১৯৯৬ সালে শ্রীলঙ্কা বিশ্বকাপ জিতেছিল। তারপর ২৩ বছর কেটে গেছে। ক্রিকেটবিশ্বে ওয়ানডের সর্বোচ্চ আসরে আর নতুন কোনো চ্যাম্পিয়নের দেখা মেলেনি প্রায় দুই যুগ। এবার মিলবে। কারণ ইংল্যান্ড এবং নিউজিল্যান্ড আগে ফাইনাল খেললেও কখনো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি।
হ্যাঁ, আশ্চর্য হলেও সত্যি, ক্রিকেটের জন্ম দিয়েছে যারা তারাই কখনো বিশ্বকাপ জেতেনি। ‘গ্লোরিয়াস আনসার্টিনিটি’ আর কাকে বলে। সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজদের সেরা দান সম্পর্কে এক ভারতীয় লেখককে প্রশ্ন করায় তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘রাজনীতিতে সংসদীয় গণতন্ত্র আর খেলাধুলায় ক্রিকেট। ওই ক্রিকেটের জন্যই আমি ইংরেজদের হাজার দোষ ক্ষমা করতে পারি।’ তিনি ক্ষমা করলেও ক্রিকেটের ভাগ্যবিধাতা করেননি এতটা কাল। তাই ১৯৭৫ সালের পর ৪৪ বছর কেটে গেলেও বিশ্বকাপ জিততে পারেনি ইংল্যান্ড। এবার কি
পারবে? লর্ডসে আগামীকাল ফাইনাল খেলতে নামছে স্বাগতিক ইংলিশরা। প্রতিপক্ষ কিউইদেরও বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুযোগ। ২০১৫ বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলেছিল তারা। অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে রানার্সআপ হয়েই হতাশায় ডুবতে হয়েছিল ব্রেন্ডন ম্যাককালাম-মার্টিন গাপটিলদের।
দুই নতুন দলের ফাইনালে আজ পাল্লা ভারী যদিও ইংরেজদের দিকে। ব্যাটিং, বোলিং এবং ফিল্ডিংÑ তিন বিভাগেই স্বপ্নের ফর্মে আছে ওরা। ইংরেজরা তাই একরকম ধরেই নিয়েছে বিশ্বকাপ তারাই জিতবে। অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর পর ইয়ন মরগানকে সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘ইজ ইট কামিং হোম?’ ইংলিশ অধিনায়কের জবাব, ‘এখনই অতি উচ্ছ্বাসে ভেসে যেতে চাই না। অবশ্যই আমাদের জন্য এখন সময়টা খুবই রোমাঞ্চকর। আমরা যে ফাইনালে উঠে ট্রফি জয়ের সুযোগ পেয়েছি, এটি অবশ্যই দারুণ আনন্দের। তবে কাজ এখনো বাকি আছে। ফাইনাল জেতার জন্য আমাদের যা করার আছে তার সবটুকু উজাড় করে দেব।’
তাহলে কি আগের ব্যর্থতা মুছে যাবে? মাইক গ্যাটিং কি তার রিভার্স সুইপ খেলার বোকামিতে সান্ত¡নার প্রলেপ দিতে পারবেন? ১৯৮৭ বিশ্বকাপে ইডেন গার্ডেনসের প্রায় জিততে জিততে সেদিন হেরে গিয়েছিল ইংল্যান্ড। বোর্ডারের অস্ট্রেলিয়া জিতেছিল ৭ রানে। গ্যাটিং রিভার্স সুইপের হটকারী সিদ্ধান্ত না নিলে হয়তো সেবারই বিশ্বকাপ জিততে পারত ইংলিশরা। তীরে এসে তরী ডুবেছিল। এরপর আবার ১৯৯২ সালে ফাইনালে উঠেছিল ইংল্যান্ড। কিন্তু ইমরান খানের ‘আহত টাইগার’ দলের বিপক্ষে কিছু করার ছিল না ইয়ান বোথামদের। ইমরানের নেতৃত্ব, ইনজামাম-উল-হকের তারুণ্যে উচ্ছ্বসিত ব্যাটিং আর ভয়ংকর ওয়াসিম আকরামের মাস্টারিতে ইংরেজদের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
২০১৫ সালের বিশ্বকাপে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল ইংল্যান্ড। এর পেছনে অন্যতম কারণ ছিল বাংলাদেশের কাছে হার। গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিয়েছিল তারা। এরপরই সাদা বলের ক্রিকেটে নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে বৃহৎ পরিকল্পনা সাজায় ইংল্যান্ড। গেল চার বছরে তাদের ওয়ানডেতে উন্নতি ঈর্ষা করার মতো। বিশ্বকাপও শুরু করেছিল বিশ্ব র্যাংকিংয়ে এক নম্বরে থেকে। গত দুই বছরে সেই পরিকল্পনার পালে এমন হাওয়া লেগেছে যে, তাদের সবসময় অপ্রতিরোধ্য লাগে। অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষে সেদিন তো ওয়ানডে ইতিহাসের রেকর্ড ৪৮১ রানের ইনিংসও খেলেছে। সাড়ে তিনশো বা চারশো রান তাদের কাছে এখন খুব সহজ ব্যাপার হয়ে উঠেছে। পরিকল্পনার সুনিপুণ প্রয়োগ এবং ধারাবাহিকতায় ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে চমৎকার সুফল পাচ্ছে ইংল্যান্ড। যদিও পা হড়কেছিল। সেখান থেকে ফিরে ফাইনালে উঠেছে অসাধারণ খেলে। জেসন রয়, জনি বেয়ারস্টো, জস বাটলাররা দুর্ধর্ষ ব্যাটিং করছেন। অধিনায়ক মরগান তো নিজের দিনে খুন করেন প্রতিপক্ষকে। জো রুটের কথা মুখে মুখে ফেরে। জোফরা আর্চার, ক্রিস ওকস, মার্ক উউ ও আদিল রশিদরা দারুণ বল করছেন। ফলে ২৭ বছর পর আবার ফাইনালে উঠেছে ইংল্যান্ড। আগামীকাল লর্ডসে স্বপ্নপূরণ হলে ইতিহাসের অংশ হয়ে যাবে মরগানের দল।
নিউজিল্যান্ডের অবশ্য ইংরেজদের মতো ক্রিকেটের সর্বোচ্চ আসরগুলোতে খুব সাফল্যের ইতিহাস নেই। তবে বিশ্বকাপের পারফরম্যান্সে তারা তেমন পিছিয়ে নেই স্বাগতিকদের চেয়ে। এবারসহ টানা দুই বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলছে তারা। সেমিফাইনালে শিরোপার দাবিদার ভারতকে হারিয়ে নিজেদের সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। ট্রেন্ট বোল্ট, লোকি ফার্গুসন, ম্যাট হেনরিরা গতির সঙ্গে বিষাক্ত সুইংয়ে বিশ্বসেরা ব্যাটিং লাইনআপকে স্থবির করে দিয়েছিলেন। আর তাদের ফিল্ডিং? নিঃসন্দেহে এই সময়ে বিশ্বসেরা। সবচেয়ে প্রয়োজনের মুহূর্তে গাপটিলের সরাসরি থ্রোতে মহেন্দ্র সিং ধোনির রান আউট যার প্রমাণ। ওখান থেকেই ফাইনাল নিশ্চিত তাদের। ব্যাটিংয়ে কিছু দুর্বলতা আছে কিউইদের। কেন উইলিয়ামসন আর রস টেইলর ছাড়া খুব ভালো করতে পারছেন না অন্যরা। গাপটিল নিজেকে খুঁজেই পাচ্ছেন না। তবে রবিবার তো বিশ্বকাপ ফাইনাল বলে কথা। একটা দিন যদি সব ঠিকঠাক হয়ে যায় তাহলে লর্ডসের ব্যালকনিতে উইলিয়ামসনের হাতেই দেখা যাবে বিশ্বকাপ। তাহলেও কিন্তু নতুন চ্যাম্পিয়নই পাবে ক্রিকেট।
কিন্তু গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা ক্রিকেট। খেলাটার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য তো ওখানেই।
