দেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে (এসইজেড) বিনিয়োগ শুরু করেছে বড় শিল্প গ্রুপগুলো। ২০১৮ সালে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ২ হাজার ১০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রস্তাব করে সরকারি-বেসরকারি এসইজেডগুলোতে জমি বরাদ্দ নিয়েছে। এর মধ্যে বেশ কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে স্থাপিত কারখানায় পণ্য উৎপাদন করে বাজারে বিক্রি করা শুরু করেছে। গত বছর অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে স্থাপন করা শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ২ লাখ ২১ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে বলে বেজার খসড়া বার্ষিক প্রতিবেদন ২০১৮তে উল্লেখ করা হয়েছে।
খসড়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি এসইজেডগুলোর মধ্যে মিরসরাইয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প নগরে ৬৫টি আবেদনের বিপরীতে ৫ হাজার ৫৩০ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। এসব আবেদনের বিপরীতে ১ হাজার ৬৬৪ কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রস্তাব রয়েছে, যাতে ১ লাখ ৬৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। এর মধ্যে বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতে বিনিয়োগ হবে ১৫৭ কোটি ডলার, ইস্পাত ও লৌহজাত পণ্যে ৪৫০ কোটি ডলার, বিদ্যুৎ খাতে ৭০৮ কোটি ডলার, ওষুধ, পেইন্টস, এলপিজি প্ল্যান্ট ও খাদ্য প্রক্রিয়াকারণ শিল্পে ৩৪৮ কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রস্তাব রয়েছে।
শ্রীহট্ট অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১৩৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে, যা প্রায় ৪৪ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। এ ছাড়া, বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রস্তাবের বিপরীতে ১৫ হাজার কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হয়েছে বলে খসড়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এরই মধ্যে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করেছে। সরাসরি পদ্ধতিতে জমি বরাদ্দ নেওয়া ৬৪ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে বসুন্ধরা শিল্প অর্থনৈতিক অঞ্চল, এসিআই ফার্মাসিউটিক্যালস, বিএসআরএম, পিএইচপি স্টিল ওয়ার্কস, বেঙ্গল প্লাস্টিক, সামিট এলায়েন্স লজিস্টিকস, ওরিয়ন পাওয়ার মেঘনাঘাট, সামিট চিটাগং পাওয়ার লিমিটেড, ইউএস-বাংলা গ্রুপের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো। এই তালিকায় থাকা অনন্ত টেক্সটাইল পার্কে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে সবচেয়ে বেশি, ২৫ হাজার ৫৩৫ জনের। এই পার্কে ৪৪ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে।
শ্রীহট্ট অর্থনৈতিক অঞ্চলে মাত্র ৬টি প্রতিষ্ঠান ২৪টি শিল্পে ১৩৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ করে ৪৩ হাজার ৮৩১ জনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে বলে খসড়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১৮ কোটি ডলার বিনিয়োগ করে একাই ২০টি শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবে ডিবিএল গ্রুপের ফ্লামিঙ্গো ফ্যাশন লিমিটেড। এতে ৩৮ হাজারেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ প্রস্তাব রয়েছে আয়শা ক্লথিং কোম্পানি, আসওয়াদ কম্পোজিট মিলস, গ্রেটওয়াল সিরামিকস, ডাবল গ্রেজিং ও আবদুল মোনেম সিরামিকস লিমিটেডের। আগামী তিন বছরের মধ্যে এসব শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে বলে বেজার খসড়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বেসরকারি ১০টি অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৩৯টি দেশি-বিদেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপন করার প্রজেক্ট ক্লিয়ারেন্স দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করেছে, ২১টি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন শুরুর কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে ১৯১ কোটি ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে। এতে ১৪ হাজার লোকের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান হয়েছে। আবদুল মোনেম ইকোনমিক জোনে বাংলাদেশ হোন্ডা প্রাইভেট লিমিটেড ৩ কোটি ৭৩ লাখ ডলার বিনিয়োগ করে তিন ধরনের মোটরসাইকেল উৎপাদন করছে। এ পর্যন্ত উৎপাদিত ১৬ হাজার ৪৩৯ ইউনিট মোটরসাইকেল দেশের ভেতরেই বাজারজাত করা হয়েছে।
এ ছাড়া, মেঘনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৫৩ কোটি ডলার বিনিয়োগে ১০টি শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যারা বিদ্যুৎ, পেপার অ্যান্ড পাল্প, কেমিক্যাল, ডাল, আটা, সিড ক্রাসিং করছে। গাজীপুরের কোনাবাড়িতে বে-অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৮ কোটি ৮৮ লাখ ডলার বিনিয়োগে গড়ে উঠেছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য কারখানা, টয় অ্যান্ড প্যাকেজিং শিল্প। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে আমান অর্থনৈতিক অঞ্চলে উৎপাদন শুরু করেছে আমান সিমেন্ট কারখানা। এ অঞ্চলে প্যাকেজিং ও জাহাজ নির্মাণশিল্পও গড়ে উঠছে। মেঘনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোনমিক জোনে ৩ কোটি ডলার বিনিয়োগে ১০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। এ অঞ্চলে বেভারেজ, স্টিল প্ল্যান্ট, সিমেন্ট পেপার ব্যাগ উৎপাদন শুরু হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার টিআইসি হাঙ্গার উৎপাদন কারখানা স্থাপন করছে। আর সিটি গ্রুপের সিটি ইকোনমিক জোনে ৬৭ কোটি ডলার বিনিয়োগে ভোগ্যপণ্যের বিভিন্ন কারখানা গড়ে উঠেছে। এসব কারখানায় উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত হচ্ছে। এতে ৫ হাজার ৭৮৩ জনের কর্মসংস্থান হওয়ার কথা উল্লেখ আছে খসড়া প্রতিবেদনে।
২০৩০ সালের মধ্যে দেশে ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অতিরিক্ত ৪০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য অর্জনে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেছে বেজা। ইতিমধ্যে ৮৮টি অঞ্চলের অনুমোদন দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন সংস্থাটি। এর মধ্যে সরকারি ৫৫টি, বেসরকারি ২৯টি, পিপিপির ভিত্তিতে ২টি, জিটুজি ৪টি ও ট্যুরিজম পার্ক ৩টি। জিটুজির আওতায় চীন, জাপান ও ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য এসব অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠছে।
