হায় আম্পায়ারিং!

আপডেট : ১৭ জুন ২০১৯, ০১:৩৬ এএম

ইয়ান চ্যাপেলের অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট মাঠে বিন্দুমাত্র জায়গা দিতে রাজি ছিল না বিপক্ষের ক্রিকেটারদের, সঙ্গে আম্পায়ারদেরও। পরিষ্কার নির্দেশ ছিল ক্রিকেটারদের প্রতি, ক্রিজ ছাড়বে না। আম্পায়ারের কাজটা করতে দাও আম্পায়ারকেই। তুমি আউট কি না বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত জানাবেন আম্পায়ার, তার কাজটা সহজ করে দেওয়া তোমার কাজ নয়!

বিরাট কোহলির নামের মাঝে, ক্রিকেটবিশ্ব বলত, আছে ‘আগ্রাসন’। এই বিশ্বকাপে সেই বিশেষণ কি ছেঁটে ফেলতে আগ্রহী ভারতের অধিনায়ক?

টেলিভিশন রিপ্লে দেখাল, মাথার ওপরের বল কোহলির ব্যাটের ধারেকাছে যায়নি। কিন্তু মোহাম্মদ আমিরের বল তার ব্যাটে

 

 লেগেই উইকেটকিপারের হাতে গিয়েছে ভেবে, কোহলি নিজেকে আউট ঘোষণা করে ফেললেন নিজেই, হাঁটতে শুরু করলেন প্যাভিলিয়নের দিকে। আম্পায়ারের কিছু করার ছিল না। ব্যাটসম্যান যদি নিজেই ভেবে নেয় আউট, তিনি কী-ই বা করতে পারেন!

শুধু ওই একবারই নয়, বোলার ওয়াহাব রিয়াজ নন-স্ট্রাইক প্রান্তে বসে পড়েছিলেন। সিঙ্গলটা নিয়ে সেই প্রান্তে পৌঁছানোর সময় কোহলির হাত ছুঁয়ে গেল ওয়াহাবের মাথা। পরে, পাকিস্তানের বোলার যখন উঠে দাঁড়ালেন, সৌহার্দ্য বিনিময়ও হলো। খেলা চলাকালেই।

কিংবা, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে যে কারণে কোহলি উঠে এসেছিলেন সংবাদমাধ্যমে আলোচনায় এবং সমাজমাধ্যমের প্রশংসায় শীর্ষে, স্টিভ স্মিথকে বিদ্রƒপ করতে ভারতীয় দর্শকদের বারণ করার কারণে। মনে রাখতে হবে, স্টিভ স্মিথের ‘অপরাধ’-এর তালিকা কম নয়। বল বিকৃতি বিতর্কে তো তার নিজের দেশই তাকে নির্বাসিত করেছিল। ভারতের বিপক্ষে খেলায় আবার ‘ব্রেনফেড’! এবং, টেলিভিশনে রিপ্লে দেখে সাজঘর কী বলতে চাইছে তা বুঝে নিয়ে নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এই যে প্রতারণার চেষ্টা, সেটাও কিন্তু ধরেছিলেন কোহলিই। পরে যে কারণে স্মিথকে বলতে হয়েছিল, ‘মগজ কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল সেই সময়।’ অনেকটা সেই ডিয়েগো ম্যারাডোনার হাত দিয়ে গোল করার পর ‘ঈশ্বরের হাত’-এর প্রসঙ্গ টানার মতোই অন্যায়কে চাপা দেওয়ার প্রচেষ্টা ছিল তৎকালীন অস্ট্রেলীয় অধিনায়কের।

সেই স্মিথকে যখন বিদ্রƒপে ভরিয়ে দিচ্ছিলেন ভারতীয় সমর্থকরা, ব্যাট করছিলেন কোহলি। ব্যাট করা থামিয়ে দর্শকদের কাছে আবেদন সরাসরি, স্মিথকে যেন বিদ্রƒপ না করা হয়। স্মিথ পর্যন্ত হতবাক হয়ে হাত মিলিয়ে গিয়েছিলেন। পরে সংবাদ সম্মেলনে কোহলি সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, অপরাধ করে তার সাজা হিসাবে নির্বাসন কাটিয়ে ফিরে এসেছেন যখন, স্মিথকে এভাবে অপদস্থ করা উচিত নয়।

অস্ট্রেলিয়া কীভাবে বারবার ভারত এবং ভারতীয় ক্রিকেটারদের বিরুদ্ধে আচরণ করেছে, সেই ডেনিস লিলি-সুনীল গাভাস্কার বিতর্ক থেকে শুরু করে গ্লেন ম্যাকগ্রার বলে শচীন টেন্ডুলকারকে আমরা যেমন বলেছিলাম ‘ব্যাক বি ডব্লিউ’ দেওয়া, পরে মাটিতে পড়ে যাওয়ার পর বল ধরে মাইকেল ক্লার্কের ‘জেনুইন’ ক্যাচের আবেদন, যাতে সমর্থন ছিল অধিনায়ক রিকি পন্টিংয়েরÑ কোহলি সেই মুহূর্তে সব ভুলে গিয়েছিলেন। এগিয়ে গিয়েছিলেন একজন সমকালীন ক্রিকেটারের সাহায্যে। হয়ে উঠেছিলেন সত্যিই ‘বিরাট’।

কিন্তু, এই সবই ছাপিয়ে গেল, আউট না হয়েই নিজেকে আউট ঘোষণা! তাও আবার চিরশত্রু পাকিস্তানের বিপক্ষে। দেখা গেল, সাজঘরে নিজের ব্যাটটা ধরে নানা জায়গায় মেরে-মেরে বোঝার চেষ্টা করছেন, ভুলটা কোথায় করলেন। আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত বিপক্ষে গেলে তবুও রিভিউ নেওয়ার সুযোগ আছে। নিজেই নিজেকে আউট ঘোষণা করে ফেললে তো আর সে সুযোগও যে থাকছে না! ৬৫ বলে ৭৭ রানের দুর্দান্ত ইনিংস ৪৭.৪ ওভারে শেষ করে নিজেকেও যেমন বঞ্চিত করলেন শেষ ১৪ বল খেলার সুযোগ থেকে, তিনি মাঠে থাকলে ভারত ৩৩৬-এর থেকে আরও বেশি রান করতে পারত, উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না সেই সম্ভাবনাও।

অন্যদিকে কুমার সাঙ্গাকারার রেকর্ডের পেছনে ছুটছেন রোহিত শর্মা। একটি বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ চার-চারটি শতরানের রেকর্ড আছে সাঙ্গাকারার। মার্ক ওয়াহ, ম্যাথু হেডেন এবং সৌরভ গাঙ্গুলির আছে একটি বিশ্বকাপে তিনটি করে সেঞ্চুরি। শচীন টেন্ডুলকার বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ছয় শতরানের মালিক। কিন্তু ছটি বিশ্বকাপে। আর এক মুম্বাইকার কিন্তু এগিয়ে চলেছেন, বা বলা ভালো, চলতে চাইছেন, রেকর্ড বুকে সাঙ্গাকারাকে অন্তত ছুঁয়ে ফেলার দিকে!

তিনটি ম্যাচ খেলল ভারত। দুটি শতরান, একটি পঞ্চাশ এখনই রোহিতের নামে। দুটি শতরান দক্ষিণ আফ্রিকা এবং পাকিস্তানের বিপক্ষে, অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে পঞ্চাশ। ২০১৫ সালে বাংলাদেশের বিপক্ষে পেয়েছিলেন বিশ্বকাপে প্রথম শতরান। তাই বিশ্বকাপে এখন তার শতরান সংখ্যা তিন। সঙ্গে তিন ম্যাচে ৩১৯ রান নিয়ে তাড়া করছেন এই বিশ্বকাপে আপাতত সর্বোচ্চ অ্যারন ফিঞ্চের পাঁচ ম্যাচে ৩৪৩ রানের রেকর্ডও। আউট অবশ্য হয়েছিলেন ডানহাতি দৃষ্টিনন্দন ব্যাটসম্যান, নিজের দোষেই। ওয়াহাবকে তুলে এনেছিলেন সরফরাজ, বেষ্টনীর ভেতর। দেখেও, তার মাথার ওপর দিয়ে তুলতে গিয়ে ১৪০ রানে আউট।

ভারতের সেরা দুই ব্যাটসম্যানই নিজেরা আউট, পাকিস্তানের বোলারদের কৃতিত্ব কম। রোহিতকে তবুও ক্লান্তির কারণে যদি বাদও দেওয়া যায়, কোহলির ক্ষেত্রে কী যে বলতেন সাজঘরে ক্যাপ্টেনের নাম যদি হতো ইয়ান চ্যাপেল!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত