স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে দুর্নীতির অভিযোগে কুখ্যাতি লাভ করা মেডিকেল এডুকেশন শাখার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আবজাল হোসেন ও তার স্ত্রী রুবিনা খানমের বিরুদ্ধে শিগগিরই মামলা করবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে মামলাটি করা হবে। এরই মধ্যে অভিযোগের অনুসন্ধান কর্মকর্তা তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি সংশ্লিষ্টরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রতিবেদন জমা হয়েছে। সেটা যাচাই-বাছাই চলছে। আশা করছি, সপ্তাহখানেকের মধ্যে তাদের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশসহ কমিশনে প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হবে। কমিশনের অনুমোদনের পর মামলা করা হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অনুসন্ধান তদারকি কর্মকর্তা ও দুদকের বিশেষ তদন্ত-১ অনুবিভাগের পরিচালক কাজী শফিকুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা তদন্ত কর্মকর্তার অনুসন্ধান প্রতিবেদন দেখছি। এখনো এ বিষয়ে ফাইনাল কিছু হয়নি।’ এ বিষয়ে জানতে কমিশনের জনসংযোগ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।
অনুসন্ধান প্রতিবেদন জমা ও আগামী সপ্তাহে আবজাল-রুবিনা দম্পতির বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে কি না জানতে চাইলে দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনুসন্ধান কর্মকর্তার প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই চলছে। মামলা হতে সময় লাগবে। এখনো ফাইনাল কিছু হয়নি।’
গত বছরের শেষ দিকে আবজাল-রুবিনা দম্পতিসহ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ পায় দুদক। এর পরিপ্রেক্ষিতে দুদক তিন সদস্যের অনুসন্ধান টিম গঠন করে। গত ৯ জানুয়ারি আবজালকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক। ওইদিন নিজের ও স্ত্রীর সম্পদের প্রাথমিক হিসাব দেন আবজাল। অনুসন্ধান দলের প্রধান ছিলেন দুদকের উপপরিচালক শামসুল আলম। পরে উপপরিচালক মো. তওফিকুল ইসলামকে অনুসন্ধান কর্মকর্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি মামলার সুপারিশসহ অনুসন্ধান প্রতিবেদন নিজ শাখায় দাখিল করেছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তৌফিকুল ইসলাম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এরই মধ্যে আবজালকে কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে কমিশন। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি নিজেই বিপুল পরিমাণ সম্পদ থাকার কথা স্বীকার করেন। কমিশনে হিসাব দাখিলের পর হঠাৎ সপরিবারে ‘লাপাত্তা’ হয়ে যান আবজাল। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে বেনাপোল স্থলবন্দর হয়ে ভারতে পাড়ি জমান আবজাল-রুবিনা দম্পতি। সেখান থেকে মালয়েশিয়া হয়ে পরে তারা অস্ট্রেলিয়া যান। বর্তমানে তারা সেখানেই অবস্থান করছেন। তবে দুদক কিংবা ইমিগ্রেশন কর্র্তৃপক্ষ বিষয়টি স্বীকার করেনি। সম্প্রতি এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের পরিচালক কাজী শফিকুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আবজাল হোসেনের তিনটি পাসপোর্ট ও তার স্ত্রীর পাসপোর্টের তথ্য দিয়ে দুদকের পক্ষ থেকে ৬ জানুয়ারি ইমিগ্রেশন কর্র্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে তাদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার কথা জানানো হয়েছে। এর পর থেকে পাসপোর্ট ব্লক থাকায় তার বিদেশ যাওয়ার সুযোগ নেই। এরপরও আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে তার বিদেশে আত্মগোপনের তথ্য পেয়েছি। অনুসন্ধান কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে খোঁজখবর নিতে বলা হয়েছে। সর্বশেষ গত ১৩ মার্চ তিনি বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন কর্র্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছেন।’
দুদকের চিঠি প্রসঙ্গে বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন শাখার দায়িত্বশীল এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের কাছে যেসব পাসপোর্টের তথ্য দেওয়া হয়েছে সেগুলোর বিবরণ অনুযায়ী আবজাল দম্পতি দেশেই আছেন। আমরা দুদকের চিঠির জবাবে সেটাই জানিয়েছি।’
দুদকের অনুসন্ধান শুরুর পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মেডিকেল এডুকেশন শাখার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার পদ থেকে গত ১৪ জানুয়ারি সাময়িক বরখাস্ত করা হয় আবজালকে। তার স্ত্রী রুবিনা খানম ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জনশক্তি উন্নয়ন শাখার স্টেনোগ্রাফার। ২০০০ সালে স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে রহমান ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি প্রতিষ্ঠান খুলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে ব্যবসা শুরু করেন তিনি। দুদকের তথ্যানুযায়ী, আবজাল বেতন-ভাতা পেতেন সব মিলিয়ে ৩০ হাজার টাকা। অথচ তাদের প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার সম্পদ আছে। ঢাকার উত্তরায় এই দম্পতির পাঁচটি বাড়ি, অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে একটি বাড়ি, দেশের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ২৪টি প্লট ও ফ্ল্যাট থাকার প্রমাণ পেয়েছে দুদক। এর বাইরে দেশে-বিদেশে আছে বাড়ি-মার্কেটসহ অনেক সম্পদ।
গত ২২ জানুয়ারি দুদকের আবেদনে আবজাল-রুবিনার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক অর্থাৎ হস্তান্তর বা লেনদেন বন্ধ এবং ব্যাংক হিসাবগুলোর লেনদেন অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করার আদেশ দেয় আদালত। আদালতের আদেশের পর তা গেজেট আকারে প্রকাশ হয়। কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে ওই তথ্য প্রকাশিত হয়। তবে গত ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রুবিনা খানমের মালিকানাধীন রহমান ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল সচল ছিল। দুই সপ্তাহে ওই প্রতিষ্ঠানটিসহ ওই দম্পতির বিভিন্ন হিসাবে ৪৫ কোটি টাকা লেনদেন হয়। ওই টাকার পুরোটাই মানিলন্ডারিং হয়েছে বলে নিশ্চিত হয়েছে দুদক।
গত ১৮ মার্চ আবজালের একটি বাড়ির মূল ফটকের পাশে একটি সাইনবোর্ড লাগানো হয়। এতে সম্পত্তির বিবরণ উল্লেখ করে বলা হয়, ‘ক্রোকাবদ্ধ উক্ত সম্পত্তি কোনোভাবে বা কোনো প্রকারে অন্যত্র হস্তান্তর, উক্ত সম্পত্তি সংক্রান্ত কোনো প্রকার লেনদেন বা উক্ত সম্পত্তিকে কোনোভাবে দায়মুক্ত করা আইনত নিষিদ্ধ।’ তবে জানা গেছে, আবজালের বাড়িগুলোর ভাড়া এখনো আবজালের লোকজনই আদায় করছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট শাখার একজন কর্মকর্তা বলেন, ভাড়া আদায়সহ তদারকির বিষয়ে এখনো আদালতের নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে গত ২৬ এপ্রিল কক্সবাজার মেডিকেল কলেজে যন্ত্রপাতি কেনার নামে অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ১০ জনের বিরুদ্ধে কক্সবাজার সদর থানায় মামলা করেছেন দুদকের উপসহকারী পরিচালক সহিদুর রহমান। আবজাল-রুবিনা ছাড়াও এতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জনশক্তি উন্নয়ন বিভাগের সাবেক পরিচালক ও লাইন ডিরেক্টর আবদুর রশীদ, কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ সুবাস চন্দ্র সাহা, সাবেক অধ্যক্ষ মোহাম্মদ রেজাউল করিম, কলেজের হিসাবরক্ষক হুররমা আক্তার খুকী, জেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সুকোমল বড়–য়া ও একই দপ্তরের সাবেক এসএএস সুপার সুরজিত রায় দাশ, পংকজ কুমার বৈদ্য এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক উচ্চমান সহকারী খায়রুল আলমকে আসামি করা হয়েছে। ওই মামলার পরও এখনো অধ্যক্ষ সুভাষ চন্দ্র সাহাসহ সবাই স্বপদে বহাল আছেন।
