মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়ি বরাদ্দে অনিয়ম অনাকাক্সিক্ষত

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০১৯, ১০:৩১ পিএম

একাত্তরের মুক্তিসংগ্রামে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে দেশবাসীর ঋণ অপরিমেয়। মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম সাহসিকতা, বীরত্বপূর্ণ অবদান ও সীমাহীন আত্মত্যাগের বিনিময়েই আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ আজ স্বাধীন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা থেকে শুরু করে বহু চড়াই-উৎরাই পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশ এখন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে। কিন্তু এই সময়ে এসেও যখন দেশে ‘ভূমিহীন’ ও ‘অসচ্ছল’ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রসঙ্গ আসে, তখন এক গভীর বেদনা গ্রাস করে। তদুপরি যখন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয় যে, ভূমিহীন ও অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সরকারিভাবে নির্মিত বাসস্থান বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রেও অনিয়ম হয়েছে; তখন লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে আসে। দুর্নীতি কি আজ এতই অপ্রতিরোধ্য যে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তার প্রকল্পও দুর্নীতির চক্র থেকে রেহাই পাবে না?

 

‘দরিদ্র মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়ি পেয়েছেন সচ্ছলরা’ শিরোনামে শনিবার দেশ

রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা না থাকায় ‘বীর নিবাস’ নামের এসব বাড়ি বরাদ্দ পাননি প্রকৃত অর্থে ভূমিহীন ও অসচ্ছল অনেক মুক্তিযোদ্ধা।  অথচ ডাক্তার, শিক্ষক, সরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও বেসরকারি চাকরিজীবী মুক্তিযোদ্ধারা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ওই ছোট্ট বাড়িগুলোর বরাদ্দ নিয়েছেন! অনিয়মের কারণে বছরে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা আয় করেন এমন অনেকেও এসব বাড়ি বরাদ্দ পেয়েছেন। অনিয়ম কেবল ভবন বরাদ্দেই হয়নি, অনেক ক্ষেত্রেই ভবনগুলো নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে নিম্নমানের পণ্য ও উপকরণ, ফলে বাড়িগুলো মানসম্মত হয়নি। এছাড়া তিন বছরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও লেগেছে সাড়ে ৬ বছর।

 

‘ভূমিহীন ও অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বাসস্থান নির্মাণ প্রকল্প’-এর আওতায় ২০১২ থেকে ২০১৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশের ৪৮৪টি উপজেলায় ‘বীর নিবাস’ নামে ২ হাজার ৯৬২টি আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হয়। টয়লেট ও পানীয় জলের সুবিধাসহ তিন কক্ষবিশিষ্ট ৫০০ বর্গফুট আয়তনের এসব বাড়িতে রয়েছে একটি করে বারান্দা। জাতীয় পতাকার আদলে রং করা বাড়িগুলোর প্রতিটিতে রয়েছে দুটি বেডরুম, একটি ড্রয়িংরুম, একটি বারান্দা। এর মধ্যে ১০টি উপজেলায় ৩০০টি ভবনে বরাদ্দ পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর সরকারের ‘বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ’-আইএমইডির করা জরিপ থেকে এই প্রকল্পে দুর্নীতির বিষয়টি উঠে আসে। আইএমইডির জরিপে দেখা গেছে, ওই ৩০০টি বাড়ির মধ্যে ৩৫টি বরাদ্দ নেওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক আয় ৪০ হাজার টাকারও বেশি।

 

মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রতিটি উপজেলায় স্থানীয়ভাবে গঠিত কমিটির সুপারিশে এসব বাড়ি  বরাদ্দের জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের নির্বাচন করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী জানিয়েছেন, বরাদ্দে অনিয়মের কারণে ইতিমধ্যে ২২ জনের বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে এবং অনিয়মের অভিযোগগুলো তদন্ত করে দেখা হবে। উল্লেখ্য, ৪৮৪টি উপজেলার মোট ২ হাজার ৯৬২টি বাড়ির মধ্যে আইএমইডি মাত্র ৩০০ ভবনের বরাদ্দ নিয়ে জরিপ চালিয়েছে। জরিপের আওতাভুক্ত বাড়িগুলোর প্রায় ১০ শতাংশের বেশি বরাদ্দেই অনিয়ম হয়েছে। এছাড়া বাড়িগুলোতে নিম্নমানের পণ্যসামগ্রী ব্যবহার করে মানহীন নির্মাণকাজের অভিযোগও তুলেছে সংস্থাটি। এই অবস্থায় আসলে পুরো প্রকল্পটির বরাদ্দ ও নির্মাণের মান নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।  

 

ভূমিহীন ও অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করার এই প্রকল্পে দুর্নীতি আমাদের অনেকগুলো প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। প্রকৃত অর্থেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অনুসারে দেশ গড়ার কাজ সম্পন্ন করা গেলে দেশে কেবল মুক্তিযোদ্ধা নয়, সকল নাগরিকেরই জন্য আবাসন নিশ্চিত হওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আমরা এখনো সেই লক্ষ্যপূরণে সফল হইনি। অন্যদিকে, এটা খেয়াল রাখা দরকার যে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠই দেশের গ্রামাঞ্চলের কৃষক ও সাধারণ মানুষ।  মুক্তিযুদ্ধে তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার গ্রাম ও শহরের দরিদ্র ও অসহায় মুক্তিযোদ্ধাদেরই সহায়তা দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছিলেন। অবশ্য, পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্য দিয়ে এমন সময়ও দেখা গেছে যে, মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ের কারণে অগ্রাধিকার পাওয়ার বদলে বরং নিগৃহীত হতে হয়েছে এমনকি চাকরিচ্যুতও হতে হয়েছে অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে।

 

প্রকৃত অর্থেই সহায়তা প্রয়োজন এমন ভূমিহীন ও অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন বটে, কিন্তু নানারকম অনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে রাষ্ট্রীয় সহায়তার অপব্যবহারের নজিরও বিস্তর। মুক্তিযোদ্ধার সনদ জাল করা, মুক্তিযোদ্ধার কোটার অপব্যবহারসহ নানা ঘটনা বিভিন্ন সময়ে আলোচিত-সমালোচিতও হয়েছে। এ অবস্থায় ভূমিহীন ও অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের আবাসন প্রকল্পের দুর্নীতির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে প্রকৃত অর্থে এই সহায়তা প্রয়োজন রয়েছে তেমন ব্যক্তিদের মধ্যে বাড়িগুলোর বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত