দুই নাতনি জাফিয়া রহমান ও জাহিয়া রহমানসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঈদের দিন দুপুরের খাবার খেলেন কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান তার জন্য ঈদের খাবার রান্না করেছিলেন। সেই খাবার নিয়ে ঈদের দিন গত সোমবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালের ষষ্ঠ তলায় ৬২১ নম্বর কেবিনে যান তারা। এসময় শর্মিলা রহমান ও তার দুই মেয়ের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ছিলেন খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দার, ভাইয়ের স্ত্রী কানিজ ফাতিমা ও ছেলে অভিক ইস্কান্দার।
দুপুর পৌনে ২টার দিকে তারা খালেদা জিয়ার কেবিনে পৌঁছান। প্রথমেই দুই নাতনি তার দাদির পা ছুঁয়ে সালাম করেন। এ সময় তাদের বুকে জড়িয়ে ধরেন বেগম জিয়া। তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল। খালেদা জিয়ার সঙ্গে প্রায় ২ ঘণ্টা সময় পার করেন তারা।
সেখান থেকে বেরিয়ে পরিবারের সদস্যরা দেশ রূপান্তরকে জানান, বেগম জিয়া মুখে ব্যথার কারণে শক্ত খাবার খেতে পারেন না। তাই নরম করে ঝাল কম দিয়ে রান্না করা কোরবানির মাংস নেওয়া হয়েছিল তার জন্য। শাশুড়ির জন্য এই মাংস নিজ হাতে রান্না করেছেন ছোট ছেলে মরহুম আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান। অন্য খাবারের মধ্যে ছিল পোলাও, মাংসের রেজালা, আলুর চপ, সবজি, জর্দা, দুধ-সেমাই ও মিষ্টি। এছাড়া তারা খালেদা জিয়ার জন্য ফুলের একটি তোড়া ও ঈদের শাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন।
তারা জানান, খালেদা জিয়া সবার কাছ থেকে পরিবারের অন্যদের খোঁজখবর নেন। দেশে কী হচ্ছে, কী পরিস্থিতি তা জানতে চান। এ সময় এক আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এরপর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে হুইল চেয়ারে বসেই খাওয়া-দাওয়া করেন খালেদা জিয়া।
কারা কর্তৃপক্ষের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, একজন ডিভিশনপ্রাপ্ত (বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত) বন্দি হিসেবে ঈদের দিন হাসপাতালে খালেদা জিয়ার জন্য বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা করেছিল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ। ঈদের দিন সকালে বিএসএমএমইউর ৬২১ নম্বর কেবিনে খালেদা জিয়ার জন্য পায়েস, সেমাই আর মুড়ি দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকের পরামর্শ মতে তার ডায়েট চার্ট আনুযায়ী কম চিনি দিয়ে তৈরি করা হয় এ খাবার। দুপুর ১২টা থেকে সাড়ে ১২টার মধ্যে খালেদার কেবিনে পৌঁছে দেওয়া হয় দুপুরের খাবার। তাতে দেওয়া হয় ভাত ও পোলাওয়ের সঙ্গে ডিম, রুই মাছ, মাংস আর আলুর দম। তবে তিনি পরিবারের সদস্যদের নেওয়া খাবারই খেয়েছেন।
পরিবারের সদস্যদের উদ্ধৃত করে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাতে আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক। কারণ বেগম জিয়া শুধু একজন রাজনীতিবিদ নন। এর বাইরে তিনি একজন মা, একজন দাদি। বৃদ্ধ নারী। এই বয়সে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যেভাবে তার সময় কাটানোর কথা ছিল বাস্তবে তিনি তা পারছেন না। স্বভাবই হঠাৎ সাক্ষাতে এমন হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হওয়ারই কথা। বাস্তবে তাই-ই হয়েছে।
৭৪ বছর বয়সী খালেদা জিয়া ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস ছাড়াও দাঁত ও চোখের সমস্যায় ভুগছেন। তাকে চলাচল করতে হয় হুইল চেয়ারে করে। ডায়াবেটিসের কারণে প্রতিদিন তার ইনসুলিন নিতে হয়। গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ৫ বছরের জন্য দন্ডিত হন খালেদা জিয়া। এরপর চলতি বছরের পহেলা এপ্রিল তাকে চিকিৎসার জন্য বিএসএমএমইউতে আনা হয়। এর আগে রোজার ঈদও তিনি এখানেই করেছিলেন।
স্বজনরা ছাড়াও হাসপাতালে নেত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ, মহিলা দল নেত্রী সাবিনা ইয়াসমীনসহ দশ-পনেরজন নেতাকর্মী। ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মীও সেখানে ছিলেন। তাদের অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। তবে স্বজনদের ছাড়া কাউকে সাক্ষাৎ করতে দেয়নি কারা কর্তৃপক্ষ।
রাজপথে বিএনপির মিছিল : ঈদের দিন দুপুরে খালেদা জিয়ার কারামুক্তির দাবিতে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে মিছিল নিয়ে রাস্তায় নামেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। বিক্ষোভ মিছিলে নেতৃত্ব দেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। মিছিলটি নাইটিঙ্গেল মোড় ঘুরে আবার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের কাছে গিয়ে শেষ হয়। মিছিল শেষে সংক্ষিপ্ত ভাষণে রিজভী বলেন, ‘খালেদা জিয়ার ভয়াবহ অসুস্থতার পরও এই সরকার তার প্রতি আরও হিংস্র হয়ে উঠেছে। তাকে অন্যায় ও অবিচারমূলকভাবে কারাগারে বন্দি রাখা হয়েছে। চিকিৎসার সুযোগ না দিয়ে প্রতিনিয়ত বিভিন্নভাবে তার জামিনেও বাধা সৃষ্টি করছে এই প্রতিহিংসাপরায়ণ সরকার। ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার খালেদা জিয়াকে কারাবন্দি রেখে তিলে তিলে নিঃশেষ করতে চায় এ সরকার।
