ইসলামে কাজের গুরুত্ব

আপডেট : ১৩ জুন ২০১৯, ১১:৪২ পিএম

কাজ হলো মানবজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ধর্ম পালন, ইমান রক্ষা ও উত্তম জীবনযাপনের পাথেয় হিসেবে কাজই হলো মূল। এ জন্য মানববতার ধর্ম ইসলাম ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের নিরাপত্তার জন্য ব্যক্তি পর্যায়ে কর্মসংস্থানের ওপর জোর দিয়েছে। ইসলামে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের গুরুত্ব স্পষ্ট ও অপরিহার্য। ইসলাম মানুষের প্রয়োজনীয় জিনিসের নিশ্চয়তা দিয়েছে আর অভাব-অনটন থেকে সর্বদা বেঁচে থাকতে পানাহ চাইতে বলেছে। এমনকি হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভাবকে কুফরির সঙ্গে তুলনা করেছেন। অনেক সময় মানুষ অভাবের কারণে কুফরিতে পতিত হয়। অভাবের ধ্বংসাত্মক ও ক্ষতিকর প্রভাবে আজ বিশ্বের মানুষ পশ্চাৎপদতা, অক্ষমতা, নিঃসঙ্গতা ও দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি মহামারীতে পড়ে আছে, তাদের সামাজিক জীবনে অভাবের প্রভাব স্পষ্ট বিদ্যমান। দারিদ্র্য ও বেকারত্বের ফলে সামাজিক অবক্ষয় দেখা দিয়েছে ও মানব সম্পদ উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এটা গোটা বিশ্বের সামষ্টিক সমস্যা।

ইসলাম নিজ হাতের কাজকে সর্বোত্তম হালাল রিজিক বলে আখ্যায়িত করেছে। হাদিসে এসেছে, ‘নিজ হাতে উপার্জিত জীবিকার খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য কখনো কেউ খায় না। আল্লাহর নবী হজরত দাউদ (আ.) নিজ হাতে উপার্জন করে খেতেন।’ সহিহ বোখারি : ২০৭২। হাদিসে নবী করিম (সা.) আরও বলেছেন, ‘তোমাদের কারও পক্ষে এক বোঝা লাকড়ি সংগ্রহ করে পিঠে বহন করে নেওয়া উত্তম, কারও কাছে হাত পাতার চাইতে। (যার কাছে যাবে) সে দিতেও পারে অথবা নাও দিতে পারে।’ সহিহ বোখারি : ২০৭৪।

এখানে কাজ বলতে মানুষের যাবতীয় কর্মকা-কে বুঝানো হয়েছে, যার অর্থনৈতিক মূল্য আছে, চাই তা শারীরিক পরিশ্রম হোক বা চিন্তাভাবনা ও মানসিক পরিশ্রম। ইসলামি শরিয়ত অবৈধ পন্থায় উপার্জন করা হারাম করেছে। যেমন যাবতীয় মাদকদ্রব্য, সুদ, ঘুষ, পতিতাবৃত্তি, জুয়া, শূকর, অন্যের অধিকার হরণ ইত্যাদিকে হারাম করেছে। কেননা, এগুলো মানুষের বিবেকের কর্মশক্তিকে লোপ করে দেয় ও উন্নত চরিত্রকে ধ্বংস করে দেয় ও অবৈধ পন্থায় সম্পদ অর্জনের উপায় বের করে। এক কথায়, ধর্ম ও জীবন ধারণের মূল উপাদান হিসেবে কাজের প্রকৃত গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনুধাবন করে ইসলাম কাজের ব্যাপারে অনেক বিধিনিষেধ ও উৎসাহ-উদ্দীপনা দিয়েছে।

ইসলাম ব্যক্তির কাজ আদায়ের ধরন ও উৎপাদনের মধ্যে সমন্বয় করেছে, তাকে কমপক্ষে এতটুকু কাজ করতে হবে যা তার প্রয়োজন মেটায় ও সমাজ এর দ্বারা উপকৃত হয়। কেননা ব্যক্তি উপকৃত হলেও সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন কোনো কাজ করা যাবে না। তার কাজের মাধ্যমে ব্যক্তি ও জাতির জীবনযাপনের মাঝে একটা স্পষ্ট ও উল্লেখযোগ্য প্রভাব থাকতে হবে। এটাই কুরআনে কারিমে বারবার বলা হয়েছে যে, সৎ ও কল্যাণকর কাজ করো। আর যারাই সৎ কাজ করবে তারাই সফলকাম হবে। সে কোনো বিষয়ে দক্ষ ও পারদর্শী হলে তাকে সে পদে অধিষ্ঠিত করতে ইসলাম আদেশ দিয়েছে। অযোগ্য, অদক্ষ ও অলসের স্থান ইসলামি সমাজে নেই। আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘আর তারা যা করে, সে অনুসারে প্রত্যেকের মর্যাদা রয়েছে এবং তোমার রব তারা যা করে সে সম্পর্কে গাফেল নন।’ সুরা আল আনআম : ১৩২

ইসলাম ব্যক্তি ও সমষ্টিকে কল্যাণকর কাজের আদেশ দিয়েছে, এর দ্বারা তাকে দারিদ্র্য, বেকারত্ব, অলসতা, অক্ষমতা ও ভিক্ষাবৃত্তি থেকে মুক্তি দিয়েছে। তাকে জীবনধারণের প্রয়োজনীয় উপার্জন ও মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে হবে। ইসলাম নারী-পুরুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় মৌলিক চাহিদা মেটানোর রিজিক অন্বেষণে প্রচেষ্টা করাকে ফরজ করেছে। রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য অত্যাবশ্যকীয় হলো জনগণকে উৎপাদনশীল কাজের সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া। ইসলামের শিক্ষা হলো নিজের হাতের অর্জিত রিজিকই উত্তম এবং জমিনের আবাদ, নির্মাণ ও উন্নয়ন কাজের মাধ্যম কাজের দিকে আহ্বান করা হয়েছে। সুতরাং আমাদের ক্ষুদ্র কাজের ব্যাপারে হীনমন্যতাকে পরিবর্তন করা দরকার। কোনো কাজকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। সবাই সবার পেশাকে সম্মান করা উচিত। মনে রাখতে হবে, কোনো কাজকে ছোট করে দেখা হলো অবনতি ও পশ্চাৎপদতার লক্ষণ।

লেখক : মুফতি, শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক লেখক।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত