মিয়ানমারের ফাঁদে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০১৯, ০৩:৫২ এএম

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনে দেশটির রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে  বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ৭ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গার মধ্যে মাত্র ৩ হাজার ৫৪০ জন রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসনের প্রস্তুতি নিয়েছে দেশটি। আগামী বৃহস্পতিবার (২২ আগস্ট) প্রত্যাবাসন হবে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রয়টার্সে ঘটা করে খবর প্রকাশ হয়েছে মিয়ানমার সরকারের বরাতে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে বাংলাদেশ বরাবরের মতো এবারও ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। যদিও ২২ আগস্টের দিনক্ষণ নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের কিছুই চূড়ান্ত হয়নি বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

আমাদের কক্সবাজার ও উখিয়া প্রতিনিধি রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো সরেজমিন ঘুরে জানান, সাড়ে ৩ হাজারের তালিকায় কারা কারা আছে তা জানে না তারা। তবে ২২ আগস্ট প্রত্যাবাসন হচ্ছে এমন খবরে আতঙ্ক ও অস্থিরতা বিরাজ করছে শিবিরগুলোতে। আবার শিবিরের সরদার গোছের রোহিঙ্গারা এর-ওর নাম রয়েছে বলে অনেকের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মহলের চোখ এড়াতে মিয়ানমারের এই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ঘোষণা দেওয়া একটা ফাঁদ। তারা বলেন, মিয়ানমার এটি আগেও করেছে। ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসেও একবার তারা প্রত্যাবাসনের তারিখ দিয়েছিল। যে শর্তে প্রত্যাবাসনÑ রাখাইনে তার কোনো ব্যবস্থাই করেনি দেশটি। যখনই রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘসহ প্রভাবশালী দেশগুলো আলাপ-আলোচনা শুরু করে তখনই নেপিদো থেকে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে নানা খবর প্রকাশিত হতে থাকে। প্রত্যাবাসনে মিয়ানমার যে কতটা আন্তরিক সেটি তারা বলতে থাকে। বাংলাদেশের কারণেই প্রত্যাবাসন হচ্ছে না।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন,  রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে তিন মাস ধরে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। জাতিসংঘ সব সুযোগ-সুবিধা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। আবার রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীন ও ভারতের বাংলাদেশের পক্ষে নমনীয় মনোভাবও কিছুটা প্রভাব ফেলেছে। তাই দেশটি নামমাত্র প্রত্যাবাসনের জিগির তুলেছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, মিয়ানমারের এই ফাঁদ সম্পর্কে বাংলাদেশও ওয়াকিবহাল। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের কৌশল হলো, সব সময় প্রত্যাবাসনের জন্য প্রস্তুত থাকা।

এ ব্যাপারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রত্যাবাসনের জন্য আমরা সব সময় প্রস্তুত। মিয়ানমারের সঙ্গে এ নিয়ে কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে। আমরা তালিকা পাঠিয়েছি। পর্যায়ক্রমে আরও তালিকা পাঠানো হবে। আমরা শান্তিপূর্ণ সমাধান চাই। দুই দেশের মধ্যকার হওয়া চুক্তি অনুযায়ী প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের কোনো সমস্যা নেই। বৃহস্পতিবার প্রত্যাবাসন হচ্ছে কি না, এ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, দিনক্ষণ সম্পর্কে বলতে পারব না।

পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, মিয়ানমার দিনক্ষণ ঘোষণার আগেই আমরা প্রস্তুত। যত তাড়াতাড়ি  রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে যেতে পারবে, ততই বাংলাদেশের জন্য ভালো। তবে বৃহস্পতিবার প্রত্যাবাসন হবে কি না তা সচিব বলতে পারেননি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, গত বছরের জানুয়ারি মাসেও মিয়ানমার এরকম নাটক করেছিল। বাংলাদেশ এই ফাঁদে পা দেয়নি। সে সময়ই টেকনাফে প্রত্যাবাসনের জন্য ক্যাম্প করা হয়েছিল। কিন্তু প্রত্যাবাসনের ঠিক আগে আগে দেশটি রাখাইনে আবারও অভিযান চালায়। ফলে রোহিঙ্গারা কেউই ফিরে যেতে রাজি হয়নি। এখনো প্রত্যাবাসন চুক্তি অনুযায়ী রাখাইনে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ আবাসন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেনি দেশটি। প্রত্যাবাসনে সমন্বয়ক সংগঠন ইউএনএইচসিআরকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিষয়টি তারাই যাচাই-বাছাই করুক। তিনি জানান, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ২২ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা দেওয়া হয়েছে। এখন মিয়ানমার যদি মাত্র সাড়ে ৩ হাজার নিয়ে কথা বলে, তাহলে বাংলাদেশের পক্ষে আগানো সম্ভব হবে না।

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও কূটনৈতিক বিশ্লেষক ওয়ালি উর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, মিয়ানমার দায়সারা গোছের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে চায় না। কিন্তু আন্তর্জাতিক চাপ পাশ কাটাতে ষড়যন্ত্রে নেমেছে। সরকারেরও এই ফাঁদে পা দেওয়া উচিত হবে না। প্রত্যাবাসন করতে হলে জাতিসংঘকে সঙ্গে নিয়ে করাই ভালো।

বিশ্লেষক তারেক শামসুর রেহমান বলেন, মিয়ানমার একটা ফাঁদ পেতেছে। কারণ তারা জানে এখন যে পরিস্থিতি চলছে তাতে রাখাইনে যেতে চাইবে না রোহিঙ্গারা। তারা দায় এড়ানোর ফন্দি করছে। এ ব্যাপারে আমাদের সরকারের অবস্থানও ভালো।

আগামী ২২ আগস্ট শুরু হচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রয়টার্স একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। মিয়ানমার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মিন্ত থুয়ের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এদিন ৩ হাজার ৫৪০ জনকে প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে বাংলাদেশ ও নেপিদো একমত হয়েছে। 

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর অভিযান থেকে বাঁচতে ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইন  ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা শুরু করে রোহিঙ্গারা। সব মিলিয়ে ৭ লাখ ৩০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে আসে এ দেশে। জাতিসংঘ মিয়ানমারের সামরিক নৃশংসতাকে জাতি নিধন বলে আখ্যায়িত করেছে। বাংলাদেশের কক্সবাজারে একাধিক অস্থায়ী শিবিরে বাস করছে তারা। রাখাইনে ফিরে গেলে ফের নির্যাতনের শিকার হতে পারেÑ এমন আশঙ্কায় বেশির ভাগ শরণার্থীই ফেরত যেতে চাইছে না বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। গত বছরও কিছুসংখ্যক রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করা হলে তা ব্যর্থ হয়। এবার নতুন করে তাদের প্রত্যাবাসনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

মানবাধিকারবিষয়ক সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের প্রতিনিধি মোহাম্মদ ইলিয়াস জানান, নতুন এই প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কোনো পক্ষ থেকেই আলোচনা করা হয়নি। প্রত্যাবাসন শুরুর আগে মিয়ানমারের উচিত রোহিঙ্গাদের মূল দাবিগুলো মেনে নেওয়া।

এদিকে এক বিজ্ঞপ্তিতে প্রত্যাবাসনের জন্য বাছাই করা শরণার্থীদের মত যাচাই করতে আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থাকে (ইউএনএইচসিআর)। উল্লেখ্য, জাতিগত নিধন ও গণহত্যার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পন্ন হয়। একই বছরের ৬ জুন নেপিদোতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমার ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মধ্যেও সমঝোতা চুক্তি হয়।

গত রবিবার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ে জরুরি বৈঠক করেন কক্সবাজারে টাস্কফোর্স কমিটির সদস্যরা। বৈঠকের প্রধান অতিথি চট্টগ্রাম অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার নুরুল আলম নিজামী বলেছেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে সর্বোচ্চ প্রস্তুত রয়েছে বাংলাদেশ। ২২ আগস্ট প্রত্যাবাসন নিয়ে আমরা ইতিমধ্যে প্রস্তুতি শেষ করেছি। এখন শেষ পর্যায়ের কাজ করছে। সবকিছু ঠিক থাকলে হয়তো এ কার্যক্রম আরও বাড়ানো হবে।

ইউএনএইচসিআরের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রত্যাবাসনের তালিকায় নাম থাকা রোহিঙ্গাদের সাক্ষাৎকারের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে কক্সবাজার টেকনাফের শালবাগান রোহিঙ্গা শিবিরে। আজ সকাল ৯টা থেকে সাক্ষাৎকার শুরু করা হবে। টেকনাফের জাদিমোরা শালবন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জ মোহাম্মদ খালেদ হোসেন বলেন, প্রত্যাবাসনের জন্য ক্যাম্প ইনচার্জের অফিসের পাশে বেশ কয়েকটি প্লাস্টিকের ঘর তৈরি করা হয়েছে। সেখানে ৩ হাজার ৩১০ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে। সাক্ষাৎকারের সময় ইউএনএইচসিআর এবং শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের প্রতিনিধি উপস্থিত থাকবেন।’

ইউএনএইচসিআরের কর্মকর্তা আরও জানান, ২২ আগস্ট প্রত্যাবাসনের জন্য সাড়ে ৩ হাজার রোহিঙ্গাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ জন্য কাজ করছে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ‘ইউএনএইচসিআর’ এবং শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়।

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালে ২৫ আগস্ট রাখাইনের ৩০টি নিরাপত্তাচৌকিতে একযোগে হামলার ঘটনা ঘটে। প্রতিক্রিয়ায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন শুরু করে। প্রাণ বাঁচাতে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। পুরনোসহ উখিয়া-টেকনাফের ৩০টি শিবিরে এখন ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। তবে জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এই সংখ্যা ১১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৫৭। তাদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি। জাতিগত নিধন ও গণহত্যার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পন্ন হয়।

এর আগে গত বছরের ১৫ নভেম্বরে নির্ধারিত সময়ে রোহিঙ্গাদের প্রতিবাদে প্রত্যাবাসন শুরু করতে পারেনি। সে সময় উখিয়ার ঘুমধুম ও টেকনাফের টেকনাফ নাফ নদী তীরে কেরণতলী (নয়াপাড়া) প্রত্যাবাসন ঘাট নির্মাণ হয়েছিল। এর মধ্যে টেকনাফের প্রত্যাবাসন ঘাটে প্যারাবনের ভেতর দিয়ে লম্বা কাঠের জেটি, থাকার জন্য ৩৩টি আধা সেমিপাকা টিনের ঘর, চারটি শৌচাগার রয়েছে। সেখানে ১৬ আনসার ব্যাটালিয়ন ক্যাম্পের সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত