চিকিৎসকদের অব্যাহত আন্দোলনের মুখে অবশেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) ২০০ চিকিৎসক নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার আন্দোলনরতদের পাশাপাশি বিএসএমএমইউ ও ঢাকা শিশু হাসপাতালসহ কয়েকটি হাসপাতালের শতাধিক চিকিৎসক উদ্ভূত পরিস্থিতি সমাধানে চাপ দিলে বিশ^বিদ্যালয় উপাচার্য তাৎক্ষণিকভাবে মৌখিক পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা দেন। তবে পুরো নিয়োগ বাতিল করে নতুন করে পরীক্ষা নেওয়া হবে
কি না, সে বিষয়ে ওই বৈঠকে কোনো আলোচনা হয়নি।
এ ব্যাপারে বিশ^বিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়–য়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, আপাতত মৌখিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। বাকি সিদ্ধান্ত হবে বিশ^বিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায়।
সে ক্ষেত্রে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করা হবে কি নাÑ জানতে চাইলে উপাচার্য বলেন, নিয়োগ বাতিলের এখতিয়ার আমার নেই। সিন্ডিকেট কী গাইডলাইন দেয়, সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হবে। সিন্ডিকেটের গাইডলাইন অনুযায়ীই নিয়োগ প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে। সুতরাং সিন্ডিকেট যা বলবে সেটাই হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, আগামীকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় সিন্ডিকেট সভা রয়েছে। সেখানে এ ব্যাপারে আলোচনা হবে। পরে সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত জানাতে সভার পর সংবাদ সম্মেলন করা হতে পারে।
গতকাল যেসব চিকিৎসক উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে উপাচার্যের সঙ্গে আলোচনা করতে গিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে বেশিরভাগই বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ), আওয়ামী লীগপন্থি স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) কেন্দ্রীয় কমিটি এবং বিএসএমএমইউ ও ঢাকা শিশু হাসপাতালের স্বাচিপের নেতা ছিলেন। এর আগে এসব চিকিৎসক নিয়োগ পরিস্থিতি সমাধানে বিশ^বিদ্যালয়ের বি-ব্লকের দোতলায় চিকিৎসকদের ক্যান্টিনে আলোচনায় বসেছিলেন।
এ ব্যাপারে বিশ^বিদ্যালয়ের কার্ডিওলজি বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. বশির জামাল জয় দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেলা ১১টার দিকে আমরা আলোচনা করছিলাম কীভাবে সমস্যার সমাধান করা যায়। বিশেষ করে আন্দোলনরত জুনিয়র চিকিৎসকদের সঙ্গে গত কয়েক দিন ধরে পুলিশ যে আচরণ করছিল, তা মেনে নিতে পারছিলেন না কেউ। আলোচনা চলাকালে হঠাৎ করেই নিচতলায় হট্টগোল শুনতে পাই। আমরা নিচে এসে দেখি পুলিশ বিশ^বিদ্যালয়ের মূল গেট বন্ধ করে দিয়েছে। আন্দোলনকারীরা বেরোতে বা ঢুকতে পারছে না। পুলিশকে গেট খুলে দিতে বললে পুলিশ আমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। একপর্যায়ে আমরা উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে পুলিশ সিঁড়িতে আটকে দেয়। এ সময় পুলিশ আমাদের ওপর চড়াও হয় ও লাঠিচার্জ করে। একপর্যায়ে আমরা কয়েকজন উপাচার্যের কক্ষে ঢুকি। বাকিরা বাইরে থাকে। সে সময়ও পুলিশ পেছন থেকে আমাদের গালিগালাজ করতে থাকে ও ‘দেখে নেব’ বলে শাসায়। তারপরও আমরা পরিস্থিতি সামাল দিয়ে উপাচার্যের সঙ্গে আলোচনা করি।
বরিশাল মেডিকেল কলেজের এই সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি ও স্বাচিপের সঙ্গে যুক্ত ডা. জয় আরও বলেন, চিকিৎসকরা উপাচার্যকে পরিস্থিতির সমাধান করতে বলেন। এ সময় পরীক্ষা বাতিল, ক্যাম্পাস থেকে পুলিশ প্রত্যাহার ও যেসব পুলিশ চিকিৎসকদের মারধর করেছে তাদের শাস্তি দাবি করি। উপাচার্য তাৎক্ষণিকভাবে মৌখিক পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা দেন। বাকিগুলো সিন্ডিকেট সভায় আলোচনা করে পূরণের আশ^াস দেন।
ডা. বশির জামাল জয় বলেন, এটা দেশের একমাত্র চিকিৎসা বিশ^বিদ্যালয়। এখানে বিশেষায়িত চিকিৎসক তৈরি করা হয়। সুতরাং এখানে যেকোনো সিদ্ধান্ত প্রশাসনকে সতর্কতার সঙ্গে নিতে হবে। যেকোনো ব্যাপারে প্রশাসন অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল, সিন্ডিকেট ও রাজনৈতিক বডির সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে। বর্তমান উপাচার্য তা করেননি। প্রথম যখন এই নিয়োগের লিখিত পরীক্ষার তারিখ হয়, তার দুই দিন পরই উপাচার্য হঠাৎ করে তদবিরের চাপের কথা বলে পরীক্ষার তারিখ বাতিল করলেন। তদবির থাকবেই। সেটাকে সামাল দিয়েই বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন চালাতে হবে। এই নিয়োগ জটিলতা নিয়ে উপাচার্য কারও সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা না করে পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছেন।
এই চিকিৎসক আরও বলেন, নিয়োগের বিরুদ্ধে আদালতে রিট হয়েছে। উপাচার্য অপেক্ষা করতে পারতেন। তা না করে তিনি মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া শুরু করেছেন। এটা ঠিক হয়নি। এখন উপাচার্যের উচিত এই নিয়োগ প্রক্রিয়া পুরোটা বাতিল করে নতুন করে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা।
এ ব্যাপারে আন্দোলনরত চিকিৎসকদের প্রতিনিধি ডা. মাঈদুল হাসান শিপন দেশ রূপান্তরকে বলেন, উপাচার্যের বিরুদ্ধে নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট ছয়টি অভিযোগ আমাদের কাছে আছে। তিনি সেগুলো আমলে নেননি। উল্টো পুলিশ দিয়ে আন্দোলন দমাতে চেয়েছেন। এমনকি রেজিস্ট্রারের কক্ষের সামনে বোতল রেখে ‘পেট্রোল বোমা’ নাটক সাজিয়েছেন। পুলিশ ও আনসার দিয়ে আমাদের ওপর লাঠিচার্জ করিয়েছেন।
এই চিকিৎসক বলেন, আমরাও দলীয় নিয়োগ চাই না। ঠিকমতো পরীক্ষা হলে আমরা উত্তীর্ণ হব। এখানে স্বজনপ্রীতি করে উপাচার্যসহ বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন ও বিশ^বিদ্যালয়ের বাইরে বিভিন্ন দপ্তরের প্রভাবশালী লোকজনের আত্মীয়স্বজনদের উত্তীর্ণ করা হয়েছে। সুতরাং সবাই মিলে একযোগে এই নিয়োগ দিতে উঠেপড়ে লেগেছেন। আমরা এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি। এই নিয়োগ বাতিল করে নতুন করে নিয়োগ চাই।
এর আগে গত রবিবার আন্দোলনরত চিকিৎসকদের ওপর লাঠিচার্জ করে পুলিশ ও বিশ^বিদ্যালয় আনসার। সেখানে ২০ জনের মতো চিকিৎসক আহত হন। পরে অনশনে বসেন চিকিৎসকরা। সে রাতেই ক্যাম্পাসে যান ডাকসু ও ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। তিনি আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। পরে এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় হওয়া অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র প্রমাণসহ তুলে ধরে তার ফেইসবুক পেজে একটি স্ট্যাটাস দেন। স্ট্যাটাসে এই পরীক্ষার রেজাল্ট বাতিল করে পুনরায় পরীক্ষা গ্রহণ করা উচিত বলে মন্তব্য করেন।
গত ২০ মার্চ বিএসএমএমইউতে ২০০ চিকিৎসক নিয়োগ পরীক্ষা হয়। ফল প্রকাশ হয় ১২ মে। ১৮০ জন মেডিকেল অফিসার ও ২০ জন ডেন্টাল চিকিৎসক পদে ২০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষায় ৮ হাজার ৫৫৭ জন চিকিৎসক অংশ নেন। লিখিত পরীক্ষায় এক পদের জন্য চারজন পাস করেন। এ হিসাবে ৭৩৯ জন মেডিকেল অফিসার ও ডেন্টালের ৮১ জন মিলে মোট ৮২০ জন লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ফল ঘোষণার পর থেকেই নানা অনিয়মের অভিযোগ আসতে থাকে। পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে আন্দোলনে নামেন পরীক্ষার্থী চিকিৎসকরা। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকে। ক্যাম্পাসে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। একপর্যায়ে গত রবিবার পুলিশ ও বিশ^বিদ্যালয় আনসার চিকিৎসকদের ওপর লাঠিচার্জ করে ও ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেয়। এমনকি উদ্ভূত পরিস্থিতির মধ্যেই গত সোমবার থেকে মৌখিক পরীক্ষা শুরু হয়। সংকট সমাধানে শেষ পর্যন্ত গতকাল বিএমএ ও স্বাচিপ নেতারা উপাচার্যের সঙ্গে বৈঠকে বসেন এবং সেখানেই মৌখিক পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা আসে।
