সাবেক রাষ্ট্রপতি এবং জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুতে দলীয় নেতৃত্ব নিয়ে গতকাল রবিবার থেকেই আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। গত দুই মাস আগে এরশাদ তার অবর্তমানে তার ভাই গোলাম মোহাম্মদ কাদেরকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং মশিউর রহমান রাঙ্গাকে মহাসচিব ঘোষণা করে চিঠি দেন। গত ২২ জুন শারীরিক পরিস্থিতির অবনতি হলে এরশাদ হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরও তার এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে দলের শীর্ষ নেতাদের বলেন।
কিন্তু এরশাদের জীবদ্দশাতেই দলের কো-চেয়ারম্যান এরশাদের স্ত্রী রওশনপন্থিরা এই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি। এরশাদের মৃত্যুর পর দলটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দলের সিনিয়র একাধিক নেতা বলেন, এ মুহূর্তে বিরোধ দেখা দিলে জাতীয় পার্টি অস্তিত্ব হারাবে।
জাপার একাধিক প্রেসিডিয়াম সদস্য এই প্রতিবেদককে বলেছেন, এরশাদ জুনের প্রথম সপ্তাহে দলের কয়েকজন সিনিয়র নেতা এবং জিএম কাদের ও রওশন এরশাদকে ডেকে বলেছেন, তিনি হয়তো আর বেশিদিন বাঁচবেন না। তার মৃত্যুর পর দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে মিলেমিশে কাজ করার পরামর্শ দেন। দলের একজন শীর্ষ নেতা বলেন, এরশাদ হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই নেতৃত্ব নিয়ে সংকট তৈরি হয়। এরশাদের শারীরিক অবস্থা নিয়ে কে প্রেস ব্রিফিং করবেন এ নিয়ে প্রথম দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। এরপর দলের বেশিরভাগ সিনিয়র নেতার সমর্থনে জিএম কাদেরই এরশাদের শারীরিক পরিস্থিতি সম্পর্কে গণমাধ্যমের সামনে আসেন। হাসপাতালেও রওশনপন্থি ও জিএম কাদেরপন্থিদের মধ্যে প্রকাশ্য বিভাজন দেখা যায়।
এদিকে গতকাল এরশাদের মৃত্যুর পর দাফনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দলের মধ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। তবে দলের বেশিরভাগ নেতাকর্মীরা মনে করেন, জিএম কাদেরের নেতৃত্বেই দল এগিয়ে যাবে। রওশন এরশাদের জনপ্রিয়তা নেই। রুহুল আমিন হাওলাদার, ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, জিয়া উদ্দিন বাবলুসহ গুটিকয়েক নেতা রওশনের নেতৃত্ব চান দলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে।
দলের একজন একাধিক শীর্ষ নেতা বলেন, কাউন্সিলের আগ পর্যন্ত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জিএম কাদেরই থাকবেন। রওশনপন্থিরা এখানে খুব সুবিধা করতে পারবেন না। তবে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা কে হবেনÑ এটা নিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। দলের সংসদ সদস্যদের নিয়ে বৈঠক করে এরশাদের পরে বিরোধীদলীয় নেতা কে হবেন তা ঠিক করা হবে। রওশন হবেন নাকি কাদের হবেন এটা নিয়ে এরই মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, রওশন বিরোধী দলের নেতা হতে পারেন।
জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য লোটন শিকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্যার (এরশাদ) যে নির্দেশনা দিয়েছেন নেতাকর্মীরা তার বাইরে যাবেন না। জিএম কাদের ও রাঙ্গার নেতৃত্বে দল ঐক্যবদ্ধ থাকবে।
এদিকে গতকাল বিকেলে জাপার বনানীর চেয়ারম্যান কার্যালয়ে এরশাদের দাফন নিয়ে বিক্ষোভ দেখা দেয়। দলীয় নেতাকর্মীরা কিছুতেই চান না বনানীর সামরিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হোক। নেতাকর্মীরা মনে করেন, সামরিক কবরস্থানে দাফন করা হলে, নেতাকর্মীরা এরশাদের কবর দেখতে যেতে পারবেন না সব সময়। তারা চান জনগণের সমাগম ঘটে এমন স্থানে এরশাদের দাফন হোক।
তবে রংপুরবাসী চায় এরশাদের কবর হবে রংপুর এরশাদ কমপ্লেক্সের ভেতরে। গতকাল রংপুর সদরের মেয়র মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাফিজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখানকার মানুষের যে আবেগ আমরা দেখছি। তাতে রংপুর থেকে এরশাদের লাশ ঢাকায় নেওয়া মুশকিল হবে। এখানেই তাকে দাফন করতে হবে।
মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী এখন পর্যন্ত সামরিক কবরস্থানে তাকে কবর দেওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল রয়েছে। নেতাকর্মীরা যদি মনে করে তার কবর পাবলিক প্লেসে উন্মুক্ত জায়গায় হোক, এ বিষয়ে আমরা দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা আলোচনা করব। পরিবারসহ সবাই বসে আমরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব।
