বরগুনায় প্রকাশ্যে সড়কে বহু পথচারীর উপস্থিতিতে রিফাত শরীফকে যে দুটি রামদা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় তার একটি উদ্ধার করা হয়েছে। দেশজুড়ে আলোচিত এই হত্যা মামলায় রিমান্ডে থাকা অন্যতম আসামি রিফাত ফরাজীর স্বীকারোক্তি অনুযায়ী গতকাল সোমবার বরগুনা সরকারি কলেজের পরিত্যক্ত একটি ডোবা থেকে রামদাটি উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। ওই রামদা দিয়েই রিফাত শরীফকে নৃশংসভাবে কোপায় রিফাত ফরাজী। এদিকে রিফাতকে হত্যার সঙ্গে জড়িত অভিযোগে একই দিন ভোরে আরিয়ান সাবা নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ নিয়ে এই মামলায় এখন পর্যন্ত ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হলো। রিফাত হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা
বরগুনা সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. হুমায়ুন কবির দেশ রূপান্তরকে জানান, রিফাত ফরাজীকে ৩ জুলাই গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাকে সাত দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে রিফাত ফরাজী জানায়, রিফাত শরীফকে কোপানোর পর তার ব্যবহৃত রামদাটি বরগুনা সরকারি কলেজ ক্যান্টিনের পূর্ব পাশের ডোবায় ফেলে দিয়ে পালিয়ে যায়। হত্যায় ব্যবহৃত অন্য রামদাটি হাতে করে নিয়ে যায় এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি নয়ন বন্ড।
পুলিশ কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘রিফাত ফরাজীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তাকে নিয়ে বরগুনা সরকারি কলেজ ক্যাম্পাসে যায় পুলিশ। পরে তার দেখিয়ে দেওয়া স্থান থেকে রামদাটি উদ্ধার করা হয়। এই রামদা দিয়েই রিফাত ফরাজী প্রকাশ্য দিবালোকে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে ছিল।’
রিফাত হত্যায় গ্রেপ্তার আরও ১, ৫ দিনের রিমান্ডে : পরিদর্শক হুমায়ুন কবির দেশ রূপান্তরকে জানান, রিফাত শরীফকে হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে আরিয়ান সাবা নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে সোমবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে গ্রেপ্তার করা হয়, তবে কোথা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তা জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। গ্রেপ্তার আরিয়ানের বাসা বরগুনা পৌরসভার শহরের বাজার সড়কে। তার বাবার নাম ইউনুস সোহাগ।
গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আরিয়ানকে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। তাকে সোমবার বিকেল ৪টায় বরগুনার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম গাজীর আদালতে হাজির করে ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে বিচারক ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
হুমায়ুন কবির বলেন, আমরা আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পুলিশি হেফাজতে আরিয়ানকে জিজ্ঞাসাবাদ করব।’
আলোচিত এই মামলার এজাহারভুক্ত ১২ আসামির মধ্যে এখন পর্যন্ত ছয়জন গ্রেপ্তার হয়েছে। এজাহারভুক্ত প্রধান আসামি সাব্বির আহম্মেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। এজাহারভুক্ত আসামি রিফাত ফরাজী, চন্দন, হাসান, অলিউল্লাহ ও টিকটক হৃদয় গ্রেপ্তার হয়েছে। বাকি ছয়জন রিশান ফরাজী, মুসা বন্ড, রাব্বি আকন, মোহাইমিনুল ইসলাম ও রায়হানকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
এজাহারভুক্ত আসামি ছাড়াও সন্দেহভাজন হিসেবে সিসিটিভি ফুটেজ শনাক্ত করে এই মামলায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরা হলো কামরুল হাসান, সাগর, তানভীর, রাফিউল ইসলাম রাব্বি ও নাজমুল ইসলাম। গ্রেপ্তারদের মধ্যে ছয়জন হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। তারা হলো সাগর, চন্দন, মো. হাসান, অলিউল্লাহ ও তানভীর হাসান।
রিফাত ও মিন্নির বাড়ি পরিদর্শনে আসকের দল : আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) একটি প্রতিনিধিদল নিহত রিফাত শরীফ ও তার স্ত্রী আয়েশা আক্তার মিন্নির বাড়ি পরিদর্শন করেছে। প্রতিনিধিদলে ছিলেন আসকের সাইকো সোশ্যাল কাউন্সেলর সালমা ইকরাম, সিনিয়র ডকুমেন্টালিস্ট ফাহমিদা জামান এবং অনুসন্ধান কর্মকর্তা হাসিবুর রহমান।
পরিদর্শন শেষে সালমা ইকরাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা মিন্নি ও রিফাতের পরিবারের কাছ থেকে সেদিনের (রিফাত হত্যা) ঘটনা এবং তাদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেছি। সেই সঙ্গে আমাদের মনে হয়েছে, মিন্নিকে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া উচিত।’
গত ২৬ জুন বরগুনা শহরের কলেজ রোডে বহু পথচারীর উপস্থিতিতে স্ত্রী আয়েশা আক্তার মিন্নির সামনে রিফাত শরীফকে রামদা দিয়ে কুপিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে একদল যুবক। এ সময় মিন্নি প্রাণপণ চেষ্টা করে হামলাকারীদের বাধা দিলেও স্বামীকে রক্ষা করতে পারেননি। রিফাতকে কুপিয়ে অস্ত্র উঁচিয়ে এলাকা ত্যাগ করে হামলাকারী ওই যুবকরা। এমনকি তারা চেহারা লুকানোরও কোনো চেষ্টা করেনি। গুরুতর আহত অবস্থায় বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে ওই দিনই বিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান রিফাত। রিফাতের ওপর নৃশংস ওই হামলার একটি ভিডিও ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
রিফাতকে হত্যার ঘটনায় পরদিন তার বাবা হালিম শরীফ বাদী হয়ে বরগুনা সদর থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় নয়ন বন্ড এবং তার দুই সহযোগী রিফাত ফরাজী ও তার ছোট ভাই রিশান ফরাজীসহ ১২ জনকে আসামি এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও চার থেকে পাঁচজনকে আসামি করা হয়।
