দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কিছুটা কমলেও গত পাঁচ দিনে আরও ১৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। যদিও ঈদের দিনের চেয়ে পরের দিন আক্রান্তের সংখ্যা দেড়গুণেরও বেশি বেড়েছে। আর দেশ রূপান্তরের হিসাবে চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা ৯৫ জন। গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে ৪০ জনের মৃতের খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। এ ছাড়া শনিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৭ হাজার ৫০৭ জন। এর মধ্যে মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৮৮০ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে এ তথ্য জানা যায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, গতকাল বুধবার সকাল পর্যন্ত শেষ ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় ৭৫৫ জন এবং ঢাকার বাইরে ১ হাজার ১২৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, যা আগের দুই দিনের তুলনায় কিছুটা কম। মঙ্গলবার সকাল ৮টায় পর্যন্ত শেষ ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল ২ হাজার ৩৩৪ জন এবং সোমবার ভর্তি হয়েছিল ২ হাজার ৯৩ জন। এর আগের দিন অর্থাৎ শনিবার সকাল ৮টা থেকে রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত হাসপাতালে নতুন ভর্তি হয়েছিল ১ হাজার ২০০ জন। যা আগস্টে সর্বনিম্ন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আরও জানায়, চলতি বছর বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সারা দেশে ৪৬ হাজার ৩৫১ জন ডেঙ্গু রোগী দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এখনো হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে ৭ হাজার ৮৬৯ জন। এর মধ্যে ঢাকায় ৪ হাজার ১৪৩ এবং ঢাকার বাইরে ৩ হাজার ৭২৬ জন। এখন পর্যন্ত ৩৮ হাজার ৪৪২ জন চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় ৭৫৫, ঢাকা বিভাগের অন্যান্য জেলায় ২৭৩, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৯৪, খুলনা বিভাগে ১৬৫, রংপুরে ১১৪, রাজশাহীতে ১৩২, বরিশাল বিভাগে ১৫৬, সিলেট বিভাগে ২১, ময়মনসিংহ বিভাগে ৭০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে হাসপাতালে। এই সময়ে সারা দেশে ১ হাজার ৫৫৮ জন ডেঙ্গু রোগী সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে।
আরও ১৫ জনের মৃত্যু : ঈদের ছুটিতে গ্রামে বেড়াতে গিয়ে ও ঢাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও ১৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। গ্রামে মৃতদের মধ্যে বেশিরভাগই ঢাকা থেকে ডেঙ্গু নিয়ে গ্রামে যান বলে আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য থেকে জানা গেছে।
মাদারীপুরের শিবচরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হাজি আবদুল মজিদ (৭৫) এক সপ্তাহ চিকিৎসাধীন থাকার পর মঙ্গলবার নিজ বাড়িতে মারা যান। আবদুল মজিদের ছেলে জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, তার পিতার এক সপ্তাহ চিকিৎসা চলছিল। রক্তে প্লাটিলেটের পরিমাণ কমে ২০ হাজারে নেমে আসে।
ডেঙ্গুতে মাহফুজুর রহমান (২০) নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু এক ছাত্র মঙ্গলবার মধ্যরাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। মাহফুজ পাবনা সদর উপজেলার চররামানন্দপুর গ্রামের গোলাম মোস্তফার ছেলে। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. আকসাদ আল মাসুর আনন জানান, মঙ্গলবার বিকেলে তাকে গুরুতর অবস্থায় পাবনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রাতেই তার মৃত্যু হয়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) মঙ্গলবার সকালে বাপেক্সের ব্যবস্থাপক (প্রকৌশলী-খনন) মারা যান। তার গ্রামের বাড়ি রাজবাড়ীর পাংশায়। তিনি ঈদের দিন হাসপাতালে এলে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছিল।
রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে সামিয়া নামে আট বছরের এক শিশু মঙ্গলবার ভোরে মারা যায়। সামিয়ার পরিবার রাজধানীর তালতলায় থাকত। গত ১০ আগস্ট তাকে গুরুতর অবস্থায় ওই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।
ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে তানজিদ মোল্লা (৯) নামে এক শিশু ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মঙ্গলবার দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। তানজিদ ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার মাঝকান্দি এলাকার বাসিন্দা ভ্যানচালক জাহিদ মোল্লার ছেলে। শিশুটির ফুফু রিনা বেগম জানান, তিন দিন জ্বরে ভোগার পর ১১ আগস্ট রবিবার তানজিদকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
ডেঙ্গুতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার ক্রাইম ইউনিটের কনস্টেবল জামাল আহমেদ সোমবার রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তিনি কিশোরগঞ্জ শহরের বত্রিশ মনিপুরঘাট এলাকার বাসিন্দা। তার বাবার নাম আবদুল মান্নান। চার ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। তার স্ত্রী ও দুই ছেলে রয়েছে। প্রথমে তাকে উত্তরার একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। মঙ্গলবার বাদ জোহর কিশোরগঞ্জ শহরের বত্রিশ মনিপুরঘাট জামে মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
লালমনিরহাট প্রতিনিধি জানান, ডেঙ্গু নিয়ে বাড়ি ফেরার পর রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রবিবার মনিরুল ইসলাম মারা যান। তার বাড়ি লালমনিরহাট জেলায়। হাসপাতালটির মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক শাহাদুজ্জামান বলেন, রবিবার বিকেলে মনিরুল হাসপাতালে এলে তাকে ভর্তি করানোর কিছুক্ষণ পরই মারা যান।
সোমবার ভোরে রাজধানীর আসগর আলী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অভিজিৎ সাহা (১১) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সে নারায়ণগঞ্জ শহরের আমলাপাড়ার মন্টু সাহার ছেলে। অভিজিৎ চাষাঢ়ায় মাউন্টেন স্কুলে পড়াশোনা করত। সোমবার তার রক্তবমি হলে প্রথমে নারায়ণগঞ্জের একটি হাসপাতালে এবং অবস্থার অবনতি হলে আসগর আলী হাসপাতালে তাকে ভর্তি করানো হয়।
জেলার কমলনগর উপজেলায় সোমবার সন্ধ্যায় আশিকুর রহমান পরশ নামে চার বছরের এক শিশু নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যায়। আশিকুর উপজেলার চরজাঙ্গালিয়া এলাকার কামারুজ্জামান পাটোয়ারীর ছেলে। ১০ আগস্ট জ্বরে আক্রান্ত হলে তাকে লক্ষ্মীপুরের একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে ডেঙ্গুর প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। সোমবার অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়।
ঢাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে গ্রামে যাওয়ার পর রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঈদের দিন আবদুল মালেক (১৯) নামে একজন মারা যান। গ্রামে তিনি প্রথমে চাঁপাইনবাবগঞ্জে চিকিৎসা নিয়েছিলেন। অবস্থার অবনতি হলে গতকাল রাজশাহী মেডিকেলে এনে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়েছিল।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর রমনা পার্কের পরিচ্ছন্নতা কর্মী রাসেল (৩২) ঈদের দিন (সোমবার) বিকেলে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। রাসেল গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার নারকেলবাড়ি গ্রামের সেলিমের ছেলে। তার স্বজনরা জানান, ঢাকায় ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে রাসেল গোপালগঞ্জের ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। অবস্থার অবনতি হলে ১০ আগস্ট তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।
নোয়াখালীতে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে আমির হোসেন (৬০) নামে এক বৃদ্ধ রবিবার নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। শনিবার গভীর রাতে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাকে ওই হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল। তার বাড়ি লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ থানার দত্তপাড়া এলাকায়।
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে ফরহাদ আহমেদ (২০) নামে এক শিক্ষার্থী রবিবার দুপুরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ফরহাদ কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল সরকারি কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার বাড়ি কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার বড়িবাড়ি এলাকায়। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ফরহাদকে প্রথমে কিশোরগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল।
রাজধানীর ধানম-ির একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মেহরিমা নামে এক শিশু মারা গেছে। তার বাবা নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের ভাওয়ালিয়া এলাকার ব্যবসায়ী মোজাম্মেল বেপারি। মেহরিমার বাবা জানান, চার দিন জ্বরে ভোগার পর তাকে ওই হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা ডেঙ্গু আক্রান্তের কথা জানান। পরে সেখানেই তাকে ভর্তি করা হয়েছিল।
কুমিল্লার হোমনা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা ফাতেমা আক্তার সোনিয়া (২৬) ডেঙ্গু আক্রান্ত বাবার চিকিৎসা ও সেবা করতে এসে নিজেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রবিবার মারা গেছেন। তিনি হোমনা সদরের সরকার বাড়ির মাস্টার মো. মোকবল হোসেনের মেয়ে। তার পিতা এখনো হাসপাতালে ভর্তি।
