রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার পরও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ কেন বাড়ছে, তার কারণ অনুসন্ধানের নির্দেশনা দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। একই সঙ্গে খেলাপি কমিয়ে আনারও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। গতকাল রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক বৈঠকে এমন নির্দেশনা দেন গভর্নর।
গতকাল গভর্নর ফজলে কবিরের সভাপতিত্বে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আসাদুল ইসলাম, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস এম মনিরুজ্জামান ও আহমেদ জামাল, নির্বাহী পরিচালক এস এম রবিউল হাসান ও মো. সিরাজুল ইসলাম ছাড়াও রাষ্ট্রায়ত্ত সাত ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত এ সভায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ বাড়ায় গভর্নর ফজলে কবির ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আসাদুল ইসলাম অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, চলতি বছরের মার্চে খেলাপি ঋণ কেন এত বাড়ল তার কারণ অনুসন্ধানে রাষ্টায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের নির্দেশ দিয়েছেন গভর্নর ফজলে কবির। একই সঙ্গে ঋণ পুনরুদ্ধার কার্যক্রম জোরদারের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনারও নির্দেশনা দিয়েছেন।
চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল থেকে জুন) খেলাপি ঋণ কমে আসবে বলে গভর্নরকে আশ^স্ত করেন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা। বৈঠকে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডি জানান, সাধারণত বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) খেলাপি ঋণ বেড়ে যায়। পরবর্তী প্রান্তিকে তা কমে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
খেলাপি ঋণ দেশের ব্যাংক ব্যবস্থায় কেলেঙ্কারির জন্ম দিচ্ছে ও তা রকেট গতিতে বেড়েই চলেছে। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৮ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। আর চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা।
অবশ্য বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর অবলোপন করা ঋণ যোগ করলে প্রকৃত খেলাপির পরিমাণ আরও বাড়বে। গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ ছিল ৫২ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা। এর ফলে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৬৩ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা।
চলতি প্রথম প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ বাড়ার বড় কারণ হচ্ছে বেসরকারি ব্যাংক। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৮ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা, যা তিন মাসের ব্যবধানে ৪৯ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। এ সময় বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩১ শতাংশ। মোট খেলাপি ঋণের ৪৫ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ হচ্ছে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে ২০১৮ সাল শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৪৮ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা, যা চলতি প্রথম প্রান্তিক শেষে ৫৩ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। মোট খেলাপি ঋণের ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ। তিন মাসে ৫ হাজার ১৮৩ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ বেড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর। এ ছাড়া মোট খেলাপি ঋণের ৪ দশমিক ৩২ শতাংশ বিশেষায়িত ব্যাংক বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের এবং ২ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ হচ্ছে বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের ৩১ মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের স্থিতি ছিল ৯ লাখ ৩৩ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা। এ হিসাবে মন্দঋণের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৮৭ শতাংশে।
দেশের ব্যাংক ব্যবস্থায় খেলাপি যাতে আর না বাড়ে সেজন্য গত ২৫ মার্চ অর্থমন্ত্রী খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের জন্য বিশেষ সুযোগ দেওয়ার ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। যার ধারাবাহিকতায় ১৬ মে বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপিদের বিশেষ সুবিধা দিয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। যাতে ২ শতাংশ এককালীন জমা দিয়ে ১০ বছর মেয়াদে ঋণ পুনঃতফসিল ও এককালীন এক্সিট বা সম্পূর্ণরূপে পরিশোধের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে ঋণের সুদহার কোনোভাবেই ৯ শতাংশের বেশি হবে না বলে প্রজ্ঞাপনে বলা হয়।
নীতিমালাটি জারির পর অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা এর সমালোচনা
করে বলেন, এ নীতিমালার কারণে ভালো গ্রাহকরাও খেলাপি হতে আগ্রহী হবে। এ প্রেক্ষিতে গত ২২ মে উচ্চ আদালতে রিট মামলা হলে নীতিমালাটি ২৪ জুন পর্যন্ত স্থগিতের আদেশ দেন হাইকোর্ট ।
