প্রথমবারের মতো দেশের রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ধরা হলো। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পণ্য ও সেবা রপ্তানি করে ৫৪ বিলিয়ন ডলার আয় করার লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। পণ্য রপ্তানি থেকে ৪৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন আর সেবা রপ্তানি থেকে ৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। মোট রপ্তানি আয়ের এই লক্ষ্যমাত্রা গত অর্থবছরের তুলনায় ১৫ দশমিক ২০ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরে মোট রপ্তানি আয় ছিল ৪৬ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার। রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে দেশে বিনিয়োগ সহজ করার চেষ্টা সফল হলে এবং প্রধান শিল্প খাতগুলোতে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করার নানা উদ্যোগ যথাযথভাবে এগোলে অর্ধশত বিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানি আয়ের এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন খুব কঠিন হওয়ার কথা নয় বলে বিশ্বাস করেন ব্যবসায়ীরাও।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তৈরি পোশাক খাতের ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী কারখানার নানা সংস্কার সাধন করা হয়েছে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধ এবং নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা করে রাশিয়ার অর্থনীতির চাঙ্গাভাবে বিশ্ববাজারে সম্প্রতি যে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছেÑ তাও বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বাড়াতে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা। রপ্তানি আয়ের এ লক্ষ্যকে অর্জনযোগ্য বলে মনে করছেন দেশের রপ্তানি খাতের শীর্ষ উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দও। এজন্য সরকারের সহযোগিতার পাশাপাশি বন্দর ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমানোর যে ঘোষণা মুদ্রানীতিতে দেওয়া হয়েছে, তা দূর করার ওপর বিশেষভাবে জোর দিয়েছেন উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ।
পণ্য রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ৮৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ বা ৩ হাজার ৮২০ কোটি ডলার আসবে দেশের প্রধান রপ্তানিপণ্য তৈরি পোশাক খাত থেকে। এ খাতে ১১ দশমিক ৯১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে। এ ছাড়া চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে ১০৯ কোটি ডলার, কৃষিজাত পণ্য থেকে ১১২ কোটি ডলার, পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে ৮২ কোটি ডলার, হোম টেক্সটাইল থেকে ৮৯ কোটি ডলার, হিমায়িত মাছ থেকে ৫২ কোটি ডলার, প্রকৌশল পণ্য থেকে ৩৭ কোটি ডলার, প্লাস্টিক পণ্য থেকে ১৫ কোটি ডলার, সিরামিক পণ্য থেকে ৯ কোটি ডলার এবং ওষুধ রপ্তানি থেকে ১৭ কোটি ডলার আয় হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সেবা খাত থেকে মোট ৮৫০ কোটি ডলার আয়ের লক্ষ্য সরকারের, যা আগের অর্থবছরের আয়ের চেয়ে ৩৪ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি। সরকারি সেবা, পরিবহন, টেলিকমিউনিকেশন ও তথ্যসেবা, ভ্রমণ, কম্পিউটার সেবা থেকে এই আয় হবে বলে আশা করছে সরকার।
এখানে লক্ষণীয় যে, রপ্তানি আয়ের এই লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৮৫ শতাংশই তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মোট পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৪ হাজার ৫৪ কোটি ডলার। যার মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের হিস্যাই ছিল প্রায় ৮৪ শতাংশ। বিগত দুই দশকে দেশের রপ্তানি আয়ে তৈরি পোশাক খাতের হিস্যা যেমন ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে তেমনি বৈশ্বিক পোশাকের বাজারে বাংলাদেশের হিস্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। ২০০০ সালে পোশাক বাজারে বাংলাদেশের হিস্যা ছিল আড়াই শতাংশের কিছু বেশি। গত বছর তা বেড়ে সাড়ে ৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এতে পোশাক রপ্তানিতে একক দেশ হিসেবে বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। পক্ষান্তরে চামড়া, হোম টেক্সটাইল, পাট, চিংড়িসহ অন্যান্য রপ্তানি খাত একই গণ্ডির মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। পাশাপাশি নতুন রপ্তানি পণ্য ও সেবা উদ্ভাবনে নানা প্রয়াস সত্ত্বেও উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য আসেনি।
গড় হিসাবে গত এক দশক ধরে দেশের রপ্তানি আয়ে দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি ঘটছে। গত সপ্তাহে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিভিউ-২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধির হিসাবে বাংলাদেশের অবস্থান এখন দ্বিতীয়। বাংলাদেশের ওপরে আছে কেবল ভিয়েতনাম। বিশ্ববাণিজ্যে বাংলাদেশ এখন ৪২তম বড় রপ্তানিকারক দেশ, অন্যদিকে আমদানিতে বাংলাদেশের অবস্থান ৩০তম। তবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রপ্তানি খাতের হিস্যা এখনো কম। ডব্লিউটিওর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের জিডিপিতে পণ্য ও সেবা রপ্তানি খাতের অবদান এখন ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থনীতির সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দেশে রয়েছে। এখন প্রয়োজন এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপসমূহের যথাযথ বাস্তবায়ন। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে এই অগ্রযাত্রাকে ধরে রাখতে জোর দেওয়া প্রয়োজন নতুন রপ্তানি পণ্য ও সেবা উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানোয়। পাশাপাশি রপ্তানিমুখী পণ্য ও সেবা খাতের নতুন উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা প্রয়োজন।
