বিশুদ্ধ দুধ নিশ্চিতের দায়িত্ব এখন সরকারের

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০১৯, ১০:৫০ পিএম

দুধে দূষণ ও বিষাক্ত উপাদান নিয়ে সম্প্রতি দেশে যে গবেষণা-আলোচনা-সমালোচনা ও বিতর্ক হলো তার নজির সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিরল। দুধ নিয়ে এই বিতর্ক নিরাপদ খাদ্যের প্রতি জনসাধারণের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছে। কিন্তু এ তৎপরতার সফলতা নির্ভর করছে মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর উপাদানগুলো দূর করে নাগরিকদের জন্য বিশুদ্ধ দুধের সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর। কয়েক দফা গবেষণা ও নানা বিতর্কে দুধ নিয়ে গড়ানো জল অনেক আগেই আদালত পর্যন্ত গেছে। সর্বশেষ আদালতের নির্দেশে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের গবেষণাগারে আলাদাভাবে পরীক্ষার পরও দুধে মিলেছে ক্ষতিকর ও মারাত্মক সব উপাদান। এর পরিপ্রেক্ষিতে নাগরিকদের জন্য বিশুদ্ধ দুধ নিশ্চিত করতে উচ্চ আদালত বেশ কিছু নির্দেশনাও দিয়েছে।  এখন প্রয়োজন বাজারে বিক্রি হওয়া বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত পাস্তুরিত দুধ ও খোলাবাজারের অপাস্তুরিত দুধে সব ধরনের ভেজাল ও দূষণ বন্ধ করা।

মঙ্গলবার আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনে নিরাপদ খাদ্য কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মান নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) অনুমোদিত ১৪ কোম্পানির মধ্যে ১১টির পাস্তুরিত দুধেই মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর সিসা ও ক্যাডিমিয়ামের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এ ছাড়া খোলা তরল দুধের ৫০টি নমুনার বেশির ভাগে সিসা ও ক্যাডিমিয়ামের উপস্থিতি রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, আইসিডিডিআর-বি, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন, বাংলাদেশ অ্যাগ্রিকালচার রিসার্চ ইনস্টিটিউট, বিসিএসআইআর, প্লাজমা প্লাস, ওয়াফেন রিসার্চের ল্যাবে পাস্তুরিত, খোলা দুধ ও গোখাদ্য পরীক্ষা করেছে নিরাপদ খাদ্য কর্র্তৃপক্ষ।

দুধে দূষণ নিয়ে উচ্চ আদালতের পদক্ষেপ এবং আদালতের নির্দেশনায় দুধের মান পরীক্ষা অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।  কিন্তু আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদন থেকে যে প্রশ্নটি সামনে উঠে এসেছে তা হলো, দুধে দূষণ পরীক্ষায় বিএসটিআইয়ের ১৭ বছরের পুরনো পদ্ধতি প্রয়োগ করা হলো কেন? নিরাপদ খাদ্য কর্র্তৃপক্ষ দুধে অ্যান্টিবায়োটিক বা ডিটারজেন্টের উপস্থিতির বিষয়টি নিয়ে কোনো পরীক্ষা করেনি। যুক্তি হিসেবে সংস্থাটি বলেছে, ২০০২ সালে বিএসটিআই পাস্তুরিত দুধের যে মান নির্ধারণ করেছিল, তার ভিত্তিতেই বাজারে থাকা দুধের নমুনা পরীক্ষা করেছে তারা। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল রিসার্চ সেন্টারের গবেষণায় দুধে এই অ্যান্টিবায়োটিক ও ডিটারজেন্টের উপস্থিতি পাওয়ার পরই দুধ নিয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়। সরকারি কর্মকর্তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার ফলকে নাকচ করে দেন এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ারও হুমকি দেন।

এ অবস্থায় নানা প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। ফেব্রুয়ারি মাসে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সহায়তায় জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরীক্ষায় গোখাদ্য, দুধ, দই ও পাস্তুরিত দুধে গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি কীটনাশক, অ্যান্টিবায়োটিক ও সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।  জুন মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের গবেষণায় সাতটি ব্র্যান্ডের পাস্তুরিত তরল দুধে লেভোফ্লক্সাসিন, সিপ্রোফ্লক্সাসিন, এজিথ্রোমাইসিন নামের অ্যান্টিবায়োটিক এবং অপাস্তুরিত দুধে ডিটারজেন্ট ও ফরমালিন মিলেছে। এত কিছুর পরও কেন দুধের পরীক্ষায় বিএসটিআইয়ের ২০০২ সালের নির্ধারিত মান অনুসরণ করা হবে? কেন পাস্তুরিত ও অপাস্তুরিত দুধে দূষণ আছে কি না, তা পরীক্ষার জন্য যুগোপযোগী নতুন মান নির্ধারণ করা হবে না? কেন বাজারের প্যাকেটজাত ও খোলা তরল দুধে অ্যান্টিবায়োটিক ও ডিটারজেন্টের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হবে না? 

আবহমানকাল থেকে দেশে দেশে স্বাস্থ্যকর পানীয় হিসেবে দুধ মানুষের পুষ্টি ও প্রাণিজ আমিষের চাহিদা মিটিয়ে আসছে।  স্বাস্থ্যবিজ্ঞান বলছে, প্রতিদিন এক গ্লাস দুধ পান করা মানবস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী, বিশেষ করে শিশু, নারী ও প্রবীণদের জন্য দুধ খুবই দরকারি। কিন্তু এখন দুধে দূষণ যে পর্যায়ে পৌঁছেছে তাতে পুষ্টির চাহিদা মেটানোর বদলে পয়সা দিয়ে কিনে বিষাক্ত দুধ খাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন ক্রেতারা।  এ অবস্থার পরও সরকারি কর্মকর্তাদের কেউ কেউ উল্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বার্থের গবেষণার বিরুদ্ধে বিষোদগার করে মান নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতা ঢাকার আর নানা কোম্পানির স্বার্থরক্ষার অপচেষ্টা করছেন। প্রশ্ন হলো সরকার কেন কর্মকর্তাদের এমন দায়িত্বহীন আচরণের দায় নেবে? জনস্বাস্থ্যের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সরকারের উচিত হবে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিয়ে সবার জন্য নিরাপদ ও বিশুদ্ধ দুধ সরবরাহ নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত