দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির ১ লাখ ৪৩ হাজার ৭২৭ টন কয়লা সিস্টেম লস নয়, আত্মসাৎ হয়েছে বলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তে উঠে এসেছে। দুদকের তদন্ত অনুযায়ী, এই আত্মসাতে জড়িত ছিলেন বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের সাবেক সাত ব্যবস্থাপনা পরিচালক তথা এমডিসহ উচ্চ পর্যায়ের বর্তমান ও সাবেক ২৩ কর্মকর্তা। তাদের বিরুদ্ধে গতকাল রবিবার
অভিযোগপত্র অনুমোদন দিয়েছে দুদক। কমিশনের উপপরিচালক সামছুল আলমের করা তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী এই ২৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র অনুমোদন দেওয়া হয়। দুদকের উপপরিচালক প্রণব কুমার ভট্টাচার্য বিষয়টি জানিয়েছেন।
দুদকের নথি অনুযায়ী, বড়পুকুরিয়া খনির কয়লা আত্মসাতের ঘটনা কর্র্তৃপক্ষের প্রথম নজরে আসে গত বছরের জুনে। ওই সময় বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্র্তৃপক্ষ জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কাছে কয়লা সরবরাহে ঘাটতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে। দেশের একমাত্র কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বড়পুকুরিয়ার খনি থেকেই কয়লা সরবরাহ করা হয়। সেখানে কয়লা গায়েব হওয়ার অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করে ১৯ জনের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের ২৪ জুলাই মামলা করা হয়। ওই আসামিদের মধ্যে পাঁচজনকে অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন ১০ কর্মকর্তা। খনি কর্র্তৃপক্ষের দায়ের করা মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে ১ লাখ ৪৩ হাজার ৭২৭ টন কয়লা খোলাবাজারে বিক্রি করে ২৪৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়।
গতকাল অনুমোদন হওয়া অভিযোগপত্রে যাদের আসামি করা হচ্ছে, তাদের সবাই বড়পুকুরিয়া কোলমাইনিং কোম্পানির বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা। মামলার আসামিরা হলেনÑ সাময়িক রবখাস্ত হওয়া মহাব্যবস্থাপক (মাইন অপারেশন) আবু তাহের মো. নূর-উজ-জামান চৌধুরী, উপমহাব্যবস্থাপক (স্টোর ডিপার্টমেন্ট) এ কে এম খালেদুল ইসলাম, সাময়িক রবখাস্ত থাকা সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী হাবিব উদ্দিন আহাম্মদ, প্রাক্তন কোম্পানি সচিব ও মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) এবং বর্তমানে পশ্চিমাঞ্চলীয় গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক আবুল কাসেম প্রধানীয়া, ব্যবস্থাপক (জেনারেল সার্ভিসেস) মাসুদুর রহমান হাওলাদার, মহাব্যবস্থাপক (প্রোডাকশন ম্যানেজমেন্ট) অশোক কুমার হালদার, ব্যবস্থাপক (মেইনটেনেন্স অ্যান্ড অপারেশন) মো. আরিফুর রহমান, উপব্যবস্থাপক (কোল হ্যান্ডেলিং ম্যানেজমেন্ট) মুহাম্মদ খলিলুর রহমান, উপব্যবস্থাপক (মেইনটেনেন্স অ্যান্ড অপারেশন) মো. মোর্শেদুজ্জামান, উপব্যবস্থাপক (প্রোডকশন ম্যানেজমেন্ট) মো. হাবীবুর রহমান, উপব্যবস্থাপক (মাইন ডেভেলপমেন্ট) মো. জাহেদুর রহমান, সহকারী ব্যবস্থাপক (ভেন্টিলেশন ম্যানেজমেন্ট) সত্যেন্দ্র নাথ বর্মণ, ব্যবস্থাপক (নিরাপত্তা) সৈয়দ হাসান ইমাম, উপমহাব্যবস্থাপক (মাইন প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) জোবায়ের আলী, প্রাক্তন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুবুর রহমান, বড়পুকুরিয়া কোলমাইনিং কোম্পানির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল আজিজ খান, প্রাক্তন ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী খুরশীদুল হাসান, প্রাক্তন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বর্তমানে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী কামরুজ্জামান, প্রাক্তন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিনুজ্জামান, প্রাক্তন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বর্তমানে মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এস এম নূরুল আওরঙ্গজেব, বড়পুকুরিয়া কোলমাইনিং কোম্পানির সাবেক মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) শরিফুল আলম, সহকারী মহাব্যবস্থাপক (পিএম) মো. মনিরুজ্জামান, কোল হ্যান্ডেলিং ম্যানেজমেন্ট শাখার ব্যবস্থাপক শোয়েবুর রহমান।
মামলায় এজাহারভুক্ত পাঁচ আসামিকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তারা হলেন ব্যবস্থাপক (এক্সপ্লোরেশন) মোশাররফ হোসেন সরকার, ব্যবস্থাপক (ডিজাইন, কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড মেইনটেইন্যান্স) জাহিদুল ইসলাম, উপব্যবস্থাপক (সেইফটি ম্যানেজমেন্ট) একরামুল হক, প্রাক্তন মহাব্যবস্থাপক (অর্থ ও হিসাব) আবদুল মান্নান পাটোয়ারী ও মহাব্যবস্থাপক (অর্থ ও হিসাব) গোপাল চন্দ্র সাহা।
তদন্ত কর্মকর্তা জানান, মামলার পরপরই ১৯ জনের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। তদন্ত পর্যায়ে দুদক দল সাত সাবেক এমডিসহ ৩২ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তারা একে অপরের কাঁধে দায় চাপিয়ে নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করেন।
