বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমপির পছন্দে হবে পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০১৯, ০১:২৯ এএম

স্থানীয় সংসদ সদস্যের (এমপি) ‘পছন্দের যেকোনো ব্যক্তি’কে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক     স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ বা কমিটির সভাপতি করা যাবে।

সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তি বা নাগরিককে সভাপতি করা সংক্রান্ত নিয়ম তুলে দিয়ে ২০০৯ সালের প্রবিধানমালায় সংশোধনী এনে নতুন প্রবিধানমালা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়েও নেই কোনো দিকনির্দেশনা। এছাড়া অধ্যক্ষ বা প্রধান শিক্ষকসহ প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষককে বরখাস্তে শিক্ষা বোর্ডের অনুমতি নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার বিকেলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এক বৈঠকে এ প্রবিধানের খসড়া চূড়ান্ত হয়েছে। এখন তা অনুমোদনের জন্য শিক্ষামন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হবে।

মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জাভেদ আহমেদের সভাপতিত্বে ওই সভায় বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক শেষে জাভেদ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে জারি করা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র, হাইকোর্টের নির্দেশনা এবং নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়াদির স্পষ্টতাসহ একটি খসড়া প্রবিধানমালা তৈরি করা হয়েছে। এটি এখন মন্ত্রণালয়ের নীতি-নির্ধারকদের কাছে পেশ করা হবে।’ বিদ্যমান প্রবিধানমালার ২০টির বেশি স্থানে সংশোধনী ও সংযোজনী আনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

বৈঠকে উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা জানান, বিদ্যমান প্রবিধানে সংরক্ষিত আসনের এমপি, জনপ্রতিনিধি, সরকারি/আধাসরকারি/স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের বর্তমান-সাবেক কর্মকর্তা, শিক্ষানুরাগী এবং স্থানীয় খ্যাতিমান সমাজসেবকদের মধ্য থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি করার কথা বলা রয়েছে। এতে এমপির ‘অভিপ্রায়’ অনুযায়ী সভাপতি করার কথা নেই। ফলে সভাপতি হতে চাইলেও ‘যে কেউ’ তা হতে পারতেন না। কিন্তু এই প্রবিধানমালা পাস হলে স্থানীয় এমপির পছন্দেই ‘যে কেউ’ সভাপতি হবেন।

তারা আরও জানিয়েছেন, নতুন প্রবিধানমালা অনুসারে ইচ্ছা করলেই প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষককে বরখাস্ত করতে পারবে না কমিটি।

আবার তাদের কাউকে ৬০ দিনের বেশি সাময়িক বরখাস্ত করে রাখলে পুরো বেতন-ভাতা দিতে হবে।

অস্থায়ী কমিটিতে কোনো ব্যক্তি একবারের বেশি থাকতে পারবেন না। অস্থায়ী কমিটি শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ করতে পারবে না। এছাড়া কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থী নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম অথবা কাক্সিক্ষত ফল না করলে পরিচালনা কমিটিকে শিক্ষা বোর্ডের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরপর তিন বছর এমন হলে এমপিও (বেতন বাবদ মাসিক সরকারি অনুদান) বাতিল বা প্রতিষ্ঠানের পাঠদানের অনুমতি ও স্বীকৃতি বাতিল করা হবে। একই সঙ্গে পরিচালনা কমিটি বাতিল করতে পারবে শিক্ষা বোর্ড।

পরিচালনা কমিটির সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত প্রবিধানে কিছুটা স্বচ্ছতা আনার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এগুলো হলো- নির্বাচনের বিষয়ে নোটিস ছাড়াও জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে হবে, মনোনয়নপত্রের দাম হবে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ও সর্বনিম্ন ২ হাজার টাকা। প্রস্তাবে দাতা সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে টাকা জমা দেওয়ার সময় কমিয়ে অর্ধেক বা ৯০ দিন করা হয়েছে। আর দেড় লাখের পরিবর্তে অর্থের পরিমাণ যথাক্রমে ৫০ হাজার ও ৩ লাখ টাকা করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানকে জমি লিখে দিলে আজীবন দাতা সদস্য হবেন ব্যক্তি। তার অনুপস্থিতিতে তার সন্তান সদস্য হতে পারবেন।

প্রস্তাবিত প্রবিধান অনুযায়ী, কমিটির সভাপতি বা কোনো সদস্য প্রতিষ্ঠান থেকে পারিশ্রমিক নিতে পারবেন না। তবে সভা চলাকালীন ‘হালকা খাবারের’ জন্য সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা খরচ করা যাবে। কমিটির দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের আবেদনে সভাপতি পরিবর্তনের আবেদন করা যাবে।

প্রস্তাবনায় শিক্ষকদের সুরক্ষার বিষয়েও বলা হয়েছে। এর মধ্যে আছে তদন্ত কমিটির মাধ্যমে দোষী সাব্যস্ত হলেই কেবল শিক্ষককে শাস্তি দেওয়া যাবে; কোনো শিক্ষক অদক্ষতা, দুর্নীতি, কর্তব্যে অবহেলা, প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের পরিপন্থি কোনো কাজ বা পেশাগত অসদাচরণের জন্য দোষী হলেই শাস্তি দেওয়া যাবে। অপরাধের ধরন অনুযায়ী ৫ ধরনের শাস্তি দেওয়া যাবে; এগুলো হলো- তিরস্কার, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বার্ষিক প্রবৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট) স্থগিত রাখা, প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হলে দোষী শিক্ষকের বেতন থেকে আদায় এবং চাকরি থেকে অপসারণ ও বরখাস্ত করা। বরখাস্ত বা অপসারণের প্রস্তাব শিক্ষা বোর্ডের আপিল ও সালিশি কমিটির মাধ্যমে পরীক্ষিত ও বোর্ড কর্র্তৃক অনুমোদিত হতে হবে।

আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় উপকমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মু. জিয়াউল হক বলেন, ‘মূলত ২০০৯ সালের করা প্রবিধানমালাটি যুগোপযোগী করা হচ্ছে। এই প্রবিধানমালাটির বেশ কিছু স্থানে প্রধান শিক্ষকের ভূমিকা, পরিচালনা কমিটির ভূমিকা কেমন হবে, তা স্পষ্ট করা নেই। এতে তাদের কার্যক্রমে তেমন কোনো দায় নেই, এবার সেখানেই কাজ করা হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনেক সময় আমাদের কাছে অভিযোগ এসেছে, শিক্ষকের বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ দিয়েই তদন্তের অজুহাত দেখিয়ে মাসের পর মাস ওই শিক্ষককে প্রতিষ্ঠানে ঢুকতে দেওয়া হয় না। এছাড়া শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোনো অনিয়ম ও অপরাধ প্রমাণিত হলে কী ধরনের শাস্তি দেওয়া হবে তা-ও স্পষ্ট করা হচ্ছে। আবার ইচ্ছা করলেই একজন শিক্ষককে শাস্তি দেওয়া যাবে কি না, তা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। এসব নিয়ে আমরা মোটামুটি একটা সিদ্ধান্তে এসেছি, তবে চূড়ান্ত অনুমোদন পেতে আরও একটু সময় লাগবে। আশা করি ভালো কিছুই হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত