লর্ডসের ব্যালকনিতে সৌরভের জার্সি ঘোরানোর ১৭ বছর

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০১৯, ১০:১৭ পিএম

সৌরভ গাঙ্গুলির সঙ্গে তখন কোচ জন রাইটের দা-কুমড়ো সম্পর্ক। বলতে গেলে মুখ দেখাদেখি, বাক্যালাপ বন্ধ। কেউ কাউকে মানেন না। কোচ পূর্ব বললে, সৌরভ হাঁটেন পশ্চিমে। অধিনায়কের দেখাদেখি অন্যরাও কোচকে থোরাই কেয়ার করেন।

ভারত শিবিরে যখন অস্থিরতা চরমে তখনই ইংল্যান্ডের সঙ্গে লর্ডসে তারা খেলল ওয়ানডে ইতিহাসের রোমাঞ্চকর এক ম্যাচ। ন্যাটওয়েস্ট ট্রফির ফাইনাল। ইংল্যান্ড, ভারত আর অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে সেই ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে আগে ব্যাট করে ইংল্যান্ড তুলল ৩২৫। কঠিন ওই রান তাড়া করে ভারত ম্যাচটা জিতে নিল ২ উইকেটে। অবিস্মরণীয় ওই জয়ে ভারত অধিনায়ক সৌরভ করলেন বুনো উদযাপন। মোহাম্মদ কাইফের ব্যাট থেকে যখন উইনিং স্ট্রোকটা এলো, সৌরভের লর্ডসের ঐতিহ্যবাহী ব্যালকনিতে জার্সি উড়িয়ে সৌরভের ওই উদযাপন নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইল।

১৭ বছর আগের সেই অবিস্মরণীয় জয়ের একটা উদযাপন গত ১২ জুলাই হয়ে গেল ইংল্যান্ডে। যেখানে উপস্থিত হয়ে সম্পর্কের তিক্ততা ভুলে হাসি-ঠাট্টায় মাতলেন সৌরভ আর জন রাইট। সেই আড্ডায় ছিলেন সে সময় ভারত দলের ম্যানেজার, বর্তমানে আইপিএলের চেয়ারম্যান রাজিব শুক্লা। সৌরভ-জন রাইটের লড়াই থামাতে, কোচের ওপর খেলোয়াড়দের রোষ কমাতে তার প্রাণান্ত চেষ্টার স্মৃতিচারণ যখন করলেন, তখন পাশে বসে মুচকি হাসলেন সৌরভ আর রাইট। দলের এমনধারা ঝামেলা মেটাতে রীতিমতো গলদঘর্ম শুক্লা বলেন, ‘জীবনে এমন ঝামেলার মধ্যে পড়িনি। হরভজন সিং এসে আমায় বলল, ম্যানেজার আমরা ঠিক করেছি লর্ডস ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আমরা সবাই জার্সি খুলব। গোটা টিম। আমি ঘাড় নাড়লাম, কিন্তু তখনই শচীন এসে হাজির। ড্রেসিংরুমের ভেতর নিয়ে গিয়ে বলল, ম্যানেজার এটা আমরা করতে পারি না। লর্ডসে সবাই মিলে জামা খুললে সেটা চরম রুচিহীনতা হবে।’ শুক্লার স্মৃতিচারণা শুনে তখন হেসে উঠলেন সৌরভ আর জন। শুক্লা অবশ্য থামার পাত্র নন, ‘এমন ক্যাপ্টেন আর কোচ যে যত ভাব, তত গ-গোল। ন্যাটওয়েস্ট ফাইনালের আগে সে কি ঝামেলা। কোচ এসে বলছে, তোমার ক্যাপ্টেন অমুক করছে, তমুক করছে। ক্যাপ্টেন বলছে, কে কোচ? আমি ক্যাপ্টেন। যা ঠিক করার আমি করব।’ এ কথায় সায় দিয়ে সৌরভ বললেন, ‘ঠিকই বলেছে রাজিব। আগের দিন জন বলল, তুমি ফিজিক্যাল ট্রেনিং ঠিকমতো করোনি। তোমাকে আমি নেটে ব্যাটিং করতে দেব না। আমি বললাম, তুমি ঠিক করার কে। ক্যাপ্টেন আমি। বলে প্রথমেই ব্যাট করতে চলে গেলাম।’ এ কথায় লন্ডনের মেফেয়ারে রয়াল ওভারসিজ ক্লাব হলভর্তি মানুষের মধ্যে উঠল হাসির রোল।

শুধু কি সৌরভের সঙ্গে কোচের গোলমাল। সে সময় দলের ওপেনার বীরেন্দ্র শেবাগের সঙ্গেও ঝামেলা কম হয়নি জন রাইটের। ফাইনালে ইংল্যান্ড যখন ৩২৫ রান তুলে ফেলেছে তখন ভারতীয় শিবিরে ছড়িয়ে পড়েছে হারের শঙ্কা। ম্যানেজার রাজিব শুক্লা বললেন, ‘সেদিন কেমন পাগল পাগল লাগছিল। ওরা ৩২৫ করে ফেলার পর আমি বিরুকে বলি এবার মানসম্মান সব যাবে। ভারতীয় মিডিয়া ছিঁড়ে খাবে হারলে। বিরু বলল, চুপচাপ এখানে বসে থাকুন। সব ঠিক করে দিচ্ছি। বলে শিস দিতে দিতে চলে গেল। বিরুকে বলা হয়েছিল ধরে খেলতে। সেটা না করে লিফট করতে গিয়ে আউট। ড্রেসিংরুমে ঢোকামাত্রই জন গিয়ে ওর কলার চেপে ধরল। সেটা নিয়ে বেধে গেল তুমুল ঝামেলা। হরভজন বলল, এটা কী হচ্ছে? কোচ গায়ে হাত তুলবে কেন? আপনি এটা বিচার করুন। আপনি কোচের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন। আমি জনকে একান্তে ডাকলাম। কোচও অনড়। বলল, আমি তো শুধু ওর কোচ নই, আমি ওর গুরু। শিষ্যকে বাগে আনতে যেকোনো কিছু করার অধিকার আমার আছে।’

ব্যতিক্রমী এই আড্ডায় সৌরভের কাছে প্রশ্ন গেল, জার্সি মাথার ওপর ঘোরাতে ঘোরাতে আপনি কী বলছিলেন? অতীতের এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, মেরা ভারত মহান। কিন্তু এখনো ইউটিউবে গেলে দেখা যাবে ঠোঁট মিলছে না। মনে হচ্ছিল ফ্লিনটফকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলছিলেন? লজ্জিত সৌরভ এই প্রশ্নের জবাব যেন খুঁজে পাচ্ছিলেন না। পাশে বসা ফাইনালের জয়ের নায়ক মোহাম্মদ কাইফ বাঁচানোর চেষ্টা করলেন তার অধিনায়ককে, ‘নানারকম কথাই হচ্ছিল। তার মধ্যে না ঢোকাই ভালো।’

ছিলেন ইংল্যান্ড দলের হয়ে সেই ম্যাচ খেলা রনি ইরানি। ফ্লিনটফের সঙ্গে সৌরভের মাঠে কথোপকথনের কথাটা তিনিই ভালো বললেন, ‘ফ্রেডি পুরো ম্যাচজুড়ে সৌরভকে গালাগাল করেছিল। কিন্তু ওই জামা খোলার পর ও চুপ করে যায়। আমাদের ড্রেসিংরুমে এই ঝটকা আসবে ভাবিনি। যদিও দুদলের মধ্যে আগে থেকেই ঝামেলা চলছিল। আগের একটা ম্যাচে শচীনকে গ্লাভস দিতে এসেছিল কাইফ। নাসের হুসেইন বলল, এই তুই কে রে? যখন তখন মাঠে ঢুকছিস। তুই কি শচীনের বাস ড্রাইভার? ফাইনালে কাইফ যখন বাউন্ডারি মারছে, তখন মনে হচ্ছিল ক্যাপ্টেন ওকে একটু বেশিই ক্ষেপিয়ে দিয়েছে।’

লর্ডসের গতকালের ফাইনালে ছিল না ভারত। তবে ১৭ বছর আগেই লর্ডসের স্মৃতি রোমন্থনে বিলাতে সেই রাতে বেরিয়ে এলো মায়াবী নানা মুহূর্ত। বৈশ্বিক কোনো আসরের ফাইনাল জয় নয়, একটি ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালের কীর্তি অমর হয়েই থাকবে রঙিন ক্রিকেটের ইতিহাসের পাতায়। তথ্যসূত্র : সংবাদ প্রতিদিন।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত