শৈশবে ব্রহ্মদৈত্য, শাঁকচুন্নি, গেছোভূত, মেছোভূতের সমস্ত গল্প যখন শেষ হয়ে যায়, তখন মাঝে মাঝেই ‘মগরাজা’, ‘মগ জলদস্যু’, আর মগ গুপ্তধনের রোমহর্ষক গল্পের অবতারণা হয়। এসব গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রে থাকে কিছু লাল জোব্বা পরা পাগড়িওয়ালা ডাকাবুকো মানুষ। এদেরই বলা হতো মগ। এদেশে মগদের দৌরাত্ম্য ও পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে লিখেছেন মহুয়া ভট্টাচার্য
গুপ্তধন ও কালাজাদুর রূপকথা
চট্টগ্রাম অঞ্চলে মগদের নিয়ে ছড়া প্রচলিত আছে ‘খাটো খাটো মগম রাজা, মুখে চাপা দাড়ি।
তুমি হুকুম কর মগম রাজা আমরা দাঁড়ে মারি বাড়ি।’
গল্প প্রচলিত আছে শত শত বছর আগে চট্টগ্রাম অঞ্চলেই তারা তাদের আস্তানা গেড়ে বসেছিল। মগদের নিয়ে যে মিথটি প্রচলিত, তা হলোÑ তাদের গুপ্তধন আর কালোজাদু। মগ পুরোহিতরা ছিলেন জাদুবিদ্যায় পারদর্শী। আর তাদের কালোজাদুকে কেন্দ্র করেই নানা রূপকথা ও ভীতির জন্ম হয়েছে শত শত বছর আগে। পরাক্রমশালী এই মগগোষ্ঠী একসময় চট্টগ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গেলেও পালানোর সময় যেসব ধনসম্পদ তারা সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেনি, তা প্রায় রাতারাতি পুঁতে ফেলে মাটির নিচে। ঠাকুরমাদের গল্পের শুরুটা এখান থেকেই!
মাঠে-বনে শাকলতা কুড়ানো এক হতদরিদ্র বৃদ্ধা। নুন আনতে যার পান্তা ফুরোয়; হঠাৎই তার আঙুল ফুলে কলাগাছ! খোঁজ! খোঁজ! চারপাশে উৎসুক পাড়া-প্রতিবেশীর ঢল। কী এমন আলাদিনের চেরাগ পেল বুড়ি! সব কৌতূহলের জবাব তো বুড়ির বাগিচার ওই বিরাট গর্ত। ব্যস! আর কারও বুঝতে বাকি রইল না বুড়ি ‘মগা গুপ্তধন’ পেয়েছে। তারপর বুড়ি আর যায় কোথায়! পাড়া-প্রতিবেশীরাও চেপে ধরল, বুড়িও বয়ান করতে শুরু করল সেই রোমহর্ষক রাতের কথা। বুড়িকে কী স্বপ্নাদেশ দেওয়া হলো, আর কীভাবেই বা বুড়ি রাতারাতি এই গুপ্তধন বের করে আনল। মগা পুরোহিত বা বৈদ্যদের ছিল অসীম জাদুবিদ্যার ক্ষমতা। তারা যে সম্পদ একবার পুঁতে রেখে যেত, তা তাদের ইচ্ছে ছাড়া অন্য কারও পাওয়া অসাধ্য ছিল। কেবল যাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হতো, তারাই কেবল স্বপ্নাদেশ পেত।
এমন কত রূপকথার রাজ্যে বিনিদ্র চোখ আর স্বপ্নালু রাত কেটে গেছে অনেকের শৈশবে! তবে এসব কেবল মিথ ছিলও না। কিছু তো ঐতিহাসিক সত্যতাও রয়েছে। অন্তত চট্টগ্রামের ইতিহাস তাই বলে।
মগ গোষ্ঠী ও মগ রাজত্ব
চট্টগ্রামের ইতিহাসে মগ গোষ্ঠী বা মগ রাজত্ব সম্পর্কে যে ধারণা পাওয়া যায়, তার প্রায় শতভাগই বিকৃত ও কষ্টকল্পনায় ভরপুর। লোককথা আর ঐতিহাসিকদের অদূরদর্শিতার কুফলে মগদের মূল ইতিহাস সত্য থেকে এখন অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। ইতিহাসে যাদের মগ বলে জানা যায়, তারা মূলত রাখাইন, রাক্ষাইন ও আরাকানি। যে জাতিগোষ্ঠীকে দস্যু, লুণ্ঠনকারীর তকমা দিয়ে নানা কাল্পনিক গল্পের সৃষ্টি, ইতিহাসের একটু পেছন দিকে গেলেই জানা যায়, তারা কতটা সুসংস্কৃত যোদ্ধা ও উদার ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ ছিল।
বাঙলা সাহিত্যে মগদের পৃষ্ঠপোষকতা
সুলতানি আমলের গোড়ার দিকে এবং মুঘল শাসনের প্রথমার্ধে চট্টগ্রামে আরাকান সাম্রাজ্য তথা মগদের আধিপত্য ছিল। স্থাপত্যকলা ও শিল্প সাহিত্যে মুঘলদের কদর সারা ভারত বিখ্যাত হলেও বাঙলা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা কিন্তু মুঘলরা করেনি। করেছিল আরাকান রাজসভা। মধ্যযুগের কবি আলাওল, শাহ্ মুহম্মদ সগীর, দৌলত কাজী, মাগন ঠাকুর আরাকান রাজসভার সভাকবি ছিলেন। সংস্কৃত, আরবি, ফার্সির মতো ‘আশরাফ’ ভাষায় রচিত সাহিত্যের কাছে বাঙলা ভাষা আদৃত হয়নি মুঘলদের দৃষ্টিতে। সেই সময় মধ্যযুগের চট্টগ্রামের কবিরা আরাকান রাজসভাতে বসেই তাদের বিখ্যাত কাব্যগুলো রচনা করেছিলেন।
চট্টগ্রামে আরাকানি শাসন বা মগ রাজত্ব
আরব ভূগোলবিদদের ব্যাখ্যায় যে বন্দরটির কথা বারবার উঠে এসেছে, তা আসলে চট্টগ্রাম বন্দর। আর এই বন্দরকে কেন্দ্র করেই মূলত বহু বণিক, যোদ্ধা তথা উপনিবেশিক জাতি বসতি গড়ে তোলে। এই বন্দরই ছিল বাংলার প্রধান সমুদ্রবন্দর। ফলে নৌযোদ্ধা আরাকান চন্দ্রবংশীয় রাজা জলপথেই চট্টগ্রাম অভিযানে আসেন। তিনি এখানকার কিছু অঞ্চলে তার দখল পরিব্যাপ্ত করেন। সেই থেকে চট্টগ্রামে মগ রাজত্বের ভিত্তিভূমি রচিত হয়। সালটি সম্ভাব্য ৯৫৩ এর আশপাশে। পরে সুলতানি আমলের শুরু ও শেষের দিকে রাজ্যজুড়ে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় তার সুযোগে আরাকান রাজারা চট্টগ্রামের বহুলাংশ তাদের অধিকারে নিয়ে নেন। এতে তাদের তেমন বেগ পেতে হয়নি, কারণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় রাজ্যগুলোতে কেন্দ্রের হস্তক্ষেপ শিথিল হয়ে গিয়েছিল। এই পর্যন্ত সমস্ত কিছু নির্বিবাদ থাকলেও হঠাৎই কেন এই আরাকানিরা মগদস্যুতে পরিণত হয়ে সারা চট্টগ্রাম তথা বাংলার বহু অঞ্চলে ত্রাস সৃষ্টি করতে শুরু করল, সে প্রসঙ্গে আসা যাক।
পঞ্চদশ শতকের গোড়ার কথা
বাংলাদেশ, ত্রিপুরা ও আরাকান সীমানায় অবস্থিত ছিল বলে চট্টগ্রামের কর্র্তৃত্ব নিয়ে এই তিন রাজ্যের মধ্যে প্রায়ই ত্রিদলীয় সংঘর্ষ সংঘটিত হতো। পরে শেষ সুলতান দাউদখান কররানি মুঘলদের কাছে পরাজিত হলে মুঘল দখলদারিত্ব চট্টগ্রামের আরাকান অধ্যুষিত এলাকার প্রায় কাছে চলে আসে। এতে আরাকান রাজা বিচলিত হয়ে পড়েন। মুঘলরা তখন তাদের কাছে বর্বর, নৃশংস ক্ষমতার অধিকারী জাতি হিসেবে পরিচিত। আরাকানিরা আত্মরক্ষার নানা কৌশল অবলম্বন করার সঙ্গে সঙ্গে কিছু কূটনীতির আশ্রয় নেয়। যেমনÑ বর্মী, ফিরিঙ্গি জলদস্যুদের সঙ্গে আঁতাত। এইসব জলদস্যুদের সঙ্গে আরাকান রাজের প্রায়ই যুদ্ধ-বিবাদ লেগে থাকত। কিন্তু মুঘলদের আগ্রাসন ঠেকাতে আরাকান রাজ তাদের সহযোগিতা গ্রহণ ও পৃষ্ঠপোষকতা করতে লাগলেন। আরাকান রাজের সৈন্যদলে বহু অবৈতনিক ফিরিঙ্গি জলদস্যু ছিল যাদের কাজই ছিল বিভিন্ন জনপদে খুন, হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, লুটতরাজ কায়েম করা। যা কেবল মুঘলদের কাছে নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শনের নামান্তর। সেই সময়কার মগদস্যুদের হিংস্রতার বয়ান মেলে একটি গীতিকায়-
‘সোনাবালি ছেনান করে শানো বান্ধা রে ঘাটে
তাহা দেখে মগম রাজারে নাও লাগাই লো তটে রে
আমি ক্যানবা আইলাম ঘাটে।
এক ডুব দুই ডুব তিন ডুবের কালে
চুল ধরিয়া মগম রাজারে তারে উঠায় নৌকার পরে রে।’
মগদস্যুদের চরম নৃশংসতা
‘ফিরিঙ্গির দেশখান বাহে কর্ণধারে
রাত্রিতে বহিয়া যায় হার্মাদের ডরে।’
ইউরোপীয় জলদস্যু যার বেশিরভাগই ছিল পর্তুগিজ, তাদের সহযোগিতায় মগদস্যুদের দৈরাত্ম্য শুরু হয়। এই সব নির্মম, লম্পট, অত্যাচারী পর্তুগিজ ‘হার্মাদ’ নামে পরিচিত ছিল। ছোট ছোট দ্রুতগামী জলযানে চড়ে শুধু উপকূল বা সমুদ্রেই নয়, কখনো কখনো শতাধিক মাইল দূরের স্থলভূমিতে গিয়েও এই দস্যুরা উৎসব অনুষ্ঠানের সময় ব্যাপক লুটতরাজ ও অকথ্য অত্যাচার করত। নর-নারী অপহরণ করে বিভিন্ন বন্দরে বিদেশি বণিকদের কাছে বিক্রি করে দিত। সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বাংলার উপকূলীয় এলাকায় মগ ফিরিঙ্গিদের অব্যাহত দৈরাত্ম্য সমাজ জীবনে এক অভিশাপরূপে আবির্ভূত হয়। তাদের এমন ত্রাসের রাজত্বের কারণে ‘মগের মুল্লুক’ কথাটির প্রচলন। কথাটি বীভৎসতার প্রতীক। এমন ভয়ানক রাক্ষুসে আচরণের নজির ইতিহাসে বিরল।
মগদস্যু দমন ও ঐতিহাসিক মগ ধাওনী
এই মগ ফিরিঙ্গি দস্যুদের দমন করতে ইসলাম খাঁ তার রাজধানী ঢাকায় স্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে শায়েস্তা খাঁ এসে মগদস্যুদের সম্পূর্ণরূপে দমন করেন। মুঘল শাসকের হাতে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে তারা ক্ষিপ্রগতিতে পালিয়ে যায়। তাদের এই পলায়নই ইতিহাসে ‘মগ ধাওনী’ নামে পরিচিত। পালিয়ে যাওয়ার পর এই মগরা শতবর্ষের গৃহযুদ্ধ ও দস্যুবৃত্তিতে নিজেদের শক্তিক্ষয় করে, বর্মীদের কাছে বশ্যতা স্বীকার করে নেয়।
সেই গুপ্তধনের রহস্য
মগদের পরাজিত পলায়নের সম্পদ তারা সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেনি, বড় বড় ঘড়ায় করে তা রাতারাতি মাটিতে পুঁতে ফেলে। শুধু তাই নয়, এসব লুকিয়ে রাখা সম্পদের মানচিত্রও অঙ্কন করে রাখেন মগ পুরোহিতরা। এই মানচিত্রকে বলা হতো ‘বিজক’। পালানোর পর পুরোহিতরা গোপনে ‘বিজক’ অনুসরণ করে গুপ্তধন তুলে নিয়ে যেত। যেহেতু মগদের কালাজাদু নিয়ে স্থানীয়দের মনে ভীতি ছিলÑ কেউ তাই এসব ফেলে যাওয়া সম্পদ অনুসন্ধানেও সাহসী হতো না। তবে কি এই রাতারাতি ধনবান হওয়া, স্বপ্নাদেশ পাওয়া মিথ্যে? জানা যায়, মগ পুরোহিতরা গোপনে সম্পদ তুলে নেওয়ার সময় ভিটে বা জমির মালিককে কৃতজ্ঞতা স্বরূপ কিছু সম্পদ দিয়ে যেত। সেই সঙ্গে নিজেদের হৃতপ্রায় ক্ষমতা ও লোকভীতিকে জিইয়ে রাখতে নানা স্বপ্নাদেশ ও লোকভীতির কল্পিত কাহিনীর ধূম্রজাল তৈরি করে দিয়ে যেত। আর এই রহস্যাবৃত রূপকথার গল্প শুনে শুনেই বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষের মধুর শৈশব কেটেছে!
রাখাইনের সঙ্গে মগের সম্পর্ক
রাখাইনরা সুদীর্ঘকাল ধরে তাদের আবাসভূমিকে ‘রাখাইন প্রে’ নামে ডাকত। পরে ইংরেজরা দখল করে এ রাষ্ট্রকে ‘রাকান’ নামে সম্বোধন শুরু করে। এভাবে ‘রাকান’ শব্দের আগে ‘আ’ যুক্ত হয়ে তা হয়ে যায় ‘আরাকান’। রাখাইন দেশের জনগণ ‘আরাকানিজ’ নামে অভিহিত হয়। আরাকানই বর্তমান মায়ানমার।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রমতে, খ্রিস্টপূর্ব ৫ থেকে ৬ হাজার বছর আগে এই অঞ্চলে নিগ্রিতা ও দ্রাবিড়িয়ান জনগোষ্ঠী বাস করত। পরে আর্য ও মঙ্গোলীয়রা এখানে বসবাস শুরু করে। এক সময় দ্রাবিড়িয়ানরা নিগ্রিতাদের এ অঞ্চল থেকে বিতাড়িত করে। দ্রাবিড়িয়ানরা আবার সভ্য আর্য ও মঙ্গোলীয়দের দ্বারা বিতাড়িত হয়। ফলে এ অঞ্চলে টিকে থাকা সভ্য আর্য জনগোষ্ঠী ও মঙ্গোলীয়দের সংমিশ্রণে এক সময় সৃষ্টি হয় রাখাইন জাতির।
সময়টি অষ্টাদশ শতাব্দীর চতুর্থ থেকে শেষ দশক পর্যন্ত। সে সময় আরাকান অঞ্চলটি ছিল ব্যাপক বিদ্রোহ, হত্যা ও ক্ষমতা দখলের দ্বন্দ্বমুখর এক বিপর্যস্ত রাজ্য। অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে নিজ আমলাদের চক্রান্তে আরাকানের তৎকালীন স্বাধীন রাজা বার্মার রাজা বোদোফায়ার কাছে যুদ্ধে পরাজিত হন। ফলে বর্মীরা আরাকান দখলে নেয়। বর্মী সেনারা সে সময় অসংখ্য আরাকানি নারী-পুরুষ গ্রেপ্তার করে স্ত্রীলোকদের বার্মায় পাঠিয়ে দেয় এবং পুরুষদের হত্যা করতে থাকে।
বর্মীরা আরাকানের মহামুনি বুদ্ধমূর্তি তাদের রাজধানী মান্দালয়ে নিয়ে যায়। এতে ক্ষোভে ফেটে পড়ে আরাকানবাসী। তারা বর্মী দখলদারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। বিদ্রোহ দমনে বর্মী বাহিনী নির্মম অত্যাচার চালায়। ফলে জীবন বাঁচাতে দেশ ছাড়ে রাখাইনরা।
১৭৮৪ সালের শীতের হিম হাওয়ায় মগ্ন এক রাত। আরাকানের মেঘবতী থেকে ১৫০টি রাখাইন পরিবার ৫০টি নৌকা নিয়ে বঙ্গোপসাগরে নৌকা ভাসায়। সাগর পাড়ি দিয়ে তিনদিন তিনরাত পর তারা আশ্রয় নেয় পটুয়াখালী জেলার রাঙ্গাবালী দ্বীপে। সে সময় ওই দ্বীপে ছিল না কোনো জনমানব। ছিল শুধু হিংস্র জন্তু-জানোয়ার।
রাখাইনরা সঙ্গে নিয়ে আসা শস্যবীজ দিয়ে ফসল রোপণ শুরু করে। তারা হিংস্র জন্তু-জানোয়ারদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে তখন বাসগৃহের চারপাশে সুন্দরী কাঠের গুঁড়ি দিয়ে ঘিরে রাখত। বড় ছেনি আর বল্লম ছাড়া তাদের কাছে কোনো অস্ত্র ছিল না। তা দিয়েই তারা কৌশলে জন্তু শিকার করে তার মাংস খেত।
এক সময় এক ইউরোপিয়ান নাবিক রাখাইনদের অবস্থান খুঁজে পান। তার মাধ্যমে অন্যদের সঙ্গেও রাখাইনদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অফিসাররা তাদের জন্য বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ, কাপড়-চোপড়ের ব্যবস্থা করে দেয়।
এ অঞ্চলে তখন ইংরেজ শাসন চলছে। ইংরেজরা স্বপ্ন দেখত বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা এবং আরাকান রাজ্য দখলের। তাই তারা আদিবাসী জাতিগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখত। রাখাইনরা তখন ইংরেজদের সহযোগিতায় আরাকান থেকে তাদের আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনদের নিয়ে আসতে থাকে। এভাবে এদেশের মাটিতে রাখাইনদের বসতির বিস্তৃতি ঘটে। ধীরে ধীরে রাখাইনরা ছড়িয়ে পড়ে গলাচিপা, কলাপাড়া, আমতলী, বরগুনা, বানিয়াহাতী, টিয়াখালী, কুয়াকাটা, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন অঞ্চলে।
রাখাইনদের অনেকেই ‘মগ’ বলে থাকে। কিন্তু রাখাইনরা নিজেদের ‘মগ’ বলতে রাজি নয়। ফারসি শব্দ ‘মুগ’ থেকে ‘মগ’ নামের উৎপত্তি। মুগ অর্থ অগ্নি উপাসক। ধারণা করা হয় আরাকানের আদিবাসীরা জড় উপাসক ছিল। এ বিষয়ে গবেষক সতেন্দ্রনাথ ঘোষাল মনে করেন সংস্কৃত শব্দ ‘মগদু’ থেকে ‘মগ’ শব্দের উৎপত্তি। মগদু অর্থ জলদস্যু। তার মতে, আরাকানে কতিপয় লোক পর্তুগিজদের সঙ্গে একত্রিত হয়ে পূর্ব বাংলার উপকূলীয় অঞ্চলে লুটতরাজ চালাত। তাই তাদের ডাকা হতো ‘মগদু’ নামে। কালক্রমে এই মগদু বিকৃত হয়ে ‘মগ’ রূপ ধারণ করে।
এ বিষয়ে ভিন্ন মতামত দেন প্রফেসর ডি জি ই হল। তার মতে ‘মগ’ শব্দটি ‘মাঙ্গাল’ বা মঙ্গোলীয় শব্দ থেকে আসা। তিনি মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আরাকানের অধিবাসীদের চেহারাগত মিল খুঁজে পান। ডা. গ্রিয়ারসন তাকে সমর্থন করেছেন। তার মতে মগরা ইন্দোচীন জনগোষ্ঠীর একটি শাখা ছাড়া আর কিছুই নয়।
এ বিষয়ে রতন লাল চক্রবর্তী তার ‘বাংলাদেশ-বার্মা সম্পর্ক’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘মগ’ শব্দটি নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তার মতে, আরাকানের মগরা পর্তুগিজ জলদস্যুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াত। মগরা আরাকানের স্থায়ী বাসিন্দা হলেও আরাকানের সমস্ত অধিবাসী জলদস্যু ছিল না এবং তারা সবাই মগও নন। তার রচনায় আক্রমণকারীদের মগ এবং পরে চট্টগ্রামে আগত আরাকানিদের ‘আরাকানি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আরাকানিদের মধ্যে রাখাইনরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও সে সময় আরও অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তা আরাকানে বাস করত। তথাকথিত যারা মগ বা জলদস্যু ছিল তারা রাখাইন নয় বরং অন্য কোনো ক্ষুদ্র জাতি বলে ধারণা করা হয়। এছাড়া মিয়ানমার রাজ্যে ৭টি প্রদেশের মধ্যে একটি প্রদেশের নাম রাখাইন স্টেট। এটি পূর্বে আরাকান নামে পরিচিত ছিল। সে আরাকানে তথা পুরো মিয়ানমারে মগ নামে কোনো জনগোষ্ঠী এখনো নেই এবং আগেও ছিল না। কিন্তু তবুও রাখাইন আদিবাসীদের ভাগ্য থেকে বিতাড়িত হয়নি ‘মগ’ নামক অমর্যাদাকর শব্দটি।
