আসামে নাগরিকত্ব নিয়ে বহুমুখী দ্বন্দ্ব

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১০:৩৪ পিএম

আসামের নাগরিকত্ব বিতর্কের শেষ অধ্যায় এখনো আসেনি। ১৯৮৫ সালে ‘আসাম সমঝোতা’ অনুযায়ী ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের আগ পর্যন্ত যারা আসামের অধিবাসী ছিলেন, তারাই বৈধ অধিবাসী হবেন। কেননা, এতে ধরে নেওয়া হয়েছে, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হামলার মুখে আসামে যেতে বাধ্য হওয়া বহু মানুষ সেখানে থেকে গেছেন। এনআরসির তালিকা প্রকাশের পর সেই সমীকরণ বেশখানিকটা বদলে গেছে। বিজেপির পূর্বানুমান বিফলে গেছে, বিপুলসংখ্যক মুসলমানকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর ধোঁয়া তোলার রসদ তারা পায়নি। তারা কি হাল ছেড়ে দেবে? ইন্ডিয়া টু ডের ৩ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে কৌশিক ডেকা অনুমান করছেন, বিজেপি এবং আসামের অভিবাসীবিরোধী শক্তিগুলো এখন এই নাগরিকত্ব নির্ধারণের তারিখটি বদলের চেষ্টা করবে। কারণ এই দ্বন্দ্বটি শুধু বাঙালি অসহমিয়া নয়, বহুমুখী।

এমনিতেই আসামে বহুমুখী জাতিগত সংঘাত আছে আদিবাসীদের মধ্যেও। কিন্তু বিজেপির মূল লক্ষ্য বাংলাভাষী মুসলমানকে আক্রমণের বিষয় করে তুলে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করা। অন্যদিকে অসমিয়া, বোড়ো এবং অন্যান্য আদিবাসীর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জনপ্রিয় দাবি বাংলাভাষী হিন্দু এবং মুসলমান উভয়েই তাড়ানো। এই দুই দাবির মধ্যে মিল থাকলেও অমিলের জায়গাটা পরিষ্কার, বিজেপি আসামের হিন্দু জনগোষ্ঠীর পরিস্থিতি নিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে। অন্যদিকে, এই পরিস্থিতির সুযোগ আসামের মুসলমান জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক দলগুলোও সমীকরণ টেনেছে। কংগ্রেসি আমলে তাদের মধ্যে আগে জনপ্রিয় দাবি ছিল হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর ঐক্য। সাম্প্রতিককালে বিজেপির উত্থানের মুখে, কিছু মুসলিম প্রতিনিধিত্বকারীদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে, হিন্দু বাংলাভাষীদের অভিবাসী কিংবা বহিরাগত হিসেবে চিহ্নিত করে আইনের সুবিধা নেওয়ার ঝোঁক। আসাম গণপরিষদের বিখ্যাত নেতা এবং বর্তমানে বিজেপির নির্বাচনী মিত্র প্রফুল্ল কুমার মোহান্ত, যিনি আসাম সমঝোতার অন্যতম পক্ষ ছিলেন, রেডিফ.কম-এ ২০১৮ সালের ৩ আগস্ট এক সাক্ষাৎকারে তাদের দিক থেকে খোলাখুলি বলেন, এরই মধ্যে আসামের ১৪টি জেলায় ‘বাংলাদেশি মুসলিমরা’ সংখ্যাগুরু হয়ে গেছে (বাস্তবে ৯টি জেলায় মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ), উত্তর-পূর্ব ভারতে একটা ইসলামি রাজ্য বানানোর মৌলবাদী চক্রান্ত চলছে। অন্যদিকে, একই পত্রিকায় নিউ ইয়র্কের বার্ড কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সঞ্জীব বড়–য়া ২০১৮ সালের ১৩ আগস্ট অন্য একটি বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করেন। তিনি বলেন, আসামে ১৯৩১ থেকে ১৯৫১ সালের মধ্যে আসামি ভাষাভাষীদের সংখ্যা ৩১ দশমিক ৪ ভাগ থেকে বেড়ে ৫৬ দশমিক ৭ ভাগে উন্নীত হয়েছে। এটি ঘটেছে, কেননা ‘মিয়া মুসলমানরা’ (পূর্ববাংলা থেকে আসা মুসলমান বাঙালি) নিজেদের আসামি ভাষাভাষী হিসেবে পরিচয় দিতে থাকে... এটাকে একটা আশীর্বাদ হিসেবেই দেখা হয়। ‘মিয়া মুসলমান’ সম্প্রদায় ভাষা বদল না করলে আসামি ভাষার রাজ্যভাষা হওয়ার দাবি তাৎপর্যপূর্ণভাবে দুর্বলতর হতো।

এই তথ্যটির বহুমুখী তাৎপর্য রয়েছে। আসামের সাম্প্রতিক এনআরসিতে বাদ পড়া অধিকাংশ মানুষ হিন্দু সম্প্রদায়ের। বহু আদিবাসীও এনআরসি থেকে বাদ পড়েছেন, সেটা তাদের কাগজপত্র রাখার অনভ্যাসের কারণেই, বলেছে ইন্ডিয়া টুডে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের এনআরসিতে বাদ পড়াটা বিস্ময়ের সৃষ্টি করলেও ভারতীয় গণমাধ্যম থেকে অনেকগুলো কারণ জানা যায়। প্রথমত, পশ্চিমবঙ্গে একটা বন্যা এবং একটা অগ্নিকাণ্ডে বহু কাগজপত্র পুড়ে যায়, যার ফলে আসামে বিয়ে করা অজস্র প্রবীণ নারী তাদের ভারতীয়ত্ব প্রমাণ করতে পারেননি। এর বাইরে আছে অদক্ষতা, আমলাতান্ত্রিক অনিয়ম এবং আরও নানা জটিলতা। কিন্তু এর বাইরেও একটা সম্ভাবনা থাকে। বাংলাদেশ থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষরা ১৯৪৭ সাল থেকেই ভারতে গিয়েছেন, এটি রাষ্ট্রীয় কর্র্তৃপক্ষ অস্বীকারের চেষ্টা করলেও বাস্তবতা। অন্যদিকে আসামে মোট জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মুসলিম। এই অনুপাতটা ১৯৪৭ সালের আগে আরও বেশি ছিল, ধরেই নেওয়া যায়, আসামের বর্তমান মুসলিম জনগোষ্ঠীর বড় অংশই সেখানকার বৈধ বাসিন্দা। ফলে এনআরসির এই উদ্ঘাটনে মুসলিম জনগোষ্ঠীর তুলনায় হিন্দু সম্প্রদায়েরই বিপদগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। অন্যদিকে বিজেপি ঘোষণা করেই রেখেছে, তারা ‘অবৈধ’ মুসলিমদের বহিষ্কার করবে, হিন্দু কিংবা অন্যান্য জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেবে। এই রাজনৈতিক চাতুরী বছর খানিকের বেশি ধরেই ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে উত্তপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রেখেছে। মোদি-জোয়ারে এবং বহিরাগত-বিরোধী তপ্ত কথাবার্তা তুলে বিজেপি এই রাজ্যগুলোতে নির্বাচনে ভালো করলেও তাদের ঘোষিত কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে এবং এই নেতিবাচক রাজনীতির ফলে বিজেপির ক্ষতি কিংবা উপকার যাই হোক, দীর্ঘ মেয়াদে এই অঞ্চলে শুধু মুসলিম বাঙালিবিদ্বেষ নয়, হিন্দু বাঙালিবিদ্বেষও আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সমূহ কারণ উপস্থিত রয়েছে, যার নানা ঐতিহাসিক ভিত্তিও আগে থেকেই প্রস্তুত আছে। বস্তুত এ ধরনের একটা প্রসঙ্গে অবস্থান গ্রহণ করাটা খুব সহজ কাজ নয়। ইতিহাসের বহু রক্তক্ষরণ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, জাতিগোষ্ঠীর উত্থান ও পতনের ইতিহাস এর সঙ্গে জড়িত। আসামের সঙ্গে বাংলার সম্পর্কের অনেক কিছুই আমরা অবগতও নই। অনেকেই জেনে থাকবেন, বাংলাদেশে এবং ভারতবর্ষে সুফি সাধনায় আসামের একটি বিশেষ ভূমিকা ছিল। সুফিরা যেহেতু বিশেষভাবে যাজক বা পার্থিব প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনা মধ্যস্থতায় ইন্দ্রিয়াতীত সত্যকে উপলব্ধি করার বিষয়ে উৎসাহী ছিল, তাই মুসলমানদের মধ্যে তারা আসামের কামরুপের যোগী ঐতিহ্যের প্রতি সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট হয়েছিল।

অন্যদিকে, যুদ্ধ এবং রক্তপাতের ইতিহাস সত্ত্বেও আসামের ইতিহাসে হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে বাংলাভাষীদের ঐতিহাসিক অবদান বিপুল। ভৌগোলিক প্রতিকূলতা এবং ঘন অরণ্যের পাশাপাশি হাউইয়ের প্রযুক্তির কল্যাণে আসামে মুঘল আগ্রাসন প্রতিহত হলেও এর একটা অংশ বাংলার সঙ্গে যুক্ত হয় প্রাক-ব্রিটিশ আমলেই। এসব যুদ্ধের বিবরণ পাঠকরা মুঘল সেনাপতি মির্জা নাথানের স্মৃতিকথা ‘বাহারিস্তান-ই-গায়বী’ গ্রন্থে দেখে নিতে পারেন। কিন্তু ব্রিটিশ আমলে বার্মার করতল থেকে আসামের ঔপনিবেশিক শাসন শুরু হলে বিপুলসংখ্যক মুসলমান ও হিন্দু কৃষক ওই অঞ্চলে যান, একই সঙ্গে অনেকে যেমন যান নানা প্রশাসনিক পদ ও দপ্তরেও। এর প্রধান কারণ ছিল একদিকে ব্রিটিশদের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে এসব আধুনিক দপ্তর, যন্ত্র ও বাণিজ্যের সঙ্গে বাংলাভাষীদের পরিচয়, অন্যদিকে এর আরেকটি কারণ ছিল বাংলাভাষী কৃষকদের তুলনামূলক দক্ষতা। জীবিকার ভিন্নতার কারণে জুমচাষি আদিবাসীদের তুলনায় তাদের নানা শস্য আবাদে উৎপাদনশীলতা বেশি ছিল, যা দ্রুত তাদের সংখ্যাবৃদ্ধির কারণ ঘটায়। ফলে অন্যদিকে তা জাতিগত আদিবাসীদের নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের সংকটও সৃষ্টি করে। 

এই ইতিহাসেরই জের আমরা আসামে দেখতে পাচ্ছি। এই আসামে আদিবাসীদের অধিকার রক্ষায় ‘লাইন প্রথা’ নামের একটি নিপীড়নমূলক বন্দোবস্ত বাংলাভাষীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় গত শতকের শুরুর দিকে। তার বিরুদ্ধে বিশাল সংগ্রাম গড়ে তোলেন মওলানা ভাসানী। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে আরও নানা উত্থান-পতনের ভেতর দিয়ে যায় আসাম। শিলচরে বাংলা ভাষার অধিকার রক্ষায় ভাষা আন্দোলন হয়। আশির দশকে আসামের মধ্যশ্রেণি বহিরাগতদের বিরুদ্ধে যে দুটি ধারায় আন্দোলন গড়ে তোলে, তার একটি হলো আসাম গণপরিষদ, শুরুতেই যার কথা বলা হয়েছে; অন্যটি উলফা। আসাম গণপরিষদ তার বাংলাভাষীবিরোধী অবস্থানের মধ্য দিয়ে এবং বিশেষ করে হিন্দিভাষী শ্রমিকদের ওপর বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করে দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

ফলে আসামে বিজেপি আর মুসলমান একমাত্র সমীকরণ নয়। বাংলাভাষী আর আদিবাসী সমীকরণ এবং এরও পেছনে চাপা থাকা জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্বের একটা বহুমুখী সংঘাত সেখানে আছে। অন্যদিকে আসামের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, কাশ্মীরে বহিরাগতদের জমি কেনার বিষয়ে যে বিধিনিষেধ এতকাল ছিল, তা মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ডে বলবৎ থাকলেও আসামে এই রকম বিধি নেই। অর্থাৎ আইনগতভাবে ভারতের অন্যস্থান থেকে আসা ব্যক্তিদের আসামে সম্পত্তির মালিক হওয়াটা অবৈধ নয়। বলাই বাহুল্য, এ ধরনের জটিল পরিস্থিতির মধ্যে কোনো সরল সমাধান কঠিন। কিন্তু এই জটিলতাকেই বহুগুণ উসকে দেয়, জিইয়ে রাখে বাইরের চাপ, কেন্দ্রীয় রাজনীতির সমীকরণে গড়ে তোলা মুসলিমবিরোধী জিগির। এমনকি বাংলাদেশেও তা বেশ বড় ধরনের আতঙ্ক আর অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কা জাগিয়েছিল। সৌভাগ্যক্রমে, এনআরসির উদ্ঘাটনে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি আপাতত থম মেরেছে। কিন্তু ১৯৭১-এর বদলে ১৯৫২ সালকে ভিত্তি ধরে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে আবার জাতিগত বিবাদ গড়ে তোলার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়।

লেখক

রাজনৈতিক সংগঠক ও প্রাবন্ধিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত