ভারতের জিএসপি সুবিধা বাতিল করল যুক্তরাষ্ট্র

আপডেট : ০২ জুন ২০১৯, ০৩:১৯ এএম

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার একদিন পরই বড় দুঃসংবাদ পেলেন নরেন্দ্র মোদি। ভারতের বাজারে সমপরিমাণ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া না হলে যুক্তরাষ্ট্রে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা (জিএসপি) বাতিল করার যে হুমকি দিয়ে রেখেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, তা আগামী বুধবার থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে। বেঁধে দেওয়া ৬০ দিনের মধ্যে দাবি মেনে না নেওয়ায় গত শুক্রবার ভারতীয় পণ্যের জিএসপি সুবিধা বাতিলের ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

আশির দশক থেকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনায় নিয়ে জিএসপি চালু করে যুক্তরাষ্ট্র। এ সুবিধার আওতায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর শত শত পণ্য বিনা শুল্কে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি করার সুযোগ দেওয়া হয়। ভারত প্রায় এক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এ সুবিধা পেয়ে আসছে।

২০১৬ সালের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর বাণিজ্য সুবিধা কমাতে শুরু করেন। বাণিজ্যযুদ্ধে চীনের বিপুল পরিমাণ পণ্যে শুল্ক বাড়ান তিনি। গত ৪ মার্চ ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ভারতের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের সহজ প্রবেশাধিকার নেই। যুক্তরাষ্ট্রের সমপরিমাণ পণ্যকে ভারত সমসুযোগ না দিলে জিএসপি সুবিধা বাতিল করা হবে। ওই সময়ই ভারতের জিএসপি বাতিলের জন্য কংগ্রেসে বিষয়টি উত্থাপন করেন ট্রাম্প। দেশটির নিয়ম অনুযায়ী কংগ্রেসে কোনো কিছু উত্থাপনের পর তা কার্যকর করতে ৬০ দিন অপেক্ষা করতে হয়। সে হিসাবে আগামী ৫ জুন থেকে ভারতের জিএসপি সুবিধা বাতিল হবে।

এ বিষয়ে শুক্রবার ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা যে ধরনের বাণিজ্যিক সুবিধা ভারতকে দিয়ে থাকি, তার সমতুল্য ও গ্রহণযোগ্য কোনো কিছু দেওয়ার ব্যাপারে পাল্টা আশ্বাস পাইনি। তাই ৫ জুন থেকে উন্নয়শীল দেশ হিসেবে এই বিশেষ মর্যাদা ভারত পাবে না।’

জানুয়ারি মাসে কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জিএসপি সুবিধা পাওয়া দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সুফলভোগী ভারত। এ সুবিধার আওতায় শুধু ২০১৭ সালেই ৫৭০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে দেশটি। ভারতের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে জিএসপি সুবিধার আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে তাদের রপ্তানির পরিমাণ ৬৩৫ কোটি ডলার।

গত মার্চে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, তারা এই বিশেষ মর্যাদা শেষ করার পক্ষে। কিন্তু কূটনৈতিক মহলের একাংশ মনে করেছিল, নরেন্দ্র মোদি আবার প্রধানমন্ত্রী হবেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের সুসম্পর্কের কথা সবাই জানেন। এ অবস্থায় এমন কোনো সিদ্ধান্ত হবে না।

গত বৃহস্পতিবার নরেন্দ্র মোদি যখন দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন, তখন যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘নরেন্দ্র মোদি নতুন করে দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আরও সুগম হবে। কিন্তু মার্চ মাসে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা পরিবর্তনে তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই। আমার মনে হয়, বিষয়টি ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত হয়ে গেছে। এখন শুধু এটাই দেখার যে, আগামী দিন বিষয়টি আমাদের তরফ থেকে কীভাবে করা হয়।’

ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান এক্সপোর্ট অর্গানাইজেশনসের তথ্য অনুযায়ীÑ ২০১৮ সালে বিশ্ববাজারে ভারতের রপ্তানির পরিমাণ ৩২৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, যার ৫১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এর মধ্যে ৬ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি হয়েছে জিএসপি সুবিধার আওতায়। যুক্তরাষ্ট্র ১৯২১ ট্যারিফ লাইনের পণ্যগুলোকে জিএসপি সুবিধা দিয়েছে। 

জিএসপি সুবিধা বাতিল করায় যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমার আশঙ্কা রয়েছে। অ্যাপারেল এক্সপোর্ট প্রমোশন কাউন্সিলের (এইপিসি) তথ্য অনুযায়ী, জিএসপি সুবিধার আওতায় ৫৮ কোটি ডলার মূল্যের ১৫ ধরনের তৈরি পোশাক আমদানি করত যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে ভারতের হিস্যা ১ কোটি ৮০ লাখ ডলার। এইপিসির তথ্যমতে, এই ১৫ পণ্যের মধ্যে জিএসপি বাতিল হলে ১১টির ওপর তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না। তবে বেশি প্রভাব পড়বে নারী ও মেয়েদের পোশাক রপ্তানির ওপর।

ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গতকাল এক বিবৃতিতে বলেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জোরদারে কাজ করবে। অর্থনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে সবসময়ই কিছু ইস্যু সৃষ্টি হয়, যা পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সময় সময় সমাধান করা হয়। তাদের বিশ্বাস, পারস্পরিক স্বার্থে বিষয়টি সুরাহা করা যাবে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি শুল্কারোপ থেকে রেহাই পেতে চীনের কোম্পানিগুলো দ্রুত ভিয়েতনামে স্থানান্তর হচ্ছে। সেদিকেও নজর রাখছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যেই টুইটে বলেছেন, ‘শুল্ক আরোপিত অনেক কোম্পানি চীন ছেড়ে ভিয়েতনাম বা এশিয়ার অন্য দেশে যাচ্ছে। সে কারণেই চীন চুক্তিটি বাজেভাবে করতে চাইছে।’ তার এ বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, ভবিষ্যতে ‘মেড ইন ভিয়েতনাম’ ট্যাগটি নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর জন্য যথেষ্ট না-ও হতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত