ভোক্তাপর্যায়ে গ্যাসের দাম প্রায় ৩৩ শতাংশ বাড়ানোয় মাথাপিছু মাসিক খরচ ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা বাড়তে পারে। কোনো ক্ষেত্রে আরও বেশি বাড়তে পারে। বাড়িভাড়া, রেস্টুরেন্টে খাওয়া, পরিবহন ও নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে অতিরিক্ত খরচ যোগ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, গ্যাসের এই মূল্য বৃদ্ধিতে স্বল্প আয়ের মানুষ থেকে নিম্নবিত্তরা বেশি চাপে পড়বে। সব দিক বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
গত রবিবার বিকেলে ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ গ্যাসের দাম বাড়ানোর আদেশ জারি করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। গতকাল সোমবার থেকে তা কার্যকর হয়।
দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান মনোয়ার ইসলাম জানান, দাম বাড়িয়ে গৃহস্থালির ক্ষেত্রে মিটারভিত্তিক গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটারে ১২ টাকা ৬০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এক চুলায় প্রতি মাসে গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৯২৫ টাকা এবং দুই চুলায় ৯৭৫ টাকা। সিএনজির ক্ষেত্রে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৩ টাকা এবং হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের ক্ষেত্রে ২৩ টাকা। বিদ্যুতের ক্ষেত্রে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ টাকা ৪৫ পয়সা, ক্যাপটিভ পাওয়ারে ১৩ টাকা ৮৫ পয়সা, সারে ৪ টাকা ৪৫ পয়সা, শিল্পে ১০ টাকা ৭০ পয়সা, চা-বাগানে ১০ টাকা ৭০ পয়সা। এর মধ্যে শুধু ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়নি। এর আগের দাম প্রতি ঘনমিটার ১৭ টাকাই রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া গতকাল সোমবার থেকে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির সরকারি সিদ্ধান্তের পর রাজধানীর বিভিন্ন শ্রেণির নাগরিকদের মতামতে উদ্বেগের তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
গতকাল বেলা ১১টায় মালিবাগ বাজারে আসা গৃহিণী হুসনে আরা বলেন, সকাল ৭টায় তিনি বাচ্চাকে নিয়ে পল্টন যাওয়ার সময় সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া করতেই ড্রাইভার গ্যাসের দামের দোহাই দিয়ে ২০ টাকা বেশি চাইলেন। তিনি মনে করেন, সব পাবলিক পরিবহনে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়বে। আর তাতে তিনি এবং তার মতো সাধারণ পরিবারের প্রতিদিন এক থেকে দেড় শ টাকা বেশি খরচ হবে।
পোশাকশ্রমিক ফাতেমা বলেন, তারা ১০ জন মীরবাগে একটি টিনশেডের বাসায় ভাড়া থাকেন। সকালেই বাড়িওয়ালা এসে বলে গেছেন গ্যাসের দাম বাড়ছে। এ মাস থেকে তাদের ১০০ টাকা করে বেশি দিতে হবে। ফাতেমা চুলার হিসাব ধরে প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলে বাড়িওয়ালা বলেন, যাদের পোষাবে না তারা ছেড়ে দেবেন। বাংলামোটরের একটি রেস্টুরেন্টের মালিক এই প্রতিবেদককে বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ালে তো খাবারের দাম বাড়বেই। তবে খুব বেশি হয়তো বাড়বে না। তিনি বলেন, এই যেমন ধরেন, সিঙাড়ার দাম ৪ টাকা থেকে ৫ টাকা হবে। এভাবে ১-২ টাকা করে দাম বাড়বে। আমাদের তো খরচ বেশি।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই দাম বৃদ্ধি অন্যায্য। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে নিম্ন আয়ের মানুষ। কারণ বাড়িভাড়া, গ্যাসের চুলা ভাগাভাগি, প্রতিনিয়ত যারা পাবলিক বাসে চলাচল করে তাদের প্রতিটি ক্ষেত্রেই গ্যাসের দাম বাড়ানোর কারণে প্রতিদিন বাড়তি ১০ শতাংশ বেশি গুনতে হবে। আর সব শ্রেণির নাগরিককেই অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জের কবলে পড়তে হবে। ফলে আমরা বলতে পারি, নিম্ন আয়ের মানুষ গ্যাসের এই মূল্যবৃদ্ধিতে বেশি চাপে পড়বে। কারণ তাদের আয় থেকে ২-৫ হাজার টাকা বেশি খরচ হওয়া মানেই জীবনের ওপর নাভিশ^াস তৈরি হওয়া।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী এর প্রভাব সম্পর্কে বলেন, ‘সাধারণভাবে হিসাব করলেও গ্যাসের এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে প্রত্যেক নাগরিকের মাথাপিছু খরচ ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা বেড়ে যাবে। কারণ এতে নিত্যপণ্য, যাতায়াত, বাড়িভাড়া থেকে শুরু করে সবকিছুর খরচ বাড়বে। তাই গ্যাসের এই মূল্যবৃদ্ধি পুরোপুরি প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি।’
রাজধানীর মহানগর আবাসিক এলাকার বাসিন্দা স্কুল শিক্ষিকা তাহরিমা আক্তার বলেন, চুলার হিসাবে টাকার পরিমাণ ১৭৫ টাকা মনে হচ্ছে। বাসাভাড়া থেকে শুরু করে কাঁচা মরিচ কেনা পর্যন্ত এই দামের হিসাব গুনতে হবে। নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্তসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের আর্থিক সংগতির কথা বিবেচনা করে সরকার গ্যাসের দাম পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি।
কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেন, গ্যাসের এ বর্ধিত মূল্য জনজীবনে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, হত্যা, খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ, যানজট ও দুর্নীতির মতো নানামুখী সংকটে থাকা দেশ এবং জনগণকে এটি আরও গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দেবে।
