স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শাস্তিমূলক বদলির সুপারিশ

এখনো বহাল ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেল সুপার ও জেলার

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০১৯, ০২:১০ এএম

কারাগারে যাওয়া নতুন বন্দিদের প্রথমে রাখা হয় ‘আমদানি ওয়ার্ডে’। সেখানেই বাছাই করা হয় কোন বন্দি যাবে কোন ওয়ার্ডে। এক্ষেত্রে কারাগারের ওয়ার্ড নিয়ন্ত্রক হিসেবে পুরনো বন্দিরা তাদের (নতুন বন্দিদের) কিনে নেয় বিভিন্ন দামে। কোনো বন্দিকে চিকিৎসার নামে কারা হাসপাতালে রেখে আদায় করে ১০-২০ হাজার টাকা। প্রতি ওয়ার্ডে এক হাত পরিমাণ জায়গা বরাদ্দের জন্য ৩ হাজার টাকা আদায় করা হয়। এছাড়া মোটা কম্বল ও অতিরিক্ত কম্বল পেতে গুনতে হয় আরও ৫ হাজার টাকা। কারা কর্মকর্তাদের বিভিন্ন মেয়াদে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে এসব ওয়ার্ড কিনে নেয় তারা। এরপর বন্দিদের কাছ থেকে দফায় দফায় অর্থ আদায় করে তারা। কেউ টাকা দিতে না চাইলে বাথরুমে আটকে নির্যাতন চালানোর অভিযোগও রয়েছে। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের উচ্চপর্যায়ের পরিদর্শক দল ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম ও ঝিনাইদহ জেলা কারাগারে সরেজমিনে এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য পেয়েছে।

এরপর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারের অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কারা অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব সৈয়দ বেলাল হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের উপসচিব মো. মনিরুজ্জামানের সমন্বয়ে তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। ওই কমিটি গত ৬ এপ্রিল ৫১ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। এতে বন্দি বেচাকেনা, সাক্ষাৎ বাণিজ্য, সিট বাণিজ্য, খাবার বাণিজ্য, চিকিৎসা বাণিজ্য ও জামিন বাণিজ্যের প্রমাণ পাওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়।

এরপর গত ২৮ এপ্রিল সুরক্ষা সেবা বিভাগের উপসচিব (কারা-১) মো. মনিরুজ্জামান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাভ্যন্তরে ৯ ধরনের বাণিজ্যে জড়িত জেল সুপার, জেলার, ডেপুটি জেলার, প্রধান কারারক্ষী এবং তাদের সহযোগী ২৬ কারারক্ষীকে বদলির পাশাপাশি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেন। এরপর কারা অধিদপ্তর বিভিন্ন সময় ২৬ কারারক্ষীকে বদলি করে। বরখাস্ত করা হয় প্রধান কারারক্ষী আবদুল ওয়াহেদকে।

সর্বশেষ গত ১৬ আগস্ট ডেপুটি জেলার হুমায়ুন কবিরকে বরগুনা জেলা কারাগারে বদলি করা হয়। তবে বিভাগীয় শাস্তি ও বদলির সুপারিশের তিন মাস পেরিয়ে গেলেও গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত স্বপদে রয়েছেন প্রধান অভিযুক্ত জেল সুপার মো. নুরুন্নবী ভূঁইয়া ও জেলার এ জি মাহমুদ।

কারা অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক বজলুর রশীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ মোতাবেক কয়েকজনকে বদলি করা হয়েছে। কয়েকজনের বিরুদ্ধে বদলির কার্যক্রম চলছে। বাকিদেরও ভবিষ্যতে বদলি করা হবে।’

বরগুনা জেলা কারাগারে বদলি হওয়া ডেপুটি জেলার হুমায়ুন কবির গত মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি টিম ভিজিট করে একটি প্রতিবেদন জমা দেয়। সেখানে আমার নামসহ বিভিন্নজনের বিরুদ্ধে অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়। কিন্তু এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। এখন কারা অধিদপ্তরের গঠিত একটি কমিটি সেই অভিযোগের চূড়ান্ত তদন্ত শুরু করেছে।’

এ বিষয়ে অভিযুক্ত জেলার এ জি মাহমুদ বলেন, ‘আমি আগে বরগুনা জেলা কারাগারে ছিলাম। সেখান থেকে গত ফেব্রুয়ারি মাসে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কারাগারে আসার দুই মাসের মাথায় আমার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে। এটা আসলে ষড়যন্ত্রমূলক প্রতিবেদন। কারণ আমরা মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘গত মঙ্গলবারও রোকেয়া নামে এক নারীর কাছ থেকে ৪০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করেছি। রোকেয়ার স্বামী সোহেল কারাগারে বন্দি। ইয়াবাগুলো স্বামীকে দেওয়ার জন্য এসেছিল বলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কাছে স্বীকারোক্তি দেওয়ায় আদালত তাকে ৬ মাসের কারাদণ্ড দেয়। এতগুলো ইয়াবা কারাগারে ঢুকলে কী হতো বুঝতে পারছেন? একইভাবে গত পাঁচ মাসে ৮ জন মাদক ব্যবসায়ীকে সাজা দিয়েছি। তারপরও এখানকার কিছু লোকজন ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য দিয়েছে। বিষয়টি এখন অধিদপ্তর তদন্ত করছে।’

জেল সুপার নূরন্নবী ভূঁইয়া চার বছর ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারে রয়েছেন। ২০১৫ সালের ১৮ মে এখানে যোগদান করেন তিনি। নূরন্নবী ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেনামি অভিযোগের ভিত্তিতে তারা প্রতিবেদন দিয়েছে। এখন চূড়ান্ত তদন্ত হচ্ছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত