জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা রদ করতে ভারতের সংবিধান থেকে ৩৭০ ধারা বাতিল করেছে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। গতকাল মঙ্গলবার ভারতের লোকসভাতেও ‘জম্মু-কাশ্মীর পুনর্গঠন বিল’ পাস হয়। এই বিল পাস হওয়ার মধ্য দিয়ে জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো।
গতকাল লোকসভায় জম্মু-কাশ্মীর পুনর্গঠন বিল ২০১৯ উত্থাপনের সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেন, ‘জম্মু-কাশ্মীর যে চিরকাল ভারতেরই থাকবে, এই বিল তা নিশ্চিত করবে। কাশ্মীর হলো ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আমি যখন জম্মু-কাশ্মীর নিয়ে কথা বলি, তখন পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর ও আকসাই চিনও এ আলাপের মধ্যেই পড়ে।’
৩৭০ ধারাটি বাতিল করার পর থেকে দেশের অন্যান্য জায়গার সঙ্গে অঞ্চলটির যোগাযোগ একেবারেই বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। গত রবিবার সন্ধ্যা থেকে বন্ধ করা ইন্টারনেট ও টেলিফোন নেটওয়ার্ক এখনো সচল হয়নি। জম্মু-কাশ্মীরের বিভিন্ন সড়কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাজার হাজার সদস্যের টহল অব্যাহত আছে। পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত নিয়ে উত্তেজনা ও সন্ত্রাসীদের তৎপরতার কারণে জম্মু-কাশ্মীরে স্বাভাবিকভাবেই বিপুল পরিমাণ সেনা মোতায়েন থাকে। সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ অনুচ্ছেদ ৩৭০ বাতিল করার পর সেখানে আরও অতিরিক্ত আট হাজার সৈন্য পাঠানো হয়। পর্যটক এবং হিন্দু তীর্থযাত্রীদের আগেই এলাকাটি ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখা হয়। পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে এই বিবেচনায় স্থানীয় বাসিন্দারা গত কয়েক মাস ধরেই খাদ্য মজুদ করে রাখছিল। এমন অবস্থায় কবে নাগাদ জম্মু-কাশ্মীরে টেলিফোন ও ইন্টারনেট যোগাযোগ চালু হবে তা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ভারতের কোনো প্রান্ত থেকেই ওই অঞ্চলে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।
এই সময়ের মধ্যে জম্মু ও কাশ্মীরে কোনো চিঠিও পাঠানো যাবে না। শুধু চিঠি নয়, নিষেধাজ্ঞা রয়েছে সব ধরনের পার্সেল নিয়েও। পূর্ব ভারতের পোস্টমাস্টার জেনারেল নিরজ কুমার জানিয়েছেন, এ বিষয়টি অভ্যন্তরীণ। তাই তিনি এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করবেন না। বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিসও আপাতত জম্মু ও কাশ্মীরে তাদের পরিষেবা বন্ধ রেখেছে বলে ভারতের ডাক বিভাগ সূত্র জানিয়েছে। এই নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, জম্মু ও কাশ্মীরে ইতোমধ্যেই অনেক চিঠি পাঠানো হয়ে থাকতে পারে। হয়তো দুদিন আগেই কোনো চিঠি বা পার্সেল পাঠানো হয়েছে। সেগুলো সেভাবেই আটকা থাকবে। এ ধরনের সব চিঠি ও পার্সেল কাশ্মীরে না পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শ্রীনগরে বিবিসির প্রতিনিধি আমির পীরজাদা জানান, ‘রাজ্যের অন্য অংশে কী হচ্ছে কেউ জানে না। আমরা কারও সঙ্গে কথাও বলতে পারছি না। মানুষজন উদ্বিগ্ন, তারা জানে না কী ঘটছে। তারা জানে না কী ঘটতে যাচ্ছে।’ ভারতের অন্যান্য অংশে থাকা কাশ্মীরিরাও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে না।
বিশেষ সুবিধা বাতিলের পর সোমবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে রাজ্যটির দুই সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ ও মেহবুবা মুফতিকে। কাশ্মীরের পিপলস কনফারেন্সের দুই নেতা সাজ্জাদ লোন ও ইমরান আনসারিকেও বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। রবিবার মধ্যরাত থেকেই গৃহবন্দি ছিলেন তারা।
সাবেক দুই মুখ্যমন্ত্রীর ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। গতকাল মঙ্গলবার তিনি বলেন, ‘তারা কেউ জঙ্গি নন। কেন্দ্রীয় সরকারকে বলব, সবাইকে নিয়েই চলতে হবে। গণতন্ত্রের স্বার্থেই তাদের অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া উচিত। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে বিল পাস করানো হয়নি। বিলের যোগ্যতা নিয়ে নয়, তবে পাস করানোর পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।’
এদিকে কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি রাহুল গান্ধী মঙ্গলবারের টুইটবার্তায় বলেন, ‘সংবিধান লঙ্ঘন করে, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জেলে পুরে ও জম্মু-কাশ্মীরকে দ্বিখণ্ডিত করে জাতীয় সংহতিকে শক্তিশালী করা যায় না। শুধু কিছু জমির খণ্ড দেশকে গড়ে তোলেনি, দেশ গড়ে তুলেছেন দেশের নাগরিকরাই। প্রশাসনিক ক্ষমতার এ অপব্যবহার দেশের নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক।’
১৯৪৭ সালের পর থেকেই ভারত ও পাকিস্তান উভয়ই কাশ্মীরকে নিজেদের বলে দাবি করে আসছে। ৩৭০ অনুচ্ছেদ জম্মু ও কাশ্মীরকে স্বায়ত্তশাসন দিয়েছিল। এর ফলে কাশ্মীরিদের নিজস্ব সংবিধান, আলাদা পতাকা ও স্বতন্ত্র আইন বানানোর অধিকার ছিল। রাজ্যটির কেবল পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে।
