‘হাম কাস্তে-হাতুড়ি তারা হ্যায়। কিন্তু মোদি সরকার মে সাপোর্ট করতা হ্যায়।’ রায়গঞ্জের মধ্যবয়স্কা এক গৃহবধূ রিনা সাহার সাক্ষাৎকারের এই ভিডিও ভোটের আগে থেকেই ভাইরাল হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। হাতে হাতে স্মার্টফোনে ছড়িয়েছে অখ্যাত এই গৃহবধূর হিন্দি টিভি সাক্ষাৎকার। যেখানে তিনি বলছেন, ‘বাইশ দিন গুজরাট ঘুরকে আয়া হ্যায়। গুজরাট মে বিকাশ হুয়া হ্যায় মানে স্বর্গ হুয়া হ্যায়। মোদি সরকার নেই তো করতা হ্যায়। কাজেই মোদি সরকারকে হাম সাপোর্ট করতা হ্যায়।’
এমন মোক্ষম অস্ত্র হাতে পেয়ে লুফে নিয়েছিল গেরুয়া শিবিরের মিডিয়া সেল। মোদির গুজরাট মডেলের ‘নয়া ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর’ পেয়ে গিয়েছিল তারা। তারপরই সোশ্যাল মিডিয়ায় রাতারাতি বিখ্যাত রায়গঞ্জের ওই সাধারণ গৃহবধূ। এমনকি এই ভাইরাল ভিডিও পৌঁছে গেছে স্বয়ং নরেন্দ্র মোদির কাছেও। রবিবার গুজরাটের আমেদাবাদের বিজয়মঞ্চে দাঁড়িয়েও মোদি ‘বাংলার ওই এক বয়স্কা বোনের’ কথা উল্লেখ করেন, যিনি মোদি মোদি করে ভাঙা হিন্দিতে কথা বলছিলেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। নিজের রাজ্য গুজরাটের মাটিতে দাঁড়িয়ে নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহর মুখে বাংলার নাম বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে বলেই মনে করছে পর্যবেক্ষক মহল। বলেছেন, “এত জোরে ‘ভারত মাতা কি জয়’ বলুন যেন সে আওয়াজ পৌঁছে যায় বাংলা পর্যন্ত।” বস্তুত, এই উৎসাহের নেপথ্যে আছে ভোটপ্রাপ্তির পরিসংখ্যান। দেশের সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তরপ্রদেশের পর বাংলাতেই সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে বিজেপি। সংখ্যাটা ২.৩ কোটি।
এর নেপথ্যে কাস্তে-হাতুড়ি-তারার অনুগত রিনা সাহাদের অবদান কম নয়। রিনাদেবী অবশ্য নিজে ভোট দেননি পদ্মফুলে। জিজ্ঞেস করতে বলেছেন, তিনি আশৈশব বৈষ্ণব। কাস্তে-হাতুড়ি তাঁর গোবিন্দ। তাই ধর্মসংকটের আশঙ্কায় নিজে না পারলেও পরিচিতদের জনে-জনে বলেছেন মোদিকে ভোট দিতে। তবে এ রাজ্যের বামপন্থিরা সবাই রিনাদেবীর মতো ‘বৈষ্ণব’ নন, তাই ‘গোবিন্দকে’ ছেড়ে পদ্মবনে ঝাঁপ দেওয়ার ধর্মসংকটও তাদের নেই। ফলে বামদের কাটা খাল বেয়েই বাংলায় তরতরিয়ে এগোতে পেরেছে রামের বিজয়রথ। অন্তত এই বাংলায় নিজেদের দুর্গে ধস নামিয়ে বাম-সমর্থকরা এবার অন্তত উজাড় করে দিয়েছেন বিজেপির ঝুলি। অভাবনীয় এই পরিস্থিতিতে হতচকিত বাম নেতৃত্ব। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র বলেছেন, ‘এত বড় বিপর্যয় এর আগে কখনো আসেনি।’ বিপর্যয়ের কারণ খুঁজতে মাথার চুল ছিঁড়ছেন সীতারাম ইয়েচুরি, প্রকাশ কারাটরা।
দীর্ঘ ৩৪ বছর একটানা বাংলা শাসন করেছে বামফ্রন্ট। ২০১১-তে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পরিবর্তনের ঝড়ে’ রাজ্যপাট গেলেও এমন করুণ অবস্থায় আর কখনো পৌঁছাতে হয়নি বামদের। ২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনে দেশজুড়ে মোদি-হাওয়া সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের ভোট প্রাপ্তির হার ছিল ৩৯.০৫ শতাংশ। ২০১৬-র রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট গড়ে বামেরা পেয়েছিল ৪৪.৯১ শতাংশ ভোট। এবার সেই ভোটপ্রাপ্তির হারই কমে দাঁড়িয়েছে ৭ শতাংশের কাছাকাছি! প্রায় সাড়ে তিন দশক রাজ্যের শাসনক্ষমতায় ছিল যে বামফ্রন্ট, মাত্র আট বছরেই তারা রাজনীতির ময়দানে এমন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেল কীভাবেÑ তা ভাবাচ্ছে পর্যবেক্ষকদের।
এবারের লোকসভা নির্বাচনে বাংলার ৪২টি কেন্দ্রের মধ্যে ৪১টিতেই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন বাম প্রার্থীরা। লোকসভায় মনোনয়ন পেশ করতে গেলে সাধারণ প্রার্থীদের ২৫ হাজার টাকা জামানত জমা রাখতে হয়। তফসিলি জাতি-উপজাতি প্রার্থীদের ক্ষেত্রে অবশ্যই এই পরিমাণটা কম। তবে নির্বাচনে ন্যূনতম ১৬.৬৬ শতাংশ ভোট না পেলে ওই জামানতের অর্থ বাজেয়াপ্ত হয়। তাৎপর্যপূর্ণভাবে এবার ৪০ জন বাম প্রার্থীরই জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। ব্যতিক্রম একমাত্র যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রের সিপিএম প্রার্থী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। তিনি পেয়েছেন ২১.০৪ শতাংশ ভোট। তার বাকি সতীর্থরা রয়ে গেছেন দেড় থেকে ১৪ শতাংশের মধ্যে। এমনকি সিপিএম পলিটব্যুরোর অন্যতম সদস্য তথা রায়গঞ্জের বিদায়ী সাংসদ মহম্মদ সেলিমের ভাগ্যেও ১৪.২৫ শতাংশের বেশি জোটেনি ভোট।
মনে করা হচ্ছে, বাম ভোটব্যাংকের এই ক্ষয়েই পুষ্ট হয়েছে বিজেপি। গত নির্বাচনের চেয়ে তারা পেয়েছে ৩০ শতাংশ বেশি ভোট। বামদের নিশ্চিহ্ন করে বলীয়ান হয়েছে রাম। একদা বাম দুর্গ বলে কথিত বাংলার মাটিতে হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের এই চকিত উত্থান কি ভারতের রাজনীতিতে এক নতুন বাঁকের রেখাচিত্রকেই স্পষ্ট করে তুলেছে? কিছু দিন আগেও মহারাষ্ট্রসহ বিভিন্ন রাজ্যে উত্তাল কৃষক আন্দোলনে ঢেউ তুলেছিল যে লাল পতাকার প্লাবন, কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে বামদের সভায় আছড়ে পড়েছিল যে জনপ্লাবন, তার ছিটেফোঁটাও প্রতিফলন দেখা গেল না ইভিএমে। এই পরস্পরবিরোধী ঘটনাপ্রবাহ ধন্দে ফেলে দিয়েছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।
তবে নোবেলজয়ী সমাজ ও অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের মতে, নরেন্দ্র মোদির এই বিপুল জয়টা আসলে ক্ষমতার লড়াইয়ে, মতাদর্শের লড়াইয়ে নয়। নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ লেখা এক নিবন্ধে তিনি বলেছেন, ২০১৪ থেকে তার প্রতিশ্রুতিগুলো অতি সামান্যই পূরণ করতে পেরেছেন মোদি। তাই নির্বাচনী প্রচারে তার বাগ্মিতায় বারবারই তিনি জোর দিয়েছেন জাতীয়তাবাদ, জাতীয় নিরাপত্তা ও পাকিস্তান জুজুর ওপর। মোদির এই জয়কে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের হঠাৎ নাটকীয়ভাবে জনসমর্থন বৃদ্ধির সঙ্গে তুলনা করেছেন অমর্ত্য সেন। বলেছেন, থ্যাচারের ক্ষেত্রে ১৯৮২তে যেটা হয়েছিল ফকল্যান্ড যুদ্ধের পর, সেভাবেই পাকিস্তানের সঙ্গে ফেব্রুয়ারির সীমান্ত যুদ্ধ মোদির ক্ষেত্রে নির্বাচনে তুরুপের তাস হয়ে উঠেছে। অন্যথায়, বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদের মতে, বেকারত্বের হার থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক বিকাশের অস্থির হার প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং সরকারি নিষ্ক্রিয়তা ও দুর্নীতিরোধ সবই তো নেতিবাচক মোদির প্রথম জমানায়।
অমর্ত্য সেনের এই মন্তব্যে অক্সিজেন খোঁজার চেষ্টা করছেন এখানকার বাম নেতৃত্ব। তারা বিশ^াস করতে চাইছেন, দক্ষিণপন্থী ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের এই উত্থান নেহাত সাময়িক। তবু এখনই এ নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে নারাজ তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রথম সারির বরিষ্ঠ বাম নেতা স্বীকার করলেন, ‘পার্টির প্রতি আস্থাহীনতা মহামারীর মতো ছড়িয়েছে কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে। এর প্রধান দাওয়াই জনসংযোগ। প্রথমে মন দিতে হবে সেই দিকেই।’
