লন্ডন টাইমস লিখেছে ‘ম্যাজেস্টিক সাকিব’। ‘অলরাউন্ডার’ সাকিবের প্রশংসা টেলিগ্রাফে। ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ান আরও সরাসরি। ‘সাকিব ডুবিয়ে দিলেন আফগান জাহাজ’! ম্যাচের আগের দিন
আফগানিস্তানের অধিনায়ক দাবি করেছিলেন, ‘আমরা তো ডুবেই গিয়েছি, বাংলাদেশকে নিয়েই ডুবব।’ ম্যাচে দেখা গেল, সাকিব আল হাসান একাই যথেষ্ট, আফগানদের পুরোপুরি ডুবিয়ে দিতে। টেনে তুলেছেন বাংলাদেশকে, সেমিফাইনালের দ্বারপ্রান্তে। ভবিষ্যৎ যা-ই হোক না কেন, বিলেতে পঞ্চম বিশ্বকাপে সাকিব আল হাসান সেরা ক্রিকেটারের পুরস্কার না পেলে, দুর্ভাগ্য।
সাকিবের ব্যাটে যদি শেষ না হয় বিপক্ষ, অপেক্ষা করো, বল হাতে আসতে দাও সাকিবকে। কেন তিনিই বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার এখন, প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছে পারফরম্যান্স।
৪৭৬ রান, ১০টি উইকেট। তার মধ্যে আবার আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৫ উইকেট একারই। ম্যাচে আবার একটি রান আউটেও তার অবদান। একজন ক্রিকেটার ক্রিকেট মাঠে আর কী কী করতে পারেন?
সাকিবের ভবি অবশ্য এসবে ভোলার নয়। বরাবরই তিনি কম-কথার মানুষ। আইপিএলে দীর্ঘদিন খেলেছেন কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে। তখনো কথায় আক্রমণাত্মক কখনো মনে হয়নি। বিশ্বকাপের সময় ততটা নিয়মানুগ নন, অন্য সময় ইমেল করলে উত্তর দেন চটপট। কথা বলেন ধীরে। ভেবেচিন্তে। ক্রিকেটজীবন শুরুর দিকে কিছু বিতর্ক হয়েছিল, এখন একেবারেই মাপা উত্তর আসে। বুঝে নিয়েছেন সারসত্য। কথায় নয়, ব্যাটে-বল বড় হতে হবে। আদায় করে নিতে হবে ক্রিকেটবিশ্বের সমীহ। আর সেটা করতে হলে ব্যাটে চাই বাঘের গর্জন, বলে সাপের ছোবল। সাকিব মন দিয়েছেন। উপকৃত হচ্ছে বাংলাদেশ।
বিশ^কাপের আসরে অলরাউন্ডাররা অনেকবারই নিজেদের কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। যুবরাজ সিং যেমন। ২০১১ বিশ্বকাপে ভারতের জয়ের অন্যতম স্থপতি। ল্যান্স ক্লুজনার হতেই পারতেন বিশ্বসেরা দলের সদস্য। কিন্তু ১৯৯৯ সালে এই ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপেই তার দল পাশে দাঁড়ায়নি। অ্যালান ডোনাল্ডের সঙ্গে মাঝপিচে ক্লুজনার, রান আউট, অদ্ভুত বৈপরীত্য ক্লুজনারের পারফরম্যান্সের সঙ্গে। সনাথ জয়াসুরিয়ার ব্যাট যতটা কথা বলেছিল ১৯৯৬ বিশ্বকাপে, বল ততটা একেবারেই নয়। ওয়াসিম আকরাম ১৯৯২ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্বপ্নের দুটি ডেলিভারিতে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন বিপজ্জনক হয়ে-উঠতে চাওয়া ইংরেজ অ্যালান ল্যাম্ব ও পরের বলেই ক্রিস লুইসকে। বিশ্বজয়ের ইংরেজ স্বপ্ন গড়াগড়ি খেয়েছিল মেলবোর্নের মাটিতে। কিন্তু, আকরামের ব্যাটেই বা তেমন মনে রাখার মতো পারফরম্যান্স কোথায়? একই কথা প্রযোজ্য ইয়ান বোথাম সম্পর্কেও। এমনকি, তিরাশি বিশ্বকাপে ভারতের জয়ের পেছনে কপিল দেবের সেরা দুটি অবদানের একটি ব্যাট হাতে, অন্যটি ভিভিয়ান রিচার্ডসের ক্যাচ, ৩৬ বছর আগের এই ২৫ জুন লর্ডসে। বল হাতে কপিল ততটা বিধ্বংসী ছিলেন না, রজার বিনি বা মদনলালের মতো নিয়মিত উইকেট আসেনি ভারতের সর্বকালের সেরা ক্রিকেটারের বলে।
এই গ্রেটদের পাশে নিজের জায়গা সানন্দে করে নিলেও, ক্রিকেট মাঠে সাকিব বেশ সাদামাঠা। বিরাট অঙ্গভঙ্গি নেই, জিতলে অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস দেখান না, হারেও অবিচলিত। স্থিতপ্রজ্ঞ যেন। বাড়তি সবকিছুই তার না-পসন্দ। তাকে অধিনায়ক যা করতে বলবেন, দল যা চাইবে তার কাছে, করে আসবেন। কার্যকারিতায় বরাবরের এক নম্বর, এবার নিজেকে এমন উচ্চতায় তুলে নিয়ে যাচ্ছেন, অভাবনীয় বললেও কম। হাজারের বেশি রান (১০১৬) করে ফেলেছেন বিশ্বকাপে, ৩৩ উইকেটÑ দুটি একসঙ্গে যে আর কারও নেই! একমেবদ্বিতীয়ম কেন বলা যাবে না সাকিবকে? একশো নন, তিনি যে একাই হাজার!
ম্যাচ বাকি দুই। ২ জুলাই ভারতের পর ৫ জুলাই পাকিস্তান। দুটি দলের বিপক্ষেই বহু ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। অন্তত একটি ম্যাচ জিতলে সেমিফাইনালের দরজাটা খুলে যেতে পারে, দুটি ম্যাচ জিতলে খুলবেই, আশা করতে দোষ নেই। বিশ্বকাপে পাঁচশো আর মাত্র কয়েকটা রান দূরেই, যা না হওয়ার কোনো কারণ থাকতেই পারে না, যতই গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা হোক না কেন ক্রিকেট।
হ্যাঁ, বিশ্বকাপের সেরা ক্রিকেটার সেমিফাইনালে খেলবে না, শুনতে কেমন যেন লাগে। শচীন টেন্ডুলকার বিশ্বকাপ না জিতেও সেরা ক্রিকেটার হয়েছিলেন ২০০৩ সালে, ভারত সেবার ফাইনালে খেলেছিল, সর্বোচ্চ রানও করেছিলেন শচীন। সাকিবকে এই পুরস্কারের দাবিদার হতে হলে চাই অন্তত প্রথম চারে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি। না হলে, ফাইনালে জয়ী বা বিজিত দলের কেউ নিয়ে যেতেই পারেন পুরস্কারটা।
সাকিবের তাতে কিছু যায় আসে না। বাংলাদেশের পরবর্তী প্রজন্ম এখন সবুজ জার্সির সাকিবের দিতে তাকাচ্ছে ভবিষ্যতের অনুপ্রেরণা হিসেবে। তাকে এভাবে খেলতে দেখেই তো বাংলাদেশের কোনো প্রান্তে কোনো কিশোর নতুন করে হাতে তুলে নিচ্ছে ব্যাট এবং বল। প্রজন্মান্তরে নিজেকে এভাবে প্রাসঙ্গিক করে তোলার চেয়ে বড় পুরস্কারই বা আর কী!
×
