ওয়াসার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ না করেই ঠিকাদারের বিল দেওয়াসহ দুর্নীতির ১১টি উৎস চিহ্নিত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রাতিষ্ঠানিক দল। এসব দুর্নীতি প্রতিরোধে নিয়মিত গণশুনানি করাসহ ১২ দফা সুপারিশও করেছে তারা। গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলামের কাছে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন তুলে দেন দুদকের কমিশনার ড. মো. মোজাম্মেল হক খান।
এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা ওয়াসা নিয়ে সমীক্ষা করে দেখেছি, এখানে প্রায় ১১টি জায়গায় দুর্নীতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব দুর্নীতি প্রতিরোধে আমরা ১২টি সুপারিশ করেছি। আমরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পর্যবেক্ষণ করে তাদের যেসব জায়গায় দুর্নীতির সুযোগ রয়েছে বা যেসব জায়গায় দুর্নীতি হয় বলে বিভিন্ন ধরনের তথ্য রয়েছে, তার ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি করি। এটি বিশাল কোনো গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়। এটা আমাদের কর্মকর্তারা করেছেন। তবে
যেগুলো বলেছি তা খণ্ডন করারও কিছু নেই।
এলজিআরডি মন্ত্রীর উদ্দেশে দুদকের কমিশনার বলেন, দুর্নীতির উৎসের কথাগুলোই আপনার জ্ঞাতার্থে বলতে চাই, যাতে ওয়াসা কর্র্তৃপক্ষ ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের একটু সংবেদনশীল করতে পারেন। এই জায়গাগুলোতে যদি নজর দেন, তা হলে এগুলো সংশোধন হবে। ভবিষ্যতে কোনো প্রকল্পে এ ধরনের ঘটনা আর ঘটবে না।
দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত না করে বিভিন্ন অজুহাতে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা ও প্রকল্প ব্যয় বাড়ানো হয়। এ ক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালকসহ প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী এবং ওয়াসার ব্যবস্থাপনা কর্র্তৃপক্ষ জড়িত থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পে যথাযথ কাজ হয় না।
ঢাকাসহ বৃহত্তর মিরপুর এলাকার পানির চাহিদা পূরণকল্পে মিরপুরের ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা হ্রাসকরণ প্রকল্পটি ২০১২ সালের ২২ নভেম্বর অনুমোদন হয়। ডিপিপি অনুযায়ী ৫২১ কোটি টাকার প্রকল্প ২০১২ সালের জুলাই থেকে ২০১৭ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা। ২০১৬ সালের মার্চে সংশোধিত ডিপিপি অনুযায়ী প্রকল্পের ব্যয় ৫৭৩ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ না করে অযৌক্তিকভাবে প্রকল্পের ব্যয় ৫২ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। কাজের অগ্রগতির সঙ্গে ঠিকাদারের পরিশোধিত বিলের অনেক পার্থক্য পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ মহানগরীতে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার স্বার্থে প্রতিদিন ৪০ কোটি লিটার অতিরিক্ত পানি সরবরাহ করার জন্য গভীর নলকূপ স্থাপন/প্রতিস্থাপন/রিজেনারেশন ও পানির লাইন নির্মাণ/পুনর্বাসনের জন্য ২০১৫ সালে তিন বছর মেয়াদে ২৫২ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়। এই প্রকল্পে কাজের অগ্রগতির সঙ্গে ঠিকাদারের পরিশোধিত বিলের অনেক পার্থক্য দেখা যায়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ না করে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা ও প্রকল্প ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালকসহ প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও ওয়াসার ব্যবস্থাপনা কর্র্তৃপক্ষ জড়িত ছিল।
সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার (ফেইজ-৩) প্রকল্পে ভূ-উপরিস্থ পানি শোধনের মাধ্যমে ঢাকা মহানগরীর পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য ৪ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু প্রকল্পের কাজে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই।
‘পদ্মা (যশলদিয়া) পানি শোধনাগার নির্মাণ (ফেজ-১) প্রকল্পে মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলার পদ্মা নদীর তীরে যশলদিয়া নামক স্থানে পানি শোধনাগার নির্মাণের মাধ্যমে পুরাতন ঢাকা শহরের মিটফোর্ড, নবাবপুর, লালবাগ, হাজারীবাগ ধানম-ি, মোহাম্মদপুর এবং তৎসংলগ্ন এলাকাতে পানির চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে ৪৫০ এমএলডি সুপেয় পানি সরবরাহের জন্য ৩৫০৮ হাজার ৭৫ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়। ২০১৩ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে কাজ সমাপ্ত করার কথা থাকলেও তা সমাপ্ত হয়নি।
‘ঢাকা এনভায়রনমেন্টালি সাসটেইনেবল ওয়াটার সাপ্লাই প্রকল্পে’ ভূ-উপরিস্থ পানি শোধনের মাধ্যমে ঢাকা মহানগরীর পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য ৫২৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মেয়াদে প্রকল্প বাস্তবায়ন করার কথা। এ প্রকল্পে ২৩৮ কোটি টাকা ইতোমধ্যে পরিশোধ করা হলেও কাজের অগ্রগতি মাত্র ৮ শতাংশ।
২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা মহানগরীর আগারগাঁও এলাকায় বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্পটি ২০১৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৭ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। এই প্রকল্পে কোনো অগ্রগতি নেই।
ঢাকা পানি সরবরাহ নেটওয়ার্ক উন্নয়ন প্রকল্পটি ৩ হাজার ১৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৬ সালের এপ্রিল থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়ন করার কথা। আজ পর্যন্ত প্রকল্পের কোনো অগ্রগতি নেই। এ প্রকল্পের কাজের কাক্সিক্ষত অগ্রগতি না থাকলেও কার্যাদেশ প্রাপ্ত ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে পরামর্শক ও ঠিকাদার নির্বাচনের ক্ষেত্রে দুর্নীতি বিষয়ে বলা হয়েছে, বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরামর্শক ও ঠিকাদার নির্বাচনের বিষয়ে দাতা সংস্থার গাইডলাইন ও ঋণচুক্তির শর্তাবলি মেনে চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এক্ষেত্রে পরামর্শক ও ঠিকাদার নির্বাচনের বিষয়ে এমন কিছু শর্তারোপ করা হয়, যাতে নির্দিষ্ট সংখ্যক ঠিকাদার প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। তবে ঠিকাদার নির্বাচনের ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট পদ্ধতি ও রাজনৈতিক পরিচয় এবং কাজ পাওয়ার বিনিময়ে ঘুষ লেনদেন বর্তমানে একটি প্রচলিত প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে স্পেশিফিকেশন ও ডিজাইন অনুযায়ী প্রকল্পকাজ যথাসময়ে শেষ হয় না এবং প্রকল্পের ব্যয়ভার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পায়।
ব্যক্তি মালিকানাধীন গভীর নলকূপ স্থাপন, মিটার রিডিং ও রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে দুর্নীতি প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ব্যক্তি মালিকানাধীন গভীর নলকূপ স্থাপন, মিটার রিডিং ও রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে ওয়াসা এখনো ম্যানুয়াল পদ্ধতি ব্যবহার করায় প্রকৌশল ও রাজস্ব শাখার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মিলে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে, যার মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে।
ওয়াসা কর্মচারীদের ওভারটাইম বিল সংক্রান্ত দুর্নীতি প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ঢাকা ওয়াসায় পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় ওয়াসার বিভিন্ন শ্রেণির কর্মচারীদের তাদের নির্ধারিত কার্য সময়ের বাইরে অতিরিক্ত কাজ করতে হয়। এক্ষেত্রে তাদের ওভারটাইম বিল প্রদান করা হয়, যা মূল বেতনের চেয়েও প্রায় দ্বিগুণ। অনেক ক্ষেত্রে কিছু প্রভাবশালী কর্মচারী ওভারটাইম না করেও ওয়াসার কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় ওভারটাইম বিল উত্তোলন করার অভিযোগ রয়েছে।
সুপারিশ : ওয়াসায় দুর্নীতি প্রতিরোধে দুদকের পক্ষ থেকে যেসব সুপারিশ করা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে, চলমান প্রকল্পগুলোর দুর্নীতি ও অর্থ অপচয় রোধে বিভিন্ন প্রকৌশল সংস্থা কর্র্তৃক অভিজ্ঞ প্রকৌশলীর সমন্বয়ে যৌথ পরিমাপ টিম ও মনিটরিং টিম গঠন করা। এসব টিম গঠন করা হলে ওয়াসা কর্র্তৃপক্ষ ও ঠিকাদাররা প্রকল্পকাজ যথাসময়ে যথাযথভাবে সম্পাদনের বিষয়ে মনোযোগী হবেন। এতে সময় ও অর্থ অপচয়সহ দুর্নীতি অনেকাংশে কমে যাবে।
প্রকল্পের প্রাক্কলন তৈরির সময় কাজের যথার্থতা ও উপযোগিতা আছে কি না তা ওয়াসা কর্র্তৃপক্ষকে নিশ্চিত হতে হবে এবং বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় যাতে অহেতুক না বাড়ানো হয়, সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি আরোপ প্রয়োজন।
সুপারিশে আরও বলা হয়েছে, দরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে মূল্যায়ন কমিটিতে দাতা সংস্থার প্রতিনিধিসহ টেন্ডার ও ক্রয়কার্য যথাযথ হচ্ছে কি না তা মনিটরিং করার জন্য মন্ত্রণালয়ভিত্তিক শক্তিশালী টিম গঠন করা যেতে পারে।
সুপারিশে বলা হয়েছে, প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নের সময় ওয়াসার ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষ একাধিকবার প্রকল্প পরিদর্শনসহ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে পারে। ঠিকাদারকে বিল পরিশোধের আগে সুনিশ্চিত হতে হবে যে, দরপত্রের শর্তানুযায়ী ঠিকাদার প্রকল্পকাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করেছে। এ ছাড়া ঠিকাদার যতটুকু কাজ করছে তার গুণগত মান যাচাইয়ের ওপরই তার বিল পরিশোধ করতে হবে। ব্যক্তি মালিকানাধীন গভীর নলকূপ স্থাপন, মিটার রিডিং ও রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে ওয়াসা কর্র্তৃক ম্যানুয়াল পদ্ধতির ব্যবহার পরিহার করে সহজতর ডিজিটাল পদ্ধতিতে মিটার রিডিংয়ের ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। অবৈধ ওভারটাইম বিল রোধকল্পে ঢাকা ওয়াসার কর্মচারীদের জনবল কাঠামো সুনির্দিষ্ট করা প্রয়োজন এবং বেতনের সঙ্গে ওভারটাইম বিলের সমন্বয়সাধনসহ সুনির্দিষ্ট বিধিমালা প্রণয়ন করা।
সুপারিশে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পকাজ বাস্তবায়নের জন্য ঢাকা ওয়াসার কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, যেমনÑ ঢাকা সিটি করপোরেশন, সওজ, বিদ্যুৎ বিভাগ ইত্যাদির সঙ্গে সুষ্ঠু সমন্বয় সাধন করা। ঢাকা ওয়াসার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনয়নের লক্ষ্যে গণমাধ্যম, দুদক, অডিট বিভাগসহ নজরদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পৃক্ততা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
দুর্নীতি প্রতিরোধের লক্ষ্যে সেবা গ্রহীতাদের নিয়ে ঢাকা ওয়াসায় মাঝে মাঝে গণশুনানির আয়োজন করা যেতে পারে।
ঢাকা ওয়াসার বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নাধীন অবস্থায় বিভিন্ন প্রকৌশলী সংস্থার বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে গঠিত সার্ভিলেন্স টিম কর্র্তৃক আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করা যেতে পারে।
বিভিন্ন প্রকার ক্রয়ে প্রতিযোগিতামূলক প্রকাশ্য বা ই-টেন্ডারিং, দরপত্র আহ্বান থেকে শুরু করে কার্যাদেশ প্রদান ও প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় অভিজ্ঞ সিনিয়র কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব প্রদান করা যেতে পারে। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় বুয়েটসহ অন্যান্য পেশাদার সংস্থাকে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে।
