বরগুনায় রিফাত হত্যা

অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে খুনিদের আড়াল করার অভিযোগ

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০১৯, ০১:৪৬ এএম

বরগুনা সরকারি কলেজের ভেতর থেকে ধরে এনে কলেজের সামনের রাস্তায় গত ২৬ জুন বহু পথচারীর উপস্থিতিতে রামদা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় রিফাত শরীফকে। ঘটনার সময় কলেজের ভেতরে বেশ কিছু সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলেও দেশজুড়ে আলোচিত ওই হত্যাকাণ্ডের পর তার কোনো ফুটেজ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অধ্যক্ষের দাবি রিফাত হত্যাকাণ্ডের আগেই বজ্রপাতের কারণে তাদের সিসিটিভি ক্যামেরা সেটআপটির মনিটর নষ্ট হয়ে যায় এবং এ কারণে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ ধারণ বন্ধ রাখা হয়।

তবে কলেজের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী ও অভিভাবক বলছেন, রিফাত হত্যায় জড়িতদের আড়াল করতেই ওইদিনের ফুটেজ গায়েব করে দেওয়া হয়েছে। আর এজন্য তারা দুষছেন কলেজটির অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদকে। এদিকে রিফাত হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি টিকটক হৃদয় এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার করা রাফিউল ইসলাম রাব্বিকে গতকাল শনিবার ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, রিফাতকে হত্যার ঘটনায় ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দুই যুবককে রিফাতকে কোপাতে দেখা যায়। কিন্তু এর বাইরেও নয়ন বন্ড বাহিনীর একটি দল কাজ করেছে কলেজের ভেতরে। হত্যাকাণ্ডের দিন রিফাত শরীফ তার স্ত্রীকে নিতে বরগুনা সরকারি কলেজের ভেতরে এলে নোটিস বোর্ডের সামনে তাকে প্রথম আক্রমণ করে নয়ন বন্ডের বাহিনী ‘০০৭’ গ্রুপের সদস্যরা। এরপর সেখান থেকে মারধর করতে করতে রিফাতকে নিয়ে যাওয়া হয় কলেজের বাইরে। আর পরে সেখানে নয়ন, রিফাত ফরাজী ও রিশান ফরাজী রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যা করে। রিফাতকে কোপানোর আগে কলেজের ভেতরে মারধরের দৃশ্য সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ হওয়ার কথা থাকলেও এর কোনো ফুটেজই পাওয়া যায়নি কলেজ কর্র্তৃপক্ষের কাছে। 

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, কলেজের প্রধান ফটক থেকে ভেতরে ঢোকার মুখেই কলেজ কর্র্তৃপক্ষ এবং পুলিশ প্রশাসনের বসানো দুটি সিসি ক্যামেরা রয়েছে। এ ছাড়াও ভেতরে রিফাতকে যেখানে প্রথম মারধর করা শুরু হয় সেখানেও রয়েছে একটি সিসি ক্যামেরা। এর বাইরে কলেজের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে আরও ১০ থেকে ১৫টি সিসি ক্যামেরা। যেগুলো অধ্যক্ষের কক্ষ থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। অধ্যক্ষের কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, যে মনিটর থেকে এসব সিসি ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণ করা হয় সেটি একটি কাপড় দিয়ে ঢাকা।

রিফাতকে মারধরের ভিডিও ফুটেজ না পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বরগুনা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের কলেজের সব ক্যামেরাই ভালো ছিল। কিন্তু ২৪ জুন বজ্রপাত হওয়ার কারণে মনিটরটি নষ্ট হয়ে যায়। যার কারণে কোনো ফুটেজই ধারণ করা সম্ভব হয়নি।’

রিফাত ফরাজী বিভিন্ন সময় কলেজ ক্যাম্পাসে ঢুকে সাধারণ ছাত্রদের মারধর এবং টাকাপয়সা কেড়ে নিলেও কেন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি তা জানতে চাইলে অধ্যক্ষ বলেন, ‘এ বিষয়ে অনেক কথা বলেছি। আর কোনো কথা বলতে চাই না।’

অধ্যক্ষ ২৪ জুন কলেজ ক্যাম্পাসে বজ্রপাত হয়েছিল বলে দাবি করলেও বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করে দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, সেদিন বজ্রপাতের কোনো ঘটনাই ঘটেনি। তাদের ধারণা, অধ্যক্ষ খুনিদের অপরাধ আড়াল করতেই সিসিটিভি নষ্টের নাটক সাজিয়েছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বরগুনা পাবলিক পলিসি ফোরামের আহ্বায়ক হাসানুর রহমান ঝন্টু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কলেজে অনেকগুলো সিসিটিভি ক্যামেরা আছে, এগুলো যদি সচল থাকত তাহলে খুব সহজেই রিফাত হত্যাকারীদের শনাক্ত করা যেত। কিন্তু অধ্যক্ষের অসচেতনতার কারণেই রিফাত হত্যার ঘটনায় অনেক জড়িতই হয়তো পার পেয়ে যাবে।’

সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ না পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বরগুনার পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন বলেন, ‘আমরা আমাদের তদন্তের কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। কার কার কাছ থেকে তথ্য নিয়ে আসামিদের ধরব সে বিষয়ে আমি এখন কিছু বলতে চাই না। তদন্তের স্বার্থে কিছু বিষয় আমাদের গোপন রাখতেই হচ্ছে।’

রিফাত হত্যা মামলার আরও ২ আসামি রিমান্ডে : রিফাত হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি টিকটক হৃদয় এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার করা রাফিউল ইসলাম রাব্বিকে ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। গতকাল শনিবার বিকেলে বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম গাজী পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিফাত হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানান।

গত ২৬ জুন বরগুনা শহরের কলেজ রোডে বহু পথচারীর উপস্থিতিতে স্ত্রী আয়েশা আক্তার মিন্নির সামনে রিফাত শরীফকে রামদা দিয়ে কুপিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে একদল যুবক। এ সময় মিন্নি প্রাণপণ চেষ্টা করে হামলাকারীদের বাধা দিলেও স্বামীকে রক্ষা করতে পারেননি। রিফাতকে কুপিয়ে অস্ত্র উঁচিয়ে এলাকা ত্যাগ করে হামলাকারী ওই যুবকরা। এমনকি তারা চেহারা লুকানোরও কোনো চেষ্টা করেনি। গুরুতর আহত অবস্থায় বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে ওইদিনই বিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান রিফাত। প্রকাশ্যে জনবহুল সড়কে রিফাতের ওপর নৃশংস ওই হামলার একটি ভিডিও ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি হয়।

রিফাতকে হত্যার ঘটনায় পরদিন তার বাবা হালিম শরীফ বাদী হয়ে বরগুনা সদর থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় নয়ন বন্ড এবং তার দুই সহযোগী রিফাত ফরাজী ও তার ছোট ভাই রিশান ফরাজীসহ ১২ জনকে আসামি এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও চার-পাঁচজনকে আসামি করা হয়। মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ড গত মঙ্গলবার ভোরে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। এ ছাড়া এই মামলায় এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১০ জনকে। তবে এজাহারভুক্ত ৬ আসামি এখনো পলাতক।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত