যে নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেম ‘হংমেং’ আনার ঘোষণা দিয়েছে। এই সিস্টেমকে তারা কতটা জনপ্রিয় করতে পারে সেটি দেখার বিষয়। ইউটিউব, জিমেইল, ক্রোম ব্রাউজারের মতো নতুন ডিভাইস প্রতিষ্ঠানটি আনতে পারে কি না, সেটি নিয়েও আলোচনা চলছে। তবে এই পথটা হুয়াউইর জন্য যুদ্ধ জয় করার মতো ব্যাপার হবে। কারণ গুগল তাদের ত্যাগ করায় সামনের কয়েক বছরে যে আর্থিক ক্ষতি হবে, তা সামাল দেওয়া চাট্টিখানি কথা নয়।

 

আর যারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে

 

হুয়াউইর পতনের সঙ্গে চিপ সেক্টর বড় একটি ধাক্কা খাবে। যেকোনো ডিজিটাল যন্ত্রের প্রাণ হচ্ছে এই চিপ। চিপ বা মাইক্রোচিপ না হলে মোবাইলের মতো ‘ছোট কম্পিউটার’ বা যন্ত্র তৈরি করা যেত না।

এই মাইক্রোচিপ নিয়েই এখন কোটি কোটি ডলারের ব্যবসা হচ্ছে। বৈশি^কভাবে ইলেকট্রনিকস ডিভাইসের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে সংশ্লিষ্ট ডিভাইসগুলোয় চিপের চাহিদাও। এতে প্রসারিত হচ্ছে সেমিকন্ডাক্টর ব্যবসা বা চিপ নির্মাণ খাত। চিপ তৈরিতে এত দিন শুধু মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো একচ্ছত্র আধিপত্য দেখিয়েছে। কিন্তু এখন চিপের রাজ্যে হানা দিচ্ছে চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো। শুরু হয়ে গেছে ‘চিপযুদ্ধ’। মার্কিন কোম্পানি কোয়ালকম, ইনটেল গুগলের মতো হুয়াউইর সঙ্গে চুক্তি থেকে সরে এসেছে। এখন এই দুই প্রতিষ্ঠানের আয় কমে যাবে। পাশাপাশি চীনের চিপ নির্মাণ খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

মরগ্যান নামের এক চিপমেকার এ বিষয়ে প্রযুক্তিবিষয়ক জনপ্রিয় ওয়েবসাইট সিনেটকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের চিপমেকার এবং অন্য কোম্পানিগুলো চাপে আছে। হুয়াউইকে ছেড়ে দিলে তারা লভ্যাংশ হারাবে। হুয়াউই আমেরিকার বেশ কয়েকটি কোম্পানির কাছ থেকে এসব কিনে থাকে।’

 

সবচেয়ে লাভবান হবে যারা

 

হুয়াউই নিজেদের গুছিয়ে নিতে নিতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্যামসাং লালে লাল হয়ে যাবে। হুহু করে বাড়তে পারে তাদের ফোন বিক্রি। হুয়াউইর পরিকল্পনা ছিল ২০২০ সাল নাগাদ বৃহত্তম ফোন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের আসন থেকে স্যামসাংকে সরিয়ে দেওয়া।

সিনেট বলছে, হুয়াউইর এমন বিপদে আইফোনও লাভবান হবে। কিন্তু উপকারটা হবে স্যামসাংয়ের বেশি। অথচ গত কয়েক বছরে হুয়াউই ফোনের কাছে রীতিমতো ধরাশায়ী অবস্থায় ছিল স্যামসাং!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত