সুন্দর কিন্তু ব্যথাতুর দীর্ঘ তিরস্কার

আপডেট : ১৩ জুন ২০১৯, ১১:৪৩ পিএম

“২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরের এক সকালে ঠিক যে মাসে পতন ঘটল বিশাল ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক লেহম্যান ব্রাদার্সের আর পুরো পৃথিবী যখন রুদ্ধশ্বাসে দেখছে ‘গ্লোবাল ফিনান্সিয়াল ক্রাইসিস’ নামের নাটকের আতঙ্ক-ছড়ানো শেষ অঙ্কÑ উদ্বিগ্ন চেহারা নিয়ে এক যুবক বিনা নোটিসে হাজির হলো লন্ডনে তার পুরনো বন্ধুর বাড়ির দরজায়।” বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক জিয়া হায়দার রহমানের প্রথম উপন্যাস ‘ইন দ্য লাইট অব হোয়াট উই নো’ উপন্যাসটি শুরুর লাইন।

আগন্তুককে চিনতে কিছুটা সময় লাগল বন্ধুর, কারণ এ লোক, বাংলাদেশি ব্রিটিশ, নাম জাফর, হঠাৎ উধাও হয়ে গিয়েছিল কয়েক বছর আগে।  জাফর তার আমেরিকায় জন্ম নেওয়া সম্ভ্রান্ত পাকিস্তানি বন্ধুকে নিজের উধাও-পর্বের, তার টালমাটাল পুরো জীবনের গল্প বলা শুরু করল। লন্ডনের সেই বাড়ির নির্জনতা ভেঙে দেওয়া এই বিস্ফোরক গল্প যতটা বন্ধুত্ব, প্রেম, লজ্জা, পাপবোধ, বিশ্বাসঘাতকতা ও স্নায়ুবিকারের, ততটাই তা এই পৃথিবীর মূল চেহারার, আমাদের এই শতাব্দীর অস্থিরমতিত্বের।

ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ান উপন্যাসটি সম্পর্কে লিখেছে ‘অস্বস্তিকর ও নিগূঢ় এ-বইয়ের গভীরতা প্রচণ্ড মন্ত্রমুগ্ধকর, এর কাহিনী মনে ছাপ ফেলার মতো বাস্তব, আবার বিভ্রমজাগানোৃতুমুল হৃদয়গ্রাহী’।  উপন্যাসটির কাহিনী হৃদয়গ্রাহী হলেও তা আপনাকে স্বস্তি দেবে না।  টুইন টাওয়ার হামলার পরপর বিশ্বব্যাপী যে সন্ত্রাস ও চ্যারিটির বিস্তার তা এই উপন্যাসের পটভূমিতে ফুটে থাকে। মজার ব্যাপার হচ্ছে ঢাউস সাইজের উপন্যাসটি পড়ে শেষ করার পর পুরো দৃশ্যপট মুহূর্তে আপনাকে এক অদ্ভুত পরিস্থিতিতে ফেলে দেবে। পৃথিবীর দীর্ঘ ভূগোলের চকিত রেশ আপনার মনে থেকে যাবে।

জিয়া হায়দার রহমানের জন্ম বাংলাদেশের সিলেটের এক প্রত্যন্ত গ্রামে। শিশু থাকতে তিনি পরিবারের সঙ্গে পাড়ি জমান ইংল্যান্ডে, বেড়ে ওঠেন হতদরিদ্র এক ভাঙা দালানে, পরে সরকারের দেওয়া কাউন্সিল এস্টেটের ছোট চার দেওয়ালের মাঝে তার বাস-কন্ডাক্টর বাবা ও সেলাইয়ের কাজ করা মায়ের সঙ্গে।  এরপর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যালিওল কলেজ থেকে ফার্স্ট ক্লাসসহ অনার্স ডিগ্রি নিয়ে তিনি উচ্চতর পড়াশোনা শেষ করেন কেমব্রিজ, মিউনিখ ও ইয়েলে।

উপন্যাসের প্রধান চরিত্র জাফরের মধ্য দিয়ে লেখক নিজেই বা তার জীবনের ছায়া হাজির হয়।  জাফরের বলা তার জীবনের ঘটনাপ্রবাহ পাকিস্তানি-মার্কিন অনামি বন্ধুর বয়ানে বিস্তারিত হতে থাকে। এই বর্ণনায় গণিত ও বিজ্ঞান শিল্প হিসেবে বারবার ফিরে আসে। অনেক সময় মনে হয় জাফরের রাগ ও ইমোশন আড়াল করতে ঔপন্যাসিক এখানে গণিত ও বিজ্ঞানের আশ্রয় নিয়েছেন। উপন্যাসে গণিতের ভূমিকা হচ্ছে কোনটা সত্য তা নির্ধারণে আমাদের অনিশ্চয়তাকে তুলে ধরা।

পুরো উপন্যাসটি যার বয়ানের মাধ্যমে এগিয়ে যায় কোথাও তার নাম না থাকায়, কাহিনীর ভেতর কেবল জাফরের গল্প খুঁজে পেতে তা হয়তো আমাদের সহায়তা করে। আর বাংলাদেশে বসে যখন আমরা উপন্যাসটি পড়ি তখন কিছু বিষয়Ñ  যা খুব সাদামাটাভাবে উঠে এলেও, এড়াতে পারি না। যেমন, কিশোর জাফর যখন একা দেশে আসে, দেশ বলতে সিলেটে আসেÑ তখন এক ট্রেন দুর্ঘটনা থেকে দৈবক্রমে বেঁচে যাওয়া। এ ছাড়া, তার জন্ম ও বেড়ে ওঠার তাৎপর্য ধরা পড়ে যখন জাফরকে যুদ্ধশিশু হিসেবে চিনতে পারি। পাশাপাশি, জাফরের পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত মার্কিন বন্ধু ও তার পরিবার এবং ১৯৭১ বাংলাদেশি পাঠকদের কাছে আলাদা তাৎপর্য তৈরি করতে পারে।

পরবর্তী সময়ে তার জার্নি, বেড়ে ওঠা, পড়ালেখা শেখার মধ্য দিয়ে সে বিশ্ব নাগরিক হয়ে উঠলেও সেই সোসাইটিতে বিলং করতে পারা না পারার টানাপড়েন এই চ্যারিটিমূলক বিশ্বব্যবস্থাকে অন্তঃসারশূন্য হিসেবে তুলে ধরে। 

নিউ ইয়র্ক বুক রিভিউয়ে জেমস উড উপন্যাসটি সম্পর্কে বলেছেন, ‘চোখ ধাঁধানো অবাক করা এক সৃষ্টি রহমান তার উপন্যাসকে ব্যবহার করেছেন কঠিন ও বিশদ এক চিন্তার কাজে, যার কেন্দ্রে রয়েছে শ্রেণিচেতনা, জ্ঞান এবং মানুষের ঠিকানা এই তিনের মধ্যে যোগাযোগের বিষয়টা প্রতিটা পৃষ্ঠায় ঠাসা ভাবনা ও উসকানিতে, তিনি গভীর ও তীক্ষধী এক গল্পকথক’।

উপন্যাসটি বুদ্ধিবৃত্তিক আলাপ-আলোচনায় ঠাসা। এখানে চিন্তার সৌকর্য লাইনে লাইনে ফুটে উঠতে দেখা যায়।  এই বৈশিষ্ট্য উপন্যাসটিকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ধারালো ও স্মার্ট করে তুলেছে। পাশাপশি নিউ ইয়র্ক রিভিউ অব বুকসে জয়েস ক্যারল ওটস্ যেভাবে বলেছেন ‘কথাসাহিত্যের এক অনন্য কার্যবলীর অযোগ্য এমন অনেক কিছুর সাক্ষ্য দিচ্ছে এ-গ্রন্থ’। অথবা  দ্য ইকোনমিস্ট যেমন বলেছে  ‘(লেখকের) এক বিস্ময়কর প্রথম-আত্মপ্রকাশবুদ্ধিবৃত্তির এক মহাভোজ’। কিংবা অবজারভারের ভাষ্যে উপন্যাসটি ‘বিস্তার ও গভীরতার দিক থেকে এটা বিশ্বকোষসুলভ, পাণ্ডিত্যের বিচারে হতবিহবলকর’।

জাফর ও এমিলির সম্পর্ক আপনাকে নারী-পুরুষের সম্পর্কের এক জটিল পরিস্থিতির অভিজ্ঞতার পাশাপাশি পুরুষতান্ত্রিক বিশ্ব ব্যবস্থার তীক্ষè কিছু সূত্র ফাঁস করে দেবে। সেই সঙ্গে সভ্য মানুষের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সভ্যতার চাপ যেই ‘আরামহীন’ পরিস্থিতির সম্মুখীন করে, হামেশা তার দেখা পাওয়া যাবে।  যেমনÑ ট্যাক্সিতে যেতে যেতে এমিলিকে যখন জাফর জিজ্ঞেস করে যে, তার বন্ধুর সঙ্গে এমিলির দেখা হয়েছিল কি না, তখন এমিলি কোনো কথা না বলে বা উত্তর না দিয়ে হাতব্যাগের মধ্যে কসমেটিকস বা যে কোনো কিছু খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে যায়। এইভাবে এড়িয়ে যাওয়ার চাপ জাফরকে এই বিশাল মানবসমাজের কথিত যূথবদ্ধতা থেকে আরও দূরে ঠেলে দেয় হয়তো।

আবার মানুষ যত চড়াই-উৎরাই পার হোক না কেন, তথাকথিত সব সাফল্য অর্জন করলেও মানুষ তার শৈশব ও বেড়ে ওঠার সাবলীল বা জটিল পরিস্থিতির আলোকেই জীবনকে ধারণ করে যায়, বা ছুড়ে ফেলে দিয়ে চ্যালেঞ্জ জানায় এ রকমও মনে হতে পারে। যখন আমরা জানি, উপন্যাসটির লেখকের মতোই এর প্রধান চরিত্র জাফর বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে পরিবারের সঙ্গে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমিয়ে হতদরিদ্রভাবে বেড়ে ওঠেন ভাঙা দালান আর সরকারের দেওয়া ছোট চার দেয়ালের ঘরে; এবং পরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যালিওল কলেজ থেকে ফার্স্ট ক্লাসসহ অনার্স ডিগ্রি নিয়ে কেমব্রিজ-মিউনিখ-ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর পড়াশোনা শেষ করে ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার, করপোরেট আইনজীবী ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকারকর্মীর যে পেশাগত কমিউনিটিতে তিনি অবস্থান করেন তার সঙ্গে কোন সম্পর্কচ্যুত এক মন নিয়ে বিশ্বকে দেখছেন জাফর।  

টাইমস্ লিটারারি সাপ্লিমেন্ট যেমন বলেছে ‘[এটা পড়া] এক সুখানুভূতি মানুষের সংকীর্ণতা ও আত্মপ্রসাদের বিরুদ্ধে এ লেখা এক সুন্দর কিন্তু ব্যথাতুর দীর্ঘ তিরস্কার’।

২০১৪ সালে প্রকাশিত ‘ইন দ্য লাইট অব হোয়াট উই নো’ জিয়া হায়দার রহমানের প্রথম উপন্যাস, যা তাকে সরাসরি জায়গা করে দেয় বিশ্বসাহিত্যের মূল মঞ্চে। ২০১৫-এর আগস্টে উপন্যাসটি ব্রিটেনের প্রাচীনতম সাহিত্য পুরস্কার ‘জেমস টেইট ব্ল্যাক মেমোরিয়াল প্রাইজ ২০১৪’ লাভ করে। এছাড়া এটি মনোনয়ন পায় গোল্ডস্মিথ প্রাইজ, স্পেকসেভারস্ ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ডস এবং দ্য গার্ডিয়ান ফার্স্ট বুক অ্যাওয়ার্ডের জন্যও। আবার ২০১৬-তে এসে এ-উপন্যাসের ব্যতিক্রমী শক্তির জন্য রহমান লাভ করেন প্রথম ‘ইন্টারন্যাশনাল রানাল্ড ম্যাকডোনাল্ড’ পুরস্কার।  তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাডক্লিফ ফেলো এবং বিবিসি রেডিও ফোর-এর ‘এ পয়েন্ট অব ভিউ’ অনুষ্ঠানের নিয়মিত কণ্ঠ।  হার্ভার্ডের র‌্যাডক্লিফ ইনস্টিটিউটের ওয়েবসাইট মতে রহমান এখন ব্যস্ত তার দ্বিতীয় উপন্যাসের কাজ নিয়ে, যার প্রাথমিক নাম ‘ক্রিয়েশন’।

উপন্যাসটির বাংলা অনুবাদ করেছেন শিবব্রত বর্মন, প্রকাশ করেছে পাঠক সমাবেশ।

লেখক কবি ও সাংবাদিক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত